সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর দেশে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সংসদ কক্ষে এই ভোট হবে। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন।
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘অসুস্থতাজনিত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সংবিধান ও বিদ্যমান আইনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া,সময়সীমা ও ধাপগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ীই ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন শুরু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর এই সময়সীমা কার্যকর হয়েছে। এদিকে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বিধি অনুযায়ী, মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর থেকেই সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ভারপ্রাপ্ত স্পিকার হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এই নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করে।
এই প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের দিন ও সময় নির্ধারণ করা হয়। সংসদ অধিবেশনে থাকলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে এবং অধিবেশন না থাকলে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হন সংসদ সদস্যরা। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভোটগ্রহণ করা হয়।
ব্যালট পেপারের ভোট হয়। ভোটগ্রহণ ও গণনা–দুটোই প্রকাশ্যে হয়। প্রয়োজন হলে সংসদ কক্ষে একাধিক ভোট কাউন্টার স্থাপন করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, ভোটে অংশ নিতে সংসদ সদস্যদের সংসদ সচিবালয় থেকে সরবরাহ করা আইডি কার্ড সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে নিজ আসনে বসার পর সহায়তাকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে নাম ও বিভক্তি নম্বর মুদ্রিত ব্যালট পেপার সংগ্রহ করতে হবে। ব্যালটের কাউন্টার ফয়েল বা মুড়িতে নির্ধারিত স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে তা কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিতে হবে।
ব্যালট পেপার হাতে পাওয়ার পর পছন্দের প্রার্থীর নামের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফাঁকা স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে ভোট দিতে হবে। ব্যালটে ভোটারের স্বাক্ষরের জায়গায় পূর্ণ নাম লেখা বাধ্যতামূলক। ভোট দেওয়া শেষে ব্যালট পেপার সংসদ কক্ষে রাখা নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে।
ভোট চলাকালে সংসদ কক্ষে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচার, বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভোটদান প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংসদ সদস্যরা চিফ হুইপ ও বিরোধী দলের চিফ হুইপের কাছে পরামর্শের জন্য যেতে পারবেন।
দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ওই একবারই সংসদের কক্ষে ভোট হয়েছিল। এরপর সাতজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ক্ষমতাসীন দলগুলোর বাইরে আর কোনো প্রার্থী এসময় ছিল না। এবার দুজন প্রার্থী হওয়ায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৯ সংসদ সদস্য ভোটার। বর্তমানে চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনটি শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি দল বিএনপির আসন রয়েছে ২৪৭টি এবং বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের আসন রয়েছে ৯০টি। এ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে রাষ্ট্রপতি পদে বিজয়ী হতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুলকে শুধু ভোটের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এরই মধ্যে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষায়’ ১১ দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। রাজনীতি সবক্ষেত্র ‘স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার জন্যই তারা এই ভোটে অংশ নিচ্ছেন।
১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। সেই সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিনিময়ে তারা জামায়াতকে সংরক্ষিত নারী আসনের দুটি ছেড়ে দেয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আজমের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের সমর্থন তিনি পাননি।
ভোটের ফলাফল ছিল আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭০, বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২। ধারণা করা হয়, আওয়ামী লীগ যাদের ওপর ভরসা করে আলাদা প্রার্থী দিয়েছিল, তারাও বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দেননি। জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু সদস্য ভোটদানে বিরত থেকেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, যে প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পান, তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। যদি একাধিক প্রার্থী সমানসংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তোড়জোর শুরু হওয়ার পর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি হলো–এই ভোট কি সংসদে কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর দলীয় অবস্থানের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সমান, নাকি এটি সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক নির্বাচনী দায়িত্বের একটি স্বতন্ত্র প্রয়োগ?
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।