সামদানী হক নাজুম

গেল ৭ মার্চ, শনিবার। এদিন বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোর অপরাধে শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান সম্পাদক আসিফ আহমেদকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। এর প্রতিবাদে রাতে থানার সামনে অবস্থান নিয়ে আবার ভাষণ বাজানো কর্মসূচি পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আবদুল আল মামুন।
এ সময় ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের, মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ, এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসিরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাধায় পণ্ড হয় সে কর্মসূচি এবং মাইকসহ রিকশা জব্দ করে দুজনকে হস্তান্তর করা হয় শাহবাগ থানায়। পরে তিনজনকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এই মামলার মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভের এক মাসের মধ্যেই এ আইনের ব্যবহার করল বিএনপি সরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও এই আইনের প্রয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা সভায় মব সৃষ্টি করে লাঞ্ছিত করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের। সেদিন পুলিশ মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান না নিয়ে উল্টো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১৬ জন সাংবাদিক, অধ্যাপক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধেও করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা।
ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই এই আইনকে ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একই আইন ব্যবহার করে গত বছরের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
এ আইনের প্রয়োগ দেখা যায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলেও। সরকার পতনের ৪ দিন আগেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করেছিল সাবেক আওয়ামী সরকার।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনটিকে বলা হয় মূলত বিরোধী পক্ষকে দমন করার সরকারি হাতিয়ার। এ কারণে এটি কালো আইন হিসেবে স্বীকৃতি পায় সমালোচকদের কাছে। ‘সন্ত্রাসবাদী কাজ’-এর বিস্তৃত সংজ্ঞা, অস্পষ্ট পরিভাষা এবং নির্বিচারে প্রয়োগের শঙ্কার কারণে ২০০৯ সালে এই আইন সমালোচনার মুখে পড়ে।
‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়ক এবং মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির মনে করেন, বিরোধীদলকে দমন করতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সৃষ্টি। ফলে ক্ষমতায় থাকা দল এর যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ পায়। এমন কালা কানুনের অপপ্রয়োগের জন্য মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন হয় উল্লেখ করে খুশী কবির বলেন, “যেকোনো অপরাধ বা যেকোনো অপরাধীকে যখন-তখন এই আইনের মামলায় জড়িয়ে ফেলা হয়। এমনটা করাই হয়েছে, যেন কাউকে পছন্দ না হলেই তাকে জেলে ভরে ফেলা যায়, বিরোধী মত সহজেই দমন করা যায়। এই ধরনের আইনের প্রয়োগ বিদ্যমান থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার কখনোই নিশ্চিত হবে না।”
আইনটি তৈরির প্রেক্ষাপট
সন্ত্রাসবিরোধী আইন করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০০৪ সাল থেকেই। ২০০৮ সালের জুন মাসে সামরিক বাহিনী সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশটি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিল আকারে উত্থাপন এবং সেটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯’ হিসেবে পাস করা হয়। পরে ২০১২ এবং ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। সবশেষ ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তা এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

আইনটি বিতর্কিত যে কারণে
সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ প্রণয়নের প্রস্তাব থেকেই এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। এর মূল কারণ হলো, সংজ্ঞার অস্পষ্টটা। যেমন–আইনটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৬ নম্বর ধারায় ও এর উপধারায় অপরাধ এবং দণ্ডকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়–
৬। (১) যদি কোন ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক–
(ক) বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করিবার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোন অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোন সত্তা বা কোন ব্যক্তিকে কোন কার্য করিতে বা করা হইতে বিরত রাখিতে বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে–
(অ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(আ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর জখম, আটক বা অপহরণ করার জন্য অপর কোন ব্যক্তিকে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা
