Advertisement Banner

খবর জানতে বাড়ছে এআই-চ্যাটবটের ব্যবহার, কী প্রভাব পড়তে পারে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
খবর জানতে বাড়ছে এআই-চ্যাটবটের ব্যবহার, কী প্রভাব পড়তে পারে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: রয়টার্স

সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের সংবাদ গ্রহণ ও সরবরাহের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। সম্প্রতি রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণার একটি অধ্যায়, ‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড নিউজ রিপোর্ট ২০২৫’, লিখেছেন গণমাধ্যম গবেষক ড. অ্যামি রস আরগুয়েদাস। ৪৫টি দেশের ৯০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের একটি ছোট কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল অংশ এখন সরাসরি এআই টুল ব্যবহার করে সংবাদ জানতে শুরু করেছে। কারণ, চ্যাটবটগুলো মানুষের দৈনন্দিন ডিজিটাল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ছয়টি দেশে জেনারেটিভ এআই টুলের সাপ্তাহিক ব্যবহার ২০২৪ সালের ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনে সংবাদসূত্র হিসেবে এআই চ্যাটবট—যেমন চ্যাটজিপিটি ও গুগল জেমিনাই—এর উত্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা এসব টুল ব্যবহার করছে, কী ধরনের তথ্যের জন্য ব্যবহার করছে এবং এর ফলে মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস ও সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠক প্রবাহ কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে।

সংবাদের জন্য কারা এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছে?

সংবাদ গ্রহণের জন্য চ্যাটবটের ব্যবহার গত বছরের ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে এ বছর বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক সংবাদ গ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

যদিও এখনও তুলনামূলক কম মানুষ সংবাদ জানার জন্য এআই ব্যবহার করেন, সংখ্যাটি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। সবচেয়ে কম বয়সী উত্তরদাতাদের ১৭ শতাংশ সংবাদ জানার জন্য চ্যাটবট ব্যবহার করেন, যেখানে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোষ্ঠীতে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা আগে থেকেই সংবাদে আগ্রহী এবং নিয়মিত সংবাদ অনুসরণ করেন, তারাই এআই চ্যাটবট ব্যবহারে এগিয়ে।

বিশ্বব্যাপী মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ এআই চ্যাটবট থেকে পাওয়া সংবাদকে বিশ্বাস করেন। ছবি: পেক্সেলস
বিশ্বব্যাপী মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ এআই চ্যাটবট থেকে পাওয়া সংবাদকে বিশ্বাস করেন। ছবি: পেক্সেলস

বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ এআই চ্যাটবট থেকে পাওয়া সংবাদকে বিশ্বাস করেন। তবে নিয়মিত ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে যারা এআই ব্যবহার করেন না, তাদের মধ্যে এ হার মাত্র ১৭ শতাংশ। যেসব দেশে এআই চ্যাটবটের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি, সেসব দেশেই সংবাদের জন্য এআই ব্যবহারের হারও বেশি।

এআই চ্যাটবট কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

৪৫টি দেশের তথ্য অনুযায়ী, ৪২ শতাংশ মানুষ কোনো সংবাদ সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে বা অনুসরণমূলক প্রশ্ন করতে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেন। এছাড়া— ৩৫ শতাংশ সর্বশেষ খবর জানতে, ৩৪ শতাংশ দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপে পেতে, ৩০ শতাংশ জটিল বিষয় সহজভাবে বুঝতে, ৩৩ শতাংশ কোনো সংবাদমাধ্যম বা তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে এআই ব্যবহার করেন।

এ থেকে বোঝা যায়, এআই অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তুলনায় বহুমাত্রিক সুবিধা প্রদান করছে।

বেশিরভাগ দেশেই কোনো খবর সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য জানতে প্রশ্ন করাই এআই ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য। ৪৫টি দেশের মধ্যে ৩৩টিতে এটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রাজিল, তাইওয়ান ও কানাডা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় বাজারে সরাসরি সংবাদ পাওয়াই এআই ব্যবহারের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। অন্যদিকে কানাডা ও যুক্তরাজ্যে সংবাদ সংক্ষেপ তৈরির ব্যবহার বেশি। অস্ট্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জটিল খবর সহজে বোঝার জন্য এআই ব্যবহার। জার্মানি ও জাপানেও এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্য।

হংকং ও তুরস্কের মতো দেশে সংবাদসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য এআই ব্যবহারের হার বেশি। একই প্রবণতা দেখা যায় হাঙ্গেরি ও রোমানিয়াতেও, যেখানে সংবাদমাধ্যমের ওপর জনআস্থা তুলনামূলক কম।

তবে সংবাদমাধ্যম কীভাবে কাজ করে তা জানতে বা এক ধরনের কনটেন্টকে অন্য ফরম্যাটে রূপান্তর করার মতো ব্যবহার সব দেশেই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

কেন ব্যবহার করা হচ্ছে এআই চ্যাটবট?

