২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোট দেবেন ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের মধ্যে ৩০০ জন সদস্য নির্বাচন করবেন। বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যদের অনুপাতে বণ্টন করা হবে। পাশাপাশি, ভোটাররা ‘জুলাই সনদ’ নিয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন। এই সনদ হচ্ছে অভ্যুত্থানের পর ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্মত একটি সাংবিধানিক সংস্কার কাঠামো।
বাংলাদেশের এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ও সিকিউরিটি ফার্ম সোল্যাস গ্লোবাল। আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও কিছু শঙ্কার কথা বলা হয়।
প্রতিবেদন বলছে, ৩০০ আসনে ডজনখানেক দল মোট এক হাজার ৯০০ জনের বেশি প্রার্থী দিয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রচার কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। একদিকে রয়েছে বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা জরিপে এগিয়ে। বিপ্লবের আগে বিএনপি ছিল বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি আগের সরকারের বড় একটি সমর্থকগোষ্ঠীকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে রয়েছে ‘ইউনাইটেড বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত একটি জোট, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে গঠিত হয়। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশের বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উঠে আসা আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। তারা শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর প্রান্তিক অবস্থানে থাকার পর ডানপন্থী প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে, নতুন দল ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত এনসিপি শুরুতে একটি সংস্কারবাদী ও প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে রাজপথের সমর্থনকে নির্বাচনী গতিতে রূপ দিতে দলটি ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ফলে দলটি কার্যত একটি ডানপন্থী ইসলামপন্থী জোটের অংশে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এনসিপির ভেতরে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যা দলটিকে আরও দুর্বল করেছে। জানুয়ারিতে জোটে অংশ নেওয়ার প্রতিবাদে এনসিপির ১৫ শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেন।
এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্যাপক সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যেই। এসব ঘটনায় বিভিন্ন দলের যুব সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একাধিক হত্যাকাণ্ড বা শতাধিক গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সময়কার পরিস্থিতির দিকেই ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিতের কথা বলছেন অনেকে।
এর পাশাপাশি শ্রমিক বিরোধ, ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পোশাক শিল্পের কাঠামোগত পতন এবং অস্থিতিশীল চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধিও নির্বাচনী পরিবেশকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলেছে। এসব কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
উচ্চমাত্রার নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) তাদের বাংলাদেশ ভ্রমণ পরামর্শ হালনাগাদ করে দেশটিতে ‘অত্যাবশ্যক ভ্রমণ ছাড়া সব ধরনের ভ্রমণের বিরুদ্ধে’ সুপারিশ করে।
শাহবাগে জনতা। ছবি: রয়টার্স
নির্বাচনের পর কী হতে পারে
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, দুটি ভোটের লড়াইয়ের ধরন ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপুল জয় প্রায় নিশ্চিত। কারণ জুলাই সনদে সব বড় রাজনৈতিক দল ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থন রয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে।
এনসিপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থতার ফলে নির্বাচনটি মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে আদর্শগত মেরুকরণের পাশাপাাশি রাজপথের সহিংসতা বাড়তে পারে। গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের ফলাফল মেনে নেওয়া হবে কি না, সেটিই হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার বড় পরীক্ষা। বেশ কয়েকটি কারণ এই গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্রথমত, বর্তমান জরিপগুলো বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খুব কাছাকাছি বা অনিশ্চিত ফলাফল এলে ভোট গণনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশে দেরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একাধিক নেতা প্রকাশ্যে ফলাফল ‘কারচুপির ষড়যন্ত্র’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এসব বক্তব্য ভোটকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করার জন্য আগাম ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা হতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো নির্বাচনের বিরুদ্ধে অনলাইন ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতার কথা জানিয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। অনলাইনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো বাংলাদেশে গণ সহিংসতার একটি বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভোটের সময় ও পরবর্তী সময়ে তা আরও তীব্র হতে পারে।
তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অনলাইন ভুয়া তথ্যের বিস্তার সহিংসতা উসকে দিতে পারে। ভোটের পরবর্তী কয়েক দিনে কর্মকর্তা, প্রার্থী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গণ সহিংসতা, পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশি, সংখ্যালঘু বা বিদেশি মালিকানাধীন ব্যবসার ওপর হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে যদি অনলাইনে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ সংক্রান্ত অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, এই সরকারের আমলেই মার্কিন মালিকানাধীন বা মার্কিন বা ইসরায়েলপন্থী অভিযোগ তুলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক হারে হামলা হয়েছে।
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, অস্থিরতা ও সহিংসতা অনেক বেশিও হবে না, আবার কমও হবে না। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করে কি না–তার ওপর। যদি দলগুলো ফল মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করে, তবে বাংলাদেশ তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে পারে। এই সংকট এড়াতে বিরোধী দলকে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার অন্যতম অংশ হিসেবে যুক্ত রাখতে হবে। তাদের প্রান্তিক করে রাখা যাবে না।
এসব প্রক্রিয়ায় অন্তত তিনটি প্রধান দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদিও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোকেও যুক্ত করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও শ্রমসংক্রান্ত সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান না হলেও স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে পারে।
আরও সম্ভাব্য একটি দৃশ্যপট হলো, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পতনের পর রয়ে যাওয়া ‘ব্যবস্থার’ নিয়ন্ত্রণ কারা নেবে–সে ব্যাপারে সমঝোতা ব্যাহত হতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো সমঝোতায় পৌঁছালেও, স্থানীয় ও ছাত্র সংগঠনগুলো সহিংস প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে। তারা সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে।
দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে। কারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করতে পারে। ভারতের মতো তুলনামূলক স্থিতিশীল আঞ্চলিক বাজার ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ায় পুঁজি সরিয়ে নিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই ‘বিপ্লবের’ পরবর্তী অর্থবছরের ত্রৈমাসিকে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ৭১ শতাংশ কমে যায়। প্রাণঘাতী রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এই দেশকে এড়িয়ে চলছে।
কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমস্যাগুলো আরও তীব্র হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক ব্যাঘাত, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার একটি ‘চক্র’ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এসব সংকটের একটি বড় অংশ এখনো অমীমাংসিত।
সোল্যাস গ্লোবাল একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই সংস্থা, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপদভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে। বিভিন্ন নামজাদা কোম্পানিকে সহায়তা দেওয়া সোল্যাস স্থল, মেরিটাইম এবং সাইবার স্পেস থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলা করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সেবা দিয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি ভ্রমণ নিরাপত্তা, অফশোর অপারেশন, কর্পোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দেয়। বিভিন্ন কোম্পানি এইসব সেবা গ্রহণ করে এবং নানা দেশ ও এলাকায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
জুলাই ছাত্র আন্দোলন। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোট দেবেন ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের মধ্যে ৩০০ জন সদস্য নির্বাচন করবেন। বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যদের অনুপাতে বণ্টন করা হবে। পাশাপাশি, ভোটাররা ‘জুলাই সনদ’ নিয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন। এই সনদ হচ্ছে অভ্যুত্থানের পর ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্মত একটি সাংবিধানিক সংস্কার কাঠামো।
বাংলাদেশের এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ও সিকিউরিটি ফার্ম সোল্যাস গ্লোবাল। আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়েও কিছু শঙ্কার কথা বলা হয়।
প্রতিবেদন বলছে, ৩০০ আসনে ডজনখানেক দল মোট এক হাজার ৯০০ জনের বেশি প্রার্থী দিয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রচার কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। একদিকে রয়েছে বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা জরিপে এগিয়ে। বিপ্লবের আগে বিএনপি ছিল বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি আগের সরকারের বড় একটি সমর্থকগোষ্ঠীকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে রয়েছে ‘ইউনাইটেড বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত একটি জোট, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে গঠিত হয়। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশের বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উঠে আসা আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। তারা শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর প্রান্তিক অবস্থানে থাকার পর ডানপন্থী প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আরেকটি হচ্ছে, নতুন দল ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত এনসিপি শুরুতে একটি সংস্কারবাদী ও প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে রাজপথের সমর্থনকে নির্বাচনী গতিতে রূপ দিতে দলটি ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ফলে দলটি কার্যত একটি ডানপন্থী ইসলামপন্থী জোটের অংশে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এনসিপির ভেতরে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যা দলটিকে আরও দুর্বল করেছে। জানুয়ারিতে জোটে অংশ নেওয়ার প্রতিবাদে এনসিপির ১৫ শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেন।
এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্যাপক সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যেই। এসব ঘটনায় বিভিন্ন দলের যুব সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একাধিক হত্যাকাণ্ড বা শতাধিক গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সময়কার পরিস্থিতির দিকেই ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিতের কথা বলছেন অনেকে।
এর পাশাপাশি শ্রমিক বিরোধ, ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পোশাক শিল্পের কাঠামোগত পতন এবং অস্থিতিশীল চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধিও নির্বাচনী পরিবেশকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলেছে। এসব কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
উচ্চমাত্রার নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) তাদের বাংলাদেশ ভ্রমণ পরামর্শ হালনাগাদ করে দেশটিতে ‘অত্যাবশ্যক ভ্রমণ ছাড়া সব ধরনের ভ্রমণের বিরুদ্ধে’ সুপারিশ করে।
শাহবাগে জনতা। ছবি: রয়টার্স
নির্বাচনের পর কী হতে পারে
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, দুটি ভোটের লড়াইয়ের ধরন ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপুল জয় প্রায় নিশ্চিত। কারণ জুলাই সনদে সব বড় রাজনৈতিক দল ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থন রয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে।
এনসিপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থতার ফলে নির্বাচনটি মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে আদর্শগত মেরুকরণের পাশাপাাশি রাজপথের সহিংসতা বাড়তে পারে। গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের ফলাফল মেনে নেওয়া হবে কি না, সেটিই হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার বড় পরীক্ষা। বেশ কয়েকটি কারণ এই গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্রথমত, বর্তমান জরিপগুলো বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খুব কাছাকাছি বা অনিশ্চিত ফলাফল এলে ভোট গণনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশে দেরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একাধিক নেতা প্রকাশ্যে ফলাফল ‘কারচুপির ষড়যন্ত্র’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এসব বক্তব্য ভোটকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করার জন্য আগাম ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা হতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো নির্বাচনের বিরুদ্ধে অনলাইন ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতার কথা জানিয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। অনলাইনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো বাংলাদেশে গণ সহিংসতার একটি বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভোটের সময় ও পরবর্তী সময়ে তা আরও তীব্র হতে পারে।
তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অনলাইন ভুয়া তথ্যের বিস্তার সহিংসতা উসকে দিতে পারে। ভোটের পরবর্তী কয়েক দিনে কর্মকর্তা, প্রার্থী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গণ সহিংসতা, পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশি, সংখ্যালঘু বা বিদেশি মালিকানাধীন ব্যবসার ওপর হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে যদি অনলাইনে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ সংক্রান্ত অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, এই সরকারের আমলেই মার্কিন মালিকানাধীন বা মার্কিন বা ইসরায়েলপন্থী অভিযোগ তুলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক হারে হামলা হয়েছে।
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, অস্থিরতা ও সহিংসতা অনেক বেশিও হবে না, আবার কমও হবে না। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করে কি না–তার ওপর। যদি দলগুলো ফল মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করে, তবে বাংলাদেশ তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে পারে। এই সংকট এড়াতে বিরোধী দলকে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার অন্যতম অংশ হিসেবে যুক্ত রাখতে হবে। তাদের প্রান্তিক করে রাখা যাবে না।
এসব প্রক্রিয়ায় অন্তত তিনটি প্রধান দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদিও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোকেও যুক্ত করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও শ্রমসংক্রান্ত সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান না হলেও স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে পারে।
আরও সম্ভাব্য একটি দৃশ্যপট হলো, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পতনের পর রয়ে যাওয়া ‘ব্যবস্থার’ নিয়ন্ত্রণ কারা নেবে–সে ব্যাপারে সমঝোতা ব্যাহত হতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো সমঝোতায় পৌঁছালেও, স্থানীয় ও ছাত্র সংগঠনগুলো সহিংস প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে। তারা সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে।
দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে। কারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করতে পারে। ভারতের মতো তুলনামূলক স্থিতিশীল আঞ্চলিক বাজার ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ায় পুঁজি সরিয়ে নিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই ‘বিপ্লবের’ পরবর্তী অর্থবছরের ত্রৈমাসিকে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ৭১ শতাংশ কমে যায়। প্রাণঘাতী রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এই দেশকে এড়িয়ে চলছে।
কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমস্যাগুলো আরও তীব্র হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক ব্যাঘাত, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার একটি ‘চক্র’ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এসব সংকটের একটি বড় অংশ এখনো অমীমাংসিত।
সোল্যাস গ্লোবাল একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই সংস্থা, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপদভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে। বিভিন্ন নামজাদা কোম্পানিকে সহায়তা দেওয়া সোল্যাস স্থল, মেরিটাইম এবং সাইবার স্পেস থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলা করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সেবা দিয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি ভ্রমণ নিরাপত্তা, অফশোর অপারেশন