Advertisement Banner

ম্যানোস্ফিয়ার কী, কেন এত আলোচনা?

ম্যানোস্ফিয়ার কী, কেন এত আলোচনা?
ছবি: এআই

বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ শব্দটি ক্রমশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মূলত ইন্টারনেটে সক্রিয় এমন কিছু উগ্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক। যারা নারীবিদ্বেষ প্রচার করে। তাদের দাবি- নারীবাদের প্রসার এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনের কারণে পুরুষরা আজ কোণঠাসা।

ম্যানোস্ফিয়ার কী?

ম্যানোস্ফিয়ার হলো ইন্টারনেটে সক্রিয় এমন কিছু গোষ্ঠীর একটি সম্মিলিত নাম, যারা পুরুষত্বের অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং উগ্র সংজ্ঞা প্রচার করে। এই গোষ্ঠীগুলো একটি মিথ্যা ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, নারীবাদের প্রসার এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনের কারণে পুরুষরা অধিকার হারাচ্ছে। তাদের মতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, অগাধ সম্পদ, বাহ্যিক শারীরিক সৌন্দর্য এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করাই হলো একজন পুরুষের যোগ্যতার মাপকাঠি।

সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, গেমার কমিউনিটি এবং ডেটিং অ্যাপসহ ডিজিটাল জগতের প্রায় সব জায়গাতেই এই ম্যানোস্ফিয়ার পুরুষদের লক্ষ্য করে কাজ করে। অনেক পুরুষই তাদের নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে বা শিখতে গিয়ে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে জড়িয়ে পড়েন। আপাতদৃষ্টিতে এসব কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু পুরুষদের আত্মউন্নয়নমূলক মনে হলেও, এর আড়ালে অনেক গ্রুপই অস্বাস্থ্যকর আচরণকে উৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা কিশোর ও পুরুষদের এমনভাবে ‘আত্মবিশ্বাসী’ হওয়ার শিক্ষা দেয়, যার মূল ভিত্তি হলো অন্যকে (বিশেষ করে নারীকে) ছোট করা বা নিগৃহীত করা।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ম্যানোস্ফিয়ারে নারীকে যেভাবে দেখা হয়

ম্যানোস্ফিয়ারের সবার একইরকম বিশ্বাস থাকে- বিষয়টা তেমন নয়। তাদের মধ্যে প্রধান যোগসূত্র হলো নারীবিদ্বেষ। নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি চরম অবজ্ঞা, ঘৃণা এবং ক্ষোভই এই গোষ্ঠীগুলোর মূল ভিত্তি। প্রকৃতপক্ষে, ম্যানোস্ফিয়ারকে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নারীবাদ-বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনেরই একটি আধুনিক ডিজিটাল সংস্করণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সহজ কথায় অনলাইনে পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং নারীবিদ্বেষী প্রচারণার যে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তা ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ নামে পরিচিত। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে লিঙ্গভিত্তিক নানা অপবিজ্ঞান, মিথ্যা তথ্য এবং কুসংস্কার ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পেছনে যত গ্রুপ কাজ করে তাদের মধ্যে রয়েছে-

ইনভলান্টারি সেলিব্রেটস (ইনসেল):

এরা বিশ্বাস করে যৌনসঙ্গম পুরুষের সহজাত অধিকার, কিন্তু এখানে নারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বঞ্চিত করছে। যৌনতায় উভয় পক্ষের (মূলত নারীর) কনসেন্ট বা সম্মতিকে তারা অস্বীকার করে। এমন কি তারা ধর্ষণ ও শারীরিক লাঞ্ছনাকে প্ররোচিত করা হয়। এই মতাদর্শের লোকজনের মধ্যে বর্ণবাদ ও সহিংসতার প্রবণতা দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু গণ-সহিংসতার ঘটনার সাথে এই গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

মেন’স রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট

এই গোষ্ঠীটি মূলত তাত্ত্বিক বা একাডেমিক ভঙ্গিতে দাবি করে যে নারীবাদ এবং নারীদের সমান অধিকার (যেমন: ভোটাধিকার, শিক্ষা ও নেতৃত্ব) পুরুষের ক্ষতি করছে। তাদের মতে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ‘গাইনোসেন্ট্রিক’ বা নারী-স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

পিক-আপ আর্টিস্ট

এরা শেখাতে চায়, যৌনতার ক্ষেত্রে নারীদের সম্মতি জরুরি নয়। সম্মতি ছাড়াই কীভাবে নারীর সঙ্গে যৌনতায় টেনে আনা যায়, সেই কৌশল তারা শেখায়। সম্মতি নিয়ে এই গ্রুপ উপহাস।

মেন গোয়িং দেয়ার ওন ওয়ে

এই আন্দোলনের মূল কথা হলো, সমাজ পুরুষদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাই তারা নারীদের সঙ্গ এবং মূলধারার সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি বর্জন করার পরামর্শ দেয়।

নারী নির্যাতন। ছবি: চরচা
নারী নির্যাতন। ছবি: চরচা

ম্যানোস্ফিয়ারের নিজস্ব ভাষা ও শব্দভাণ্ডার আছে। যার বেশিরভাগ নারী বিদ্বেষ ও নারীর প্রতি ঘৃণা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়। এবার আমরা দেখে নিই সেগুলো আসলে কী-

রেড পিল

‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ সিনেমা তো দেখেছেন। এই সিনেমার অনুকরণে রেড পিল শব্দটির মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, একজন ব্যক্তি বাস্তব জগত সম্পর্কে ‘সচেতন’ হয়েছেন এবং বিশ্বাস করেন যে পৃথিবী পুরুষদের চেয়ে নারীদের বেশি সুবিধা দেয়। যারা এই মতের সাথে একমত নন, তাদের ‘ব্লু পিল’ গ্রহণকারী হিসেবে উপহাস করা হয়।

এডব্লিউএলটি

এর পূর্ণরূপ হলো ‘All Women Are Like That’ (সব নারীই এক রকম)। এটি নারীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বা স্টিরিওটাইপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

ফেময়েড বা এফএইচও

‘ফিমেল হিউম্যানয়েড অর্গানিজম’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ এফএইচও। নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য না করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার জন্য এই অবমাননাকর শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

হাইপারগ্যামি

নারীরা কেবল শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পুরুষদের সাথে সম্পর্কে জড়াতে চায়, এমন একটি নেতিবাচক ও অবমাননাকর ধারণা প্রকাশ করতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

তরুণরা কেন এই ম্যানোস্ফিয়ারের ফাঁদে পড়ে?

