ads

ক্রেডিট কার্ড এল কোথা থেকে?

ক্রেডিট কার্ড এল কোথা থেকে?
পকেটে এক টুকরো প্লাস্টিক, আর তাতেই দুনিয়ার যেকোনো প্রান্ত থেকে নিমেষেই সেরে নেওয়া যাচ্ছে কেনাকাটা। ছবি: সংগৃহীত

মানিব্যাগভর্তি ক্যাশ টাকা নিয়ে ঘোরার দিন এখন অনেকটাই অতীত। আমাদের দৈনন্দিন কেনাকাটা কিংবা ঝটপট রেস্তোরাঁর বিল মেটাতে এখন সবচেয়ে বড় ভরসা মানিব্যাগের কোণায় থাকা ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের কার্ড, যাকে আমরা চিনি ক্রেডিট কার্ড নামে।

পকেটে এক টুকরো প্লাস্টিক, আর তাতেই দুনিয়ার যেকোনো প্রান্ত থেকে নিমেষেই সেরে নেওয়া যাচ্ছে কেনাকাটা। সহজ কথায়, এটি এমন একটি আর্থিক পরিষেবা যা গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের পকেটের টাকা খরচ না করেই পণ্য বা সেবা কেনার সুযোগ দেয়। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের আয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট খরচের সীমা বা লিমিট নির্ধারণ করে দেয়, যা নির্দিষ্ট সময় পর গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়।

ক্রেডিট কার্ড মূলত এক ধরনের স্বল্পমেয়াদি জামানতহীন ঋণ, যা আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রাকে করেছে গতিশীল। তবে আজকের এই ডিজিটাল লেনদেনের রূপান্তর কিন্তু রাতারাতি হয়নি। মেসোপটেমিয়ার মাটির ফলক থেকে শুরু করে আজকের ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ডের এই অবস্থানে আসার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। 

ক্রেডিট কার্ডের শুরু যেভাবে

১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয় মার্কিন সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ এডওয়ার্ড বেলামির লেখা ইউটোপিয়ান উপন্যাস ‘লুকিং ব্যাকওয়ার্ড’। উপন্যাসটিতে তিনিই সর্বপ্রথম কার্ড দিয়ে অর্থ পরিশোধের চিত্রকল্প তুলে ধরেন। এতে বেলামি ‘ক্রেডিট কার্ড’ শব্দটি ১১ বার ব্যবহার করেন।

তবে ফোর্বসের এক প্রতিবেদন বলছে, ক্রেডিটের (বাকিতে লেনদেন) ধারণাটি হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় শুরু হয়েছিল। সে আমলের মাটির ফলকে খোদাই করা লিপিগুলো মেসোপটেমিয়া এবং তাদের প্রতিবেশী হরপ্পার ব্যবসায়ীদের মধ্যকার লেনদেনের বিবরণ প্রদর্শন করে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জিনিস কিনে পরবর্তীকালে তার মূল্য পরিশোধের চুক্তির ক্ষেত্রে এগুলোকে প্রাচীনতম উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম ধরা হয়।

হাজার হাজার বছর পর, এই প্রাচীন দেনা স্বীকারপত্রগুলোই একসময় প্রাথমিক যুগের ‘স্টোর কার্ড’-এর রূপ নেয়। আমেরিকার ওল্ড ওয়েস্ট বা পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এমন সব কৃষক ও পশুপালকদের বাকিতে মালামাল দিতেন, যাদের প্রয়োজনীয় রসদ কেনার মতো টাকা থাকত না। ঋণ বা দায়ের রসিদ হিসেবে ব্যবসায়ীরা তখন ধাতব মুদ্রা বা ছোট প্লেট ইস্যু করতেন। পরবর্তী সময়ে কৃষকরা তাদের ফসল কাটার পর এবং পশুপালকরা তাদের গবাদিপশু বিক্রি করে ব্যবসায়ীর সেই ঋণ পরিশোধ করে দিতেন।

দ্য চারগা প্লেট। ছবি: সংগৃহীত
দ্য চারগা প্লেট। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন শিক্ষাবিষয়ক ওয়েবসাইট থটকোর এক প্রতিবেদন বলছে, ইউরোপে ১৮৯০ সালের দিকেই ক্রেডিট কার্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সময়ের সাথে সাথে, পূর্ণাঙ্গ মূল্য পরিশোধের এই বিকল্প মাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিবর্তিত হয়ে এমন রূপ ধারণ করে, যা আমাদের আজকের পরিচিত ক্রেডিট কার্ডগুলোর সাথে বেশ অনেকটাই মিলে যায়।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল। ইতিহাসবিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৮ সালে ‘দ্য চারগা প্লেট’ নামে এক আয়তাকার ধাতব পাত তৈরি করে ফ্যারিংটন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। এটি দেখতে অনেকটা মিলিটারি ডগ ট্যাগের মতো দেখতে। চার্জ প্লেটগুলো কিছু তেল কোম্পানি এবং হোটেল চেইনের মতো কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের বিশ্বস্ত বা মেম্বারশিপধারী গ্রাহকদের জন্য এগুলো ইস্যু করা শুরু করে। ১৯৩৮ সালের কাছাকাছি সময়ে কোম্পানিগুলো একে অপরের কার্ড গ্রহণ শুরু করে।

