এনসিপির ইশতেহারে সেকেন্ড রিপাবলিকসহ আর যা আছে

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
এনসিপির ইশতেহারে সেকেন্ড রিপাবলিকসহ আর যা আছে
এনসিপির ইশতেহারের প্রচ্ছদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩৬ দফার ইশতেহান ঘোষণা করেছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে লক্ষ্য করে দলটির ঘোষিত ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জুলাই গণআন্দোলন পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশ্লেষণধর্মী মহাপরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আজ শুক্রবার ঢাকার একটি হোটেলে ভোটের ১৩ দিন আগে ইশতেহার প্রকাশ করল এনসিপি।

৩৬ দফার এই ইশতেহারে এনসিপি স্পষ্ট করেছে যে, তারা বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে একটি ‘সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ নির্মাণ করতে চায়। দল শুরুর সময়ও এনসিপি সেকেন্ড রিপাবলিকের কথা বলেছিল। ইশতেহারেও সেই একই কথা তুলেছে ধরেছে দলটি।

ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব দিতে ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল চালুর মতো প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দলটির ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কারের দলিল জুলাই সনদের প্রসঙ্গ এসেছে। এসেছে অভ্যুত্থানে সময় সংঘটিত হত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা, শাপলা চত্বর ও পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রতিশ্রুতি।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। এর তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার, ‍জুলাই আন্দোলনের সময়ের হত্যা ও গুম-নির্যাতনের বিচার ও নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দেয়।

আর রাজনীতিতে নয়া বন্দোবস্তের লক্ষ্য ধরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। এবারের নির্বাচনে দলটি জামায়াতের ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য নামে মোর্চা গড়েছে।

অনুষ্ঠানে এনসিপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের নেতা আদনান ফয়সাল ও নুসরাত তাবাসসুম। বক্তব্য রাখেন দলের নেতা নাহিদ ইসলাম।

দলটির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম দফায় বলা হয়েছে, জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের উপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।

ভিত্তি ও দর্শন

২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে পরিচালিত ‘জুলাই পদযাত্রা এবং তৃণমূলের লক্ষাধিক মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে ভূমিকায় বলা হয়েছে। দলটির মতে, জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল পুরোনো শোষণমূলক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার গণরায়। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতেই এনসিপি তাদের রাষ্ট্র সংস্কারের কর্মসূচি সাজিয়েছে ।

অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ: ন্যায্যতার রূপরেখা

বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে এনসিপি আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। ইশতেহারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কর কাঠামোর সংস্কার। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬-৭.৮ শতাংশ, যা এশিয়ায় সর্বনিম্ন । এনসিপি আগামী পাঁচ বছরে এই অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে ধনীদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দলটি বলছে, মাসিক ৭০ হাজার টাকার নিচে আয়কারীদের আয়কর কমানো হবে এবং ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কে করমুক্ত রাখা হবে। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভ্যাট ও আমদানিশুল্ক মুক্ত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মুদ্রানীতিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করার বিষয়টিও ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে।

তারুণ্য ও কর্মসংস্থান: এক কোটি নতুন সুযোগ

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এনসিপি ভোটাধিকারের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।

দলটি বলছে, ১৬-১৮ বছরের তরুণদের সিভিক ও ডিজিটাল সচেতনতা গড় ভোটারের চেয়ে বেশি, তাই তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা অপরিহার্য।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এনসিপি আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা দিয়েছে। এর মধ্যে আইটি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে ১৫ লাখ, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে ২৫ লাখ এবং নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ১৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে । ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের বিকাশে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন এবং নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম পাঁচ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা দল এনসিপি।

সুশাসন ও বিচারব্যবস্থা: জবাবদিহিতার নতুন মডেল

এনসিপি তাদের ইশতেহারে সুশাসনের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মন্ত্রী, এমপি এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করতে ‘হিসাব দাও’ নামক একটি ডিজিটাল পোর্টাল চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমলাতন্ত্রে ল্যাটারাল এন্ট্রি বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি পারফরম্যান্স-ভিত্তিক করার কথা বলা হয়েছে।

জুলাই গণহত্যা, শাপলা চত্বর গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ সব ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচারের জন্য একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের সংস্কার এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আইনি কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

এনসিপির লোগো
এনসিপির লোগো

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: মৌলিক অধিকারে আমূল পরিবর্তন

শিক্ষা খাতে এনসিপি জিডিপির বরাদ্দ ধাপে ধাপে ছয় শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। দলটির একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব হলো-সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন হবে পরিবারের আয়ের ওপর ভিত্তি করে। পাঁচ বছরের মধ্যে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো চালুর কথা বলা হয়েছে। উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করতে স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের ইন্টারনশিপ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে এনসিপি ‘ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স’ চালুর মাধ্যমে শতভাগ নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে চায়। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ‘স্পেশালাইজড হেলথকেয়ার জোন’ (এসএইচজেড) গড়ে তোলা হবে, যাতে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা পাচার রোধ করা সম্ভব হয়। এছাড়া জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন: প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এনসিপি জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে ১০০টি আসন সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া সব প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ও এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিশেষ বাস সার্ভিস ‘কাজে যাই’ এবং এলাকাভিত্তিক শাটল সার্ভিস ‘এদিক-ওদিক’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা: সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা

এনসিপির পররাষ্ট্রনীতি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম-মর্যাদার ভিত্তিতে। ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং শেখ হাসিনাসহ অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালত ও সংস্থায় যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে দলটি।

প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এনসিপি প্রচলিত বাহিনীর দ্বিগুণ আকারের একটি ‘রিজার্ভ ফোর্স তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। যেখানে প্রতি বছর ৩০ হাজার তরুণকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি (ড্রোন) ব্রিগেড গঠন এবং মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি

এনসিপির এই ৩৬ দফা ইশতেহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতানুগতিক উন্নয়নের পরিবর্ত কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে। ভোটাধিকারের বয়স কমানো বা ‘হিসাব দাও’ পোর্টালের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন পদক্ষেপ। অর্থনীতিতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর অবকাশ দেওয়ার পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে। এনসিপি তাদের ইশতেহারে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে চিহ্নিত করেছে।

তবে এক কোটি কর্মসংস্থান এবং ধাপে ধাপে সব খাতে জাতীয়করণের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হবে। এনসিপি এই অর্থের উৎস হিসেবে রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং দুর্নীতি রোধের মাধ্যমে সংগৃহীত অতিরিক্ত ২ দশমিক ৩ লাখ কোটি টাকার একটি পরিকল্পনাও দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, এনসিপির এই ইশতেহারটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ‘আকাঙ্ক্ষাকে’ রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করার একটি প্রচেষ্টা। এটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও শাসনব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলে আশা করছে এনসিপি। তারা বলছে, ‘তারুণ্য ও মর্যাদার বাংলাদেশ’ স্লোগানটি কেবল স্লোগান নয়, বরং একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করবে।

সম্পর্কিত