কোন ভোটকেন্দ্র কেন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়

কোন ভোটকেন্দ্র কেন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়
ফাইল ছবি: চরচা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রের সংখ্যা ২৫ হাজার ৩২৮টি, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৬০ শতাংশ। কেন এত বিপুলসংখ্যক ভোটকেন্দ্র ‘গুরুত্বপূর্ণ’ (ঝুঁকিপূর্ণ) বা ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র রয়েছে আট হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি।

কেন কেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়?

পুলিশের ভাষ্য, ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকি নির্ধারণে একাধিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়। কোনো এলাকায় একাধিক প্রার্থী থাকলে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, হুমকি কিংবা সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ে। এ ছাড়া থানা থেকে কেন্দ্রের দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা দুর্বল বা দুর্গম, এলাকার জনবসতির ধরন এবং অতীতের নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস-এসব বিষয় মিলিয়েই কেন্দ্রগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বা অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই শ্রেণিবিন্যাস মূলত সম্ভাব্য সহিংসতা আগাম চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের একটি কৌশল বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বিশেষ শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি অনুসরণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন, মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই এসব তালিকা করা হয়েছে।

তার মতে, যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থী অন্য প্রার্থীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হন, তবে সেই এলাকার কেন্দ্রগুলো বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। একইভাবে, থানা সদর থেকে দূরবর্তী বা যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্বল কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত ফোর্স পৌঁছানো কঠিন হতে পারে-এ কারণেও সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।

অতীতের নির্বাচনে সহিংসতার রেকর্ড থাকা এলাকা কিংবা যেখানে বিশৃঙ্খল জনবসতির উপস্থিতি রয়েছে, সেসব কেন্দ্রও এই তালিকায় উঠে আসে। পাশাপাশি একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে সংঘর্ষের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় সেই দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে কী ধরনের নিরাপত্তা থাকছে?

পুলিশ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। জনবল বণ্টনের ক্ষেত্রেও সাধারণ কেন্দ্রের তুলনায় আলাদা মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে।

সাধারণ এলাকায় যেখানে চারটি কেন্দ্রের জন্য একটি মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করে, সেখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তিনটি বা দুটি কেন্দ্রের জন্য একটি মোবাইল টিম মোতায়েন থাকবে।

প্রতিটি কেন্দ্রে আনসার ও পুলিশের নির্দিষ্ট সদস্যের পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে বডি ওর্ন ক্যামেরা, যাতে দায়িত্ব পালনের সময় স্বচ্ছতা ও নজরদারি নিশ্চিত করা যায়।

নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘কুইক রেসপন্স’-এর ব্যবস্থা নেওয়া। এ কথা জানিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “কোনো কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনা ঘটলে বা ঘটার আশঙ্কা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের মোবাইল পার্টিগুলোকে সেখানে পাঠানো হবে। এতে কেন্দ্রের নিজস্ব ফোর্সের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।”

ফাইল ছবি: চরচা
ফাইল ছবি: চরচা

প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার

নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে। সরকার দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যার মাধ্যমে জেলা ও থানা পর্যায় থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের পাশাপাশি পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বাহিনীর কত সদস্য মাঠে থাকবে?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর এক লাখ, নৌ-বাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ (স্থলভাগে ১ হাজার ২৫০), পুলিশের এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৪ জন সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। এ ছাড়াও বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র‍্যাব এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা থাকবেন। দুই ধাপে বাহিনী মোতায়েন করে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা, মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরীর মতে, নির্বাচন ঘিরে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত হুমকি মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করেন, শুধু বাহিনীগুলোর সমন্বয় নয়, সাধারণ মানুষ ও সব রাজনৈতিক দলকে নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বমূলক ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

ভোটকেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য মূলত সম্ভাব্য সহিংসতা আগাম শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী জনবল, প্রযুক্তি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়েই এই বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নির্ধারণ মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করে থাকে। অতীতের ভোটকেন্দ্রগুলোর সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলা, প্রার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং সেখানকার সংস্কৃতিকে বিবেচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রের অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা সহজ বা দুর্গম, এলাকার মানুষের সামাজিক আচরণ ও অতীত অভিজ্ঞতার ওপরও নির্ভর করে।”

এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই কিছু কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ রাখা যায়। তবে প্রায় ৬০ শতাংশ কেন্দ্র কেনো ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সম্পর্কিত