পরবর্তীতে অনেক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে এমন চার্জ প্লেট ব্যবহার শুরু হয়।

এদিকে ১৯৩৪ সালে ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স’ এবং ‘এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন’ কাস্টমারদের উড়োজাহাজের টিকিট ক্রয় সহজলভ্য করতে ‘Buy Now & Pay Later’ সুবিধার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে ট্রাভেল কার্ডের পরিচয় করিয়ে দেয়।

প্রথম ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড

ব্যাংক থেকে ইস্যু করা প্রথম ক্রেডিট কার্ডের উদ্ভাবক ছিলেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটবুশ ন্যাশনাল ব্যাংকের জন বিগিন্স। ১৯৪৬ সালে বিগিন্স ব্যাংক গ্রাহক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে লেনদেনের জন্য ‘চার্জ-ইট’ প্রোগ্রাম চালু করেন। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা তাদের বিক্রির রশিদ ব্যাংকে জমা দিতে পারতেন এবং ব্যাংক সেই কার্ড ব্যবহারকারী গ্রাহকের নামে বিল পাঠাত।

ডাইনার্স ক্লাব ক্রেডিট কার্ড

১৯৫০ সালে ডাইনার্স ক্লাব যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে। ডাইনার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঙ্ক ম্যাকনামারা রেস্তোরাঁ বিল পরিশোধের একটি মাধ্যম হিসেবে এই কার্ডের উদ্ভাবন করেন। এর প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঙ্ক ম্যাকনামারা একবার বাইরে ডিনার করতে গিয়ে নিজের মানিব্যাগ বাড়িতে ভুলে ফেলে আসেন এবং এই ঘটনা থেকেই তিনি কার্ডটি তৈরির অনুপ্রেরণা পান। তিনি এবং তার অংশীদার রালফ স্নাইডার মিলে প্রথম ‘ডাইনার্স ক্লাব’ কার্ড চালু করেন, যা আধুনিক চার্জ কার্ডের জন্মলগ্ন হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

এই কার্ডধারী গ্রাহকরা রেস্তোরাঁর বিল কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতেন এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ সেই বিল ডাইনার্স ক্লাবের কাছে পাঠিয়ে দিত। ডাইনার্স ক্লাব লেনদেনের জন্য সামান্য কমিশন রেখে সরাসরি রেস্তোরাঁর ব্যাংকে টাকা পরিশোধ করত। আর কার্ডধারীদের প্রতি মাসে তাদের পুরো বিলটি ডাইনার্স ক্লাবকে পরিশোধ করতে হতো।

ডাইনার্স ক্লাব কার্ড প্রথম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া স্টোর কার্ডে পরিণত হয়। কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছরেই ডাইনার্স ক্লাবের পরিধি নিউইয়র্কের ১০ হাজার ব্যবসায়ী, ২৮টি রেস্তোরাঁ ও ২টি হোটেল থেকে বেড়ে আমেরিকার প্রধান প্রধান শহরগুলোয় ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্যে গিয়ে দাঁড়ায়।

আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড

মালপত্র পরিবহনের কোম্পানি হিসেবে যাত্রা করলেও ১৮৮২ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস মানি অর্ডার এবং ১৮৯১ সালে ট্রাভেলার্স চেকের ব্যবসার দিকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। এ দুটি মাধ্যম বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা বহন করার একটি নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠেছিল। 

আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড। ছবি: সংগৃহীত
আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড। ছবি: সংগৃহীত

অবশেষে, ১৯৫৮ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস তাদের প্রথম চার্জ বা ক্রেডিট কার্ড নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা একটি বার্ষিক ফির বিনিময়ে প্রতি মাসে তাদের বিল পরিশোধের সুবিধা পেতেন। যেসব বিক্রেতা এই কার্ড গ্রহণ করতেন, তারা আমেরিকান এক্সপ্রেসকে মোট বিলের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ দিতেন–যা আজকের দিনে বহুল ব্যবহৃত ইন্টারচেঞ্জ ফি-এর পূর্বসূরি।  

