বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়: কীভাবে, কেন এবং এর পরিণতি কী?

বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়: কীভাবে, কেন এবং এর পরিণতি কী?
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে চারগুণ, কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল বেড়েছে ১১ গুণ। ছবি: বাসস

গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশ সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, ইউনির্ভাসিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।

কমিটি গত ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট জমা দেয়। গতকাল রোববার এই রিপোর্ট প্রকাশের পর তা নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন কমিটির সদস্যরা।

কী আছে কমিটির রিপোর্টে?

বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর কমিটি মনে করে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যে গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে, তা হঠাৎ তৈরি হয়নি। নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিশেষ আইন, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং গোষ্ঠীস্বার্থের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে এই খাতকে এক ধরনের ‘আর্থিক ব্ল্যাকহোলে’ পরিণত করা হয়েছে।

নিচে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো- এই সংকট কীভাবে তৈরি হলো, এর মূল চালিকাশক্তি কারা, এবং এর বোঝা শেষ পর্যন্ত কেন জনগণের ঘাড়েই পড়ছে।

লোকসান কীভাবে আকাশচুম্বী হলো?

২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক লোকসান ছিল প্রায় পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিশেষ বিধান আইনের আওতায় প্রতিযোগিতাহীন বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং উচ্চমূল্যের আমদানি নির্ভর উৎপাদনের কারণে সেই লোকসান এখন বেড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাত এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বাজারদরের কাছাকাছি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে এই লোকসান সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু লোকসান সামাল দিতেই পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হতে পারে- যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প, কৃষি ও ঘরোয়া ভোক্তার ওপর।

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তিকে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক বলা হচ্ছে। ছবি: বাসস
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তিকে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক বলা হচ্ছে। ছবি: বাসস

‘বিশেষ বিধান আইন’: সংকটের মূল চাবিকাঠি

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে তথাকথিত বিশেষ বিধান আইন, যার মাধ্যমে সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি দরকষাকষির ভিত্তিতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছে। পর্যালোচনা কমিটির মতে, এই আইন কার্যত রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বদলে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফা নিশ্চিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

আদানি চুক্তি: কেন এটি সবচেয়ে বিতর্কিত?

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তিকে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিবছর এই এক চুক্তির জন্যই প্রায় এক বিলিয়ন ডলার (১২ হাজার কোটি টাকা) পরিশোধ করছে। ভারতের গ্রিড থেকে যেখানে বিদ্যুৎ পাওয়া যেত ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে, সেখানে আদানিকে দিতে হয়েছে শুরুতে ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট, পরে যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে। কমিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ি, এই দামে বিদ্যুৎ কেনার ফলে ২৫ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ক্ষতি হতে পারে ১০ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি।

অযৌক্তিক কয়লা পরিবহন ব্যয়

আদানি প্রকল্পটি ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় স্থাপন করা হয়, যেখানে স্থানীয় কয়লা থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা হয়নি, বরং অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজে কয়লা এনে ভারতীয় রেলপথে শত শত কিলোমিটার পরিবহন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই পুরো ব্যয়ের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ ট্রান্সমিশন লাইন ও করের খরচ- যেগুলোও বাংলাদেশের বিলের অংশ।

‘কংক্রিট’ দুর্নীতির প্রমাণ কী?

পর্যালোচনা কমিটির ভাষায়, আদানি চুক্তির ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ নয়, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। নির্দিষ্ট তারিখে অর্থ লেনদেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নথি; এমনকি অভিযোগ আছে যে, এসব চুক্তি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই তথ্যগুলো একটি শক্তিশালী আইনি মামলার জন্য যথেষ্ট বলেও মনে করছে কমিটি।

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট: বিদ্যুৎ না পেলেও টাকা

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে চারগুণ, কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল বেড়েছে ১১ গুণ। এর প্রধান কারণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা অব্যবহৃত। তবু এসব কেন্দ্র বসিয়ে রাখার জন্য সরকারকে বছরে ০ দশমিক ৯ থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ আসুক বা না আসুক-টাকা যাচ্ছে।

আদানি ছাড়াও কারা লাভবান?

এই ব্যবস্থায় শুধু আদানি নয়, গ্যাস সংকট জানা সত্ত্বেও ব্যয়বহুল কেন্দ্র স্থাপন করা সুযোগ পেয়েছে সামিট। সেইসঙ্গে সমমানের প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো এসএস পাওয়ার (বাঁশখালী)। এ ছাড়া পরিত্যক্ত বা অচল কেন্দ্র আমদানির অভিযোগ রয়েছে রিলায়েন্সের বিরুদ্ধে। সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি এবং বিশেষ সুবিধা দেখা গেছে।

সমাধান কী বলছে পর্যালোচনা কমিটি?

কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তি বাতিল করতে হবে। উচ্চমূল্যের পিপিএ পুনঃআলোচনা করতে হবে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক হতে হবে এবং একটি স্বাধীন জ্বালানি তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠনের সুপারিশ করে বিশেষ এই কমিটি।

জনগণের জন্য বার্তা: সাময়িক কষ্ট, দীর্ঘমেয়াদী লাভ?

আদানি বা অনুরূপ চুক্তি বাতিল করলে স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং বাড়তে পারে-এটাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা ধারণের আহ্বান জানানো হয় কমিটির পক্ষ থেকে। কমিটির মতে, এই সাময়িক ত্যাগ না করলে আগামী ২৫ বছর দেশকে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হতে হবে।

শেষ কথা

বিদ্যুৎ খাতের সংকট এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক নয়, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নৈতিক ব্যর্থতার ফল। বিপিডিবি আজ কার্যকর ক্রেতা নয়, বরং কেবল অর্থ পরিশোধের মাধ্যম। এই প্রতিবেদন ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা ও দিকনির্দেশনা। সংস্কার না হলে এই লুটপাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করবে দেশের মানুষই।

সম্পর্কিত