অনলাইনে পুরুষতান্ত্রিক কনটেন্ট বা ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ মূলত সেইসব তরুণদের মধ্যে বেশি প্রভাব ফেলছে, যারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও একা মনে করেন।

জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’-এর সহযোগী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকুইমুন্ডো-এর ‘স্টেট অফ আমেরিকান মেন ২০২৩’ রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ মনে করেন যে, তাদের সত্যিকার অর্থে বোঝার মতো কেউ নেই।

বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো কমিউনিটি বা গোষ্ঠী খুঁজে নেওয়া এখন একটি স্বাভাবিক বিষয়। আমরা অনেকেই অনলাইনে আমাদের পরিচয় গড়ে তুলি, নিজের শখ পূরণ করি এবং সমমনা মানুষ খুঁজে পাই। তরুণরা প্রায়ই ফিটনেস, ডেটিং কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিষয়গুলো খুঁজতে গিয়ে এই ম্যানোস্ফিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের খপ্পরে পড়েন। ‘মুভেম্বর ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক তরুণই এসব কনটেন্টকে বিনোদনমূলক বা অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করেন।

নিজেদের ‘লাইফস্টাইল কোচ’ হিসেবে দাবি করা এই প্রচারকরা তরুণদের ‘ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা’ শেখানোর নাম করে প্রলুব্ধ করেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, পুরুষদের সমস্যার মূলে গিয়ে আত্ম-অন্বেষণে উৎসাহিত করার বদলে তারা উল্টো শেখান যে, পুরুষরা বর্তমান সমাজের মিসঅ্যান্ড্রি বা পুরুষবিদ্বেষের শিকার।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ম্যানোস্ফিয়ারের এই বিস্তার এবং তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীলতার হার একই সূত্রে গাঁথা। তারা মনে করেন, নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টা আসলে পুরুষদের প্রতি বৈষম্য। ‘ইউএন উইমেন’ এবং ‘আনস্টেরিওটাইপ অ্যালায়েন্স’ এর এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের তুলনায় তরুণরাই এখন লিঙ্গভিত্তিক প্রথাগত কুসংস্কারে বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠছে।

কিশোর বা পুরুষদের তাদের আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে উৎসাহিত করা হয় না, তখন তারা পরামর্শের আশায় এসব অনলাইন কমিউনিটির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা সাধারণত একটা বড় দুষ্টচক্র তৈরি করে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, পিতৃত্ব, মানসিক দুশ্চিন্তা এবং যৌন স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দিকনির্দেশনা পেতে তারা এসব প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেয়।

ম্যানোস্ফিয়ারের প্রভাব কি শুধু নারীদের ওপরই পড়ে?

নারীবিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য এইসব ম্যানোস্ফিয়ার গড়ে তুললেও, এর নেতিবাচক প্রভাব কিন্তু শুধু নারীদের ওপরেই পড়ে, এমন না। এটা পুরুষদের জন্যও সমান ক্ষতিকর। ইকুইমুন্ডোর এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পুরুষের চিন্তাধারায় নারীবিদ্বেষ প্রকট, তাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, মাদকাসক্তির মতো ক্ষতিকর আচরণে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। একইসঙ্গে, এই ধরনের পুরুষদের মধ্যে বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার চিন্তায় ভোগার ঝুঁকিও অনেক বেশি।

মুভেম্বরের জরিপে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। যেসব তরুণ তথাকথিত ম্যাসকুলিনিটি ইনফ্লুয়েন্সার বা আলফা মেইলদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত, তাদের মধ্যে বেশ কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে-

  • তারা মানসিকভাবে অধিকতর হীনম্মন্যতা ও অস্থিরতায় ভোগেন।
  • শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে তারা ক্ষতিকর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে আগ্রহী এবং ক্ষত থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত শরীরচর্চায় লিপ্ত হন।
  • মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয় না
  • বন্ধু মহলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তারা সম্পদ ও জনপ্রিয়তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন।

জেনজি-রা ম্যানোস্ফিয়ারের প্রধানতম চরিত্র?

ম্যানোস্ফিয়ারে নারীদের নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো মূলত এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও নারী-পুরুষ বৈষম্য তৈরি করে, যা নারীদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। ‘ইউএন উইমেন’-এর জেন্ডার সমতা বিষয়ক উদ্যোগ ‘হি-ফর-শি’ (HeForShe)-এর সমর্থনে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপ বলছে, জেনারেশন জি বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণরাই অনলাইনে সবচেয়ে বেশি লিঙ্গবিদ্বেষী প্রচারণার শিকার হচ্ছে। একইসঙ্গে, বয়স্ক পুরুষদের তুলনায় বর্তমান সময়ের তরুণদের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্যমূলক ও পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে যা নারীর সমঅধিকারের লড়াইয়ের পথে হুমকি।

তথ্যসূত্র: ইউএন উইমেন, মেরিয়াম-ওয়েবস্টার, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ইউকে, দ্য গার্ডিয়ান।

সম্পর্কিত