ভিসা কার্ড

যে বছর আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড বাজারে এল, ওই একই বছর মানে ১৯৫৮ সালের শেষের দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনো শহরে অবস্থিত ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’ আরও এক ধাপ এগিয়ে ৬৫ হাজার গ্রাহকের জন্য ৩০০ (মতান্তরে ৫০০) ডলারের পূর্ব-অনুমোদিত সীমা নির্ধারণ করে ‘ব্যাংকআমেরিকাকার্ড’ ইস্যু করে।

মার্কিন ওয়েবসাইট মিডিয়ামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহকরা কোনো আবেদন না করতেই তাদের নামে নির্দিষ্ট লিমিটসহ কার্ড চলে আসে। ইতিহাসে এই ঘটনাটিকে ‘ফ্রেসনো ড্রপ’ বলা হয়। এটিই ছিল আধুনিক ক্রেডিট কার্ডের প্রথম বড় আকারের পরীক্ষা।

তাদের এই প্রথম প্রচেষ্টাটি ছিল একটি ব্যয়বহুল ভুল সিদ্ধান্ত, যার ফলে ঋণখেলাপির হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং ব্যাপক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।

তবে প্রতি মাসে বকেয়া ব্যালেন্স রেখে দেওয়ার সুবিধাযুক্ত এই ‘রিভলভিং ক্রেডিট কার্ড’-এর ধারণাটি শেষ পর্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়। আমেরিকার ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই নতুন আর্থিক পণ্যটি লুফে নেয়, যা একইসাথে সুবিধা এবং তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত ঋণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।

১৯৭৬ সালে ‘ব্যাংকআমেরিকাকার্ড’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ভিসা’ কার্ড রাখা হয়। তৎকালীন ব্যাংক অব আমেরিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি হক এই নাম রাখেন। তিনি এমন একটি নাম খুঁজছিলেন, যা খুব ছোট, বিশ্বের যেকোনো ভাষার মানুষ সহজে উচ্চারণ করতে পারে এবং যা আন্তর্জাতিকভাবে ভ্রমণের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সেক্ষেত্রে ডি হকের কাছে ভিসা কার্ড নামটি বেশ যুতসই লেগেছে।

মাস্টারকার্ড

ব্যাংক অব আমেরিকা যখন ভিসা কার্ডের প্রোটোটাইপ চালু করে বাজারে একচেটিয়া রাজত্ব শুরু করে, তখন অন্যান্য প্রতিযোগী ব্যাংকগুলো বেশ বড়সড় হুমকির মুখে পড়ে। সেই একচেটিয়া আধিপত্যকে টেক্কা দিতেই মূলত মাস্টারকার্ডের উৎপত্তি হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক মিলে ‘ইন্টারব্যাংক কার্ড অ্যাসোসিয়েশন’ বা আইসিএ গঠন করে। তারা যে কার্ডটি বাজারে ছাড়ে, তার নাম দেওয়া হয় ‘মাস্টার চার্জ’। এই জোটটি কোনো একক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, বরং সদস্য ব্যাংকগুলোর কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

মাস্টারকার্ড আগে ছিল মাস্টার চার্জ। ছবি: রয়টার্স
মাস্টারকার্ড আগে ছিল মাস্টার চার্জ। ছবি: রয়টার্স

মাস্টারকার্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯৬৮ সাল থেকে এই জোট বৈশ্বিক রূপ নেয়। প্রথমে মেক্সিকো, এরপর ইউরোপের ‘ইউরোকার্ড’ এবং জাপানের ব্যাংকগুলো এতে যোগ দেয়।

১৯৭০-এর দশকের শেষ নাগাদ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও এর নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধিকে তুলে ধরতে ১৯৭৯ সালে ‘মাস্টার চার্জ’ নাম বদলে রাখা হয় ‘মাস্টারকার্ড ইন্টারন্যাশনাল’। 

আশির দশকে মাস্টারকার্ড কার্ডের পেছনে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে। ১৯৮৭ সালে এটি প্রথম পেমেন্ট কার্ড হিসেবে চীনে এবং ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ইস্যু করা হয়। নব্বইয়ের দশকে তারা ‘মায়েস্ত্রো’ ডেবিট নেটওয়ার্ক চালু করে।

২০০৬ সালে মাস্টারকার্ড নিজেদের শেয়ার বাজারে ছেড়ে একটি পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তর হয়। বর্তমানে ২১০টিরও বেশি দেশে মাস্টারকার্ড চালু রয়েছে। লাল-হলুদ বৃত্তের এই আইকনিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কটি কোটি কোটি মানুষের লেনদেন সচল রাখছে।

সম্পর্কিত