গবেষণায় দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ ব্যবহারকারী কোনো বিষয়ে আরও গভীর তথ্য বা ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য এআই ব্যবহার করেন। এটি এআইয়ের কথোপকথনভিত্তিক বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।

এরপরই রয়েছে সময় সাশ্রয়ের বিষয়টি। ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, খবর পাওয়ার অন্য পদ্ধতির তুলনায় এআই দ্রুততর।

এছাড়া— ৩৬ শতাংশ জটিল খবরের সারাংশ তৈরির জন্য, ৩৫ শতাংশ যেকোনো প্রশ্নের দ্রুত উত্তর পাওয়ার জন্য, ৩৫ শতাংশ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য একত্রে দেখার জন্য, ৩৩ শতাংশ নিজের পছন্দের ভাষায় খবর অনুবাদের জন্য এআই ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে, প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক কারণগুলো তুলনামূলক কম জনপ্রিয়। ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তথ্য জানার জন্য চ্যাটবটই তাদের প্রথম পছন্দ। আর ২৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সাধারণভাবে চ্যাটবটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

এআই চ্যাটবট কি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠক পাঠাচ্ছে?

সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো, পাঠকেরা যদি চ্যাটবট থেকেই বিস্তারিত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক উত্তর পেয়ে যান, তাহলে তারা মূল সংবাদসূত্রে ক্লিক করার প্রয়োজন কম অনুভব করতে পারেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠক প্রবাহ কমে যেতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গুগল, বিং ও নাভেরের মতো সার্চ ইঞ্জিনে এআই-নির্ভর সংক্ষিপ্ত তথ্য চালু হওয়ায় মানুষের সংবাদ অনুসন্ধানের ধরন বদলাচ্ছে। যদিও ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে গুগল এখনও মূল সংবাদপ্রতিবেদনকে অগ্রাধিকার দেয়, তবু অন্যান্য বিষয়ে এআই ফিচার ব্যবহারকারীদের ক্লিক আচরণে প্রভাব ফেলছে।

জরিপে দেখা যায়, ২৭টি দেশের গড়ে মাত্র ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা এআই চ্যাটবট থেকে মূল সংবাদসূত্রে ‘সবসময়’ বা ‘প্রায়ই’ ক্লিক করেন। তুলনায় এই হার সার্চ ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ।

এ থেকে ধারণা করা যায়, ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ চ্যাটবটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন এবং মূল সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছেন না।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এআই চ্যাটবট, সার্চ ইঞ্জিন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই মূল সংবাদসূত্রে ক্লিক করার প্রধান কারণ হলো আরও বিস্তারিত তথ্য জানা।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

গবেষণায় বলা হয়, এখনও তুলনামূলক কম মানুষ সংবাদ পাওয়ার জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেন। তবে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, ফলে ভবিষ্যতে সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ এবং সংবাদে আগ্রহী ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই পরিবর্তন আগে দৃশ্যমান হবে।

এআই শুধু সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়; অনেক ব্যবহারকারী এটি দিয়ে সংবাদ সংক্ষেপ, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়নের কাজও করছেন। ফলে সহজ ভাষার প্রতিবেদন, সংক্ষিপ্তসার, এক্সপ্লেইনার এবং নিউজলেটারের মতো ফরম্যাটের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

চ্যাটবটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত ও সহজ উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা, যা সংবাদমাধ্যমের জন্য সহজে অনুকরণ করা কঠিন।

গবেষকদের মতে, প্রকাশকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তারা কি এআইয়ের মতো সাধারণ তথ্যসেবা তৈরিতে বিনিয়োগ করবে, নাকি নিজেদের স্বতন্ত্র সাংবাদিকতা ও গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।

গবেষণাটি ইঙ্গিত করে যে, এআই চ্যাটবট কিছু ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠক প্রবাহ কমাতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি তথ্য যাচাই, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার গুরুত্বও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের সাংবাদিকতাকে স্বতন্ত্র, নির্ভরযোগ্য ও মূল্যবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা।

সম্পর্কিত