(ই) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(ঈ) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করিবার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা
(উ) উপ-দফা (অ), (আ), (ই) বা (ঈ)-এর উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোন বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বা নিজ দখলে রাখে;
(খ) অন্য কোন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত বা উহার সম্পত্তি বিনষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে দফা (ক)-এর উপ-দফা (অ), (আ), (ই), (ঈ) বা (উ)-এর অনুরূপ কোন অপরাধ সংঘটন করে বা সংঘটনের প্রচেষ্টা করে বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচিত, ষড়যন্ত্র বা সহায়তা করে;
(গ) কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কোন কার্য করিতে বা করা হইতে বিরত রাখিবার জন্য দফা (ক)-এর উপ-দফা (অ), (আ), (ই), (ঈ) বা (উ)-এর অনুরূপ কোন অপরাধ সংঘটন করে বা সংঘটনের উদ্যোগ গ্রহণ করে বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচিত, ষড়যন্ত্র বা সহায়তা করে;
(ঘ) জ্ঞাতসারে কোন সন্ত্রাসী সম্পত্তি ব্যবহার করে বা অধিকারে রাখে;
(ঙ) এই আইনের তফসিল-১ এ অন্তর্ভুক্ত জাতিসংঘ কনভেনশনে বর্ণিত কোন অপরাধ করিতে সহায়তা, প্ররোচিত বা ষড়যন্ত্র করে বা সংঘটন করে বা সংঘটন করিবার প্রচেষ্টা করে;
(চ) কোন সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরি পরিস্থিতিতে (hostilities in a situation of armed conflict) সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন নাই এইরূপ কোন বেসামরিক, কিংবা অন্য কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাইবার বা মারাত্মক শারীরিক জখম ঘটাইবার অভিপ্রায়ে এইরূপ কোন কার্য করে, যাহার উদ্দেশ্য, উহার প্রকৃতিগত বা ব্যাপ্তির কারণে, কোন জনগোষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোন সরকার বা রাষ্ট্র বা কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কোন কার্য করিতে বা কোন কার্য করা হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য করে;
তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক ‘সন্ত্রাসী কার্য’ সংঘটনের অপরাধ করিয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।
এই অপরাধের সংজ্ঞায় অনেক ফাঁক-ফোকর এবং দুর্বলতা আছে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তারা মনে করেন আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রয়োগের লক্ষ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে এসব অস্বচ্ছ সংজ্ঞা আইনটিতে রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব চরচাকে বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আইনটি নিজেই।” তিনি বলেন, “আইনের সংজ্ঞা ধরে বোঝার উপায় নেই কে ‘সন্ত্রাসী’ আর কোনটা ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’। কাকে আপনি সন্ত্রাসী মনে করবেন, তা যদি স্পষ্ট না হয়, তবে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার কোন কাজটাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলবেন, সেটাও সুনির্দিষ্ট না হলে আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করা যাবে না। এই ধরুন, একটি ঘটনা আমার দৃষ্টিতে এক রকমের অপরাধ মনে হতে পারে, আবার অন্য কারো কাছে সেটি অপরাধ নাও মনে হতে পারে, তখন আপনি কী করবেন? এই ধরনের সংকট এড়ানোর জন্যই তো আইন করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংজ্ঞা এতটাই অস্বচ্ছ যে, ডিআরইউতে কেউ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সেমিনার আয়োজন করলেও তারা সন্ত্রাসী হয়ে যান। অর্থাৎ, সংজ্ঞাটাই এমন, যেন আপনি ইচ্ছামতো যে কাউকেই এই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।”
হুমায়ুন কবির পল্লব বলেন, “এ ধরনের কালো আইনগুলোর অপপ্রয়োগ বন্ধে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। তবে তারা তা করেনি। রাজনৈতিক সরকার এই আইন তাদের সুবিধায় ব্যবহার করতে চাইবে, তা খুবই স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ভালো সুযোগ ছিল এ নিয়ে কিছু একটা করার। ওই যে কথায় আছে না, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ–এ ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।”
এ আইনের অপপ্রয়োগ রোধে, প্রতিটি থানায় লিগ্যাল টিম গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব। তিনি বলেন, “আইন যেহেতু হয়েছে, এর অপব্যবহার রোধে মনিটরিং জরুরি। প্রতিটি থানায় একটি করে লিগ্যাল টিম রাখা যেতে পারে। মামলার আবেদন হলে ওই টিম মামলাটির কারণ, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দেখবে। মামলার মেরিট থাকলে মামলা হবে, নইলে খারিজ হবে।”

