ads

পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল নিয়ে কী ছিল হাইকোর্টের রায়ে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল নিয়ে কী ছিল হাইকোর্টের রায়ে
ফাইল ছবি

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আইনজীবীরা বলছেন, এর ফলে সংবিধানে গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরল।

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজন রিট করেন। ওই রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিটকারীরা। এদিকে নওগাঁর বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হতে আপিল করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরেকটি আপিল করেন এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি নামের একটি সংগঠন লিভ টু আপিল করে শুনানিতে অংশ নেয়।

পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন এ মামলায় যুক্ত হয়। রুলের শুনানি পর্যায়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশসহ কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি ইন্টারভেনার হিসেবে যুক্ত হন।

গত সোমবার থেকে তিন দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দিলেন, তাতে হাইকোর্টের রায়ের কোনো পরিবর্তন ঘটল না।

হাইকোর্টের রায়ে কী ছিল

হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। আর এই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এছাড়া হাইকোর্টের রায়ে গণভোটের বিধান সংক্রান্ত ১৪২ অনুচ্ছেদ (দ্বাদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে আনা) পুনর্বহাল করা হয়। সেই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সম্পূর্ণ বাতিল না করে, অন্য বিধানগুলোর বিষয়ে আইন অনুসারে পরবর্তী সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়।

দেড় দশক আগে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হয়। ওই বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়।

এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত অুনচ্ছেদ সম্পূর্ণ বাতিল করা। সেটি বাতিল করে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টি সংযোজন করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আদালত কোনো নির্দেশ দিতে পারবে না বলে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।

ওই সংশোধনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এছাড় সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়।

সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা পাঁচটি বাড়িয়ে ৫০ করা হয়।

অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয় সংশোধনীতে।

এছাড়া সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, বরং বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।

২০২৫ সালের ৮ জুলাই প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট কিছু বিষয় তুলে ধরেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা হয়েছে।

হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে ৭ (ক) অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলা হয়, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তির যে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং ভিন্নমত দমনের একটি হাতিয়ার। এটি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে।

৭ (খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার বিষয়টিকে আদালত ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে ঘোষণা করেন।

৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল করার যুক্তিতে আদালত বলেন, হাই কোর্টের ক্ষমতা অন্য কোনো আদালতকে দেওয়ার বিধানটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি’।

পঞ্চদশ সংশোধনীতে ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়, “এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোন আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন।”

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী ক্ষেত্রে ‘চরম তাড়াহুড়ো’ করা হয়েছিল।

সম্পর্কিত