গেল ৭ মার্চ, শনিবার। এদিন বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোর অপরাধে শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান সম্পাদক আসিফ আহমেদকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। এর প্রতিবাদে রাতে থানার সামনে অবস্থান নিয়ে আবার ভাষণ বাজানো কর্মসূচি পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আবদুল আল মামুন।
এ সময় ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের, মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ, এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসিরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাধায় পণ্ড হয় সে কর্মসূচি এবং মাইকসহ রিকশা জব্দ করে দুজনকে হস্তান্তর করা হয় শাহবাগ থানায়। পরে তিনজনকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এই মামলার মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভের এক মাসের মধ্যেই এ আইনের ব্যবহার করল বিএনপি সরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও এই আইনের প্রয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা সভায় মব সৃষ্টি করে লাঞ্ছিত করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের। সেদিন পুলিশ মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান না নিয়ে উল্টো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১৬ জন সাংবাদিক, অধ্যাপক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধেও করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা।
ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই এই আইনকে ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একই আইন ব্যবহার করে গত বছরের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
এ আইনের প্রয়োগ দেখা যায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলেও। সরকার পতনের ৪ দিন আগেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করেছিল সাবেক আওয়ামী সরকার।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনটিকে বলা হয় মূলত বিরোধী পক্ষকে দমন করার সরকারি হাতিয়ার। এ কারণে এটি কালো আইন হিসেবে স্বীকৃতি পায় সমালোচকদের কাছে। ‘সন্ত্রাসবাদী কাজ’-এর বিস্তৃত সংজ্ঞা, অস্পষ্ট পরিভাষা এবং নির্বিচারে প্রয়োগের শঙ্কার কারণে ২০০৯ সালে এই আইন সমালোচনার মুখে পড়ে।
‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়ক এবং মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির মনে করেন, বিরোধীদলকে দমন করতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সৃষ্টি। ফলে ক্ষমতায় থাকা দল এর যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ পায়। এমন কালা কানুনের অপপ্রয়োগের জন্য মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন হয় উল্লেখ করে খুশী কবির বলেন, “যেকোনো অপরাধ বা যেকোনো অপরাধীকে যখন-তখন এই আইনের মামলায় জড়িয়ে ফেলা হয়। এমনটা করাই হয়েছে, যেন কাউকে পছন্দ না হলেই তাকে জেলে ভরে ফেলা যায়, বিরোধী মত সহজেই দমন করা যায়। এই ধরনের আইনের প্রয়োগ বিদ্যমান থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার কখনোই নিশ্চিত হবে না।”
আইনটি তৈরির প্রেক্ষাপট
সন্ত্রাসবিরোধী আইন করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০০৪ সাল থেকেই। ২০০৮ সালের জুন মাসে সামরিক বাহিনী সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশটি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিল আকারে উত্থাপন এবং সেটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯’ হিসেবে পাস করা হয়। পরে ২০১২ এবং ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। সবশেষ ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তা এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

আইনটি বিতর্কিত যে কারণে
সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ প্রণয়নের প্রস্তাব থেকেই এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। এর মূল কারণ হলো, সংজ্ঞার অস্পষ্টটা। যেমন–আইনটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৬ নম্বর ধারায় ও এর উপধারায় অপরাধ এবং দণ্ডকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়–
৬। (১) যদি কোন ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক–
(ক) বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করিবার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোন অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোন সত্তা বা কোন ব্যক্তিকে কোন কার্য করিতে বা করা হইতে বিরত রাখিতে বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে–
(অ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(আ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর জখম, আটক বা অপহরণ করার জন্য অপর কোন ব্যক্তিকে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা
(ই) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(ঈ) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করিবার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা
(উ) উপ-দফা (অ), (আ), (ই) বা (ঈ)-এর উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোন বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বা নিজ দখলে রাখে;
(খ) অন্য কোন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত বা উহার সম্পত্তি বিনষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে দফা (ক)-এর উপ-দফা (অ), (আ), (ই), (ঈ) বা (উ)-এর অনুরূপ কোন অপরাধ সংঘটন করে বা সংঘটনের প্রচেষ্টা করে বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচিত, ষড়যন্ত্র বা সহায়তা করে;
(গ) কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কোন কার্য করিতে বা করা হইতে বিরত রাখিবার জন্য দফা (ক)-এর উপ-দফা (অ), (আ), (ই), (ঈ) বা (উ)-এর অনুরূপ কোন অপরাধ সংঘটন করে বা সংঘটনের উদ্যোগ গ্রহণ করে বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচিত, ষড়যন্ত্র বা সহায়তা করে;
(ঘ) জ্ঞাতসারে কোন সন্ত্রাসী সম্পত্তি ব্যবহার করে বা অধিকারে রাখে;
(ঙ) এই আইনের তফসিল-১ এ অন্তর্ভুক্ত জাতিসংঘ কনভেনশনে বর্ণিত কোন অপরাধ করিতে সহায়তা, প্ররোচিত বা ষড়যন্ত্র করে বা সংঘটন করে বা সংঘটন করিবার প্রচেষ্টা করে;
(চ) কোন সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরি পরিস্থিতিতে (hostilities in a situation of armed conflict) সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন নাই এইরূপ কোন বেসামরিক, কিংবা অন্য কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাইবার বা মারাত্মক শারীরিক জখম ঘটাইবার অভিপ্রায়ে এইরূপ কোন কার্য করে, যাহার উদ্দেশ্য, উহার প্রকৃতিগত বা ব্যাপ্তির কারণে, কোন জনগোষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোন সরকার বা রাষ্ট্র বা কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কোন কার্য করিতে বা কোন কার্য করা হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য করে;
তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক ‘সন্ত্রাসী কার্য’ সংঘটনের অপরাধ করিয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।
এই অপরাধের সংজ্ঞায় অনেক ফাঁক-ফোকর এবং দুর্বলতা আছে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তারা মনে করেন আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রয়োগের লক্ষ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে এসব অস্বচ্ছ সংজ্ঞা আইনটিতে রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব চরচাকে বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আইনটি নিজেই।” তিনি বলেন, “আইনের সংজ্ঞা ধরে বোঝার উপায় নেই কে ‘সন্ত্রাসী’ আর কোনটা ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’। কাকে আপনি সন্ত্রাসী মনে করবেন, তা যদি স্পষ্ট না হয়, তবে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার কোন কাজটাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলবেন, সেটাও সুনির্দিষ্ট না হলে আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করা যাবে না। এই ধরুন, একটি ঘটনা আমার দৃষ্টিতে এক রকমের অপরাধ মনে হতে পারে, আবার অন্য কারো কাছে সেটি অপরাধ নাও মনে হতে পারে, তখন আপনি কী করবেন? এই ধরনের সংকট এড়ানোর জন্যই তো আইন করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংজ্ঞা এতটাই অস্বচ্ছ যে, ডিআরইউতে কেউ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সেমিনার আয়োজন করলেও তারা সন্ত্রাসী হয়ে যান। অর্থাৎ, সংজ্ঞাটাই এমন, যেন আপনি ইচ্ছামতো যে কাউকেই এই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।”
হুমায়ুন কবির পল্লব বলেন, “এ ধরনের কালো আইনগুলোর অপপ্রয়োগ বন্ধে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। তবে তারা তা করেনি। রাজনৈতিক সরকার এই আইন তাদের সুবিধায় ব্যবহার করতে চাইবে, তা খুবই স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ভালো সুযোগ ছিল এ নিয়ে কিছু একটা করার। ওই যে কথায় আছে না, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ–এ ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।”
এ আইনের অপপ্রয়োগ রোধে, প্রতিটি থানায় লিগ্যাল টিম গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব। তিনি বলেন, “আইন যেহেতু হয়েছে, এর অপব্যবহার রোধে মনিটরিং জরুরি। প্রতিটি থানায় একটি করে লিগ্যাল টিম রাখা যেতে পারে। মামলার আবেদন হলে ওই টিম মামলাটির কারণ, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দেখবে। মামলার মেরিট থাকলে মামলা হবে, নইলে খারিজ হবে।”

জ্বালানি সংকটের গুজবে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্রাহকরা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার বাইরে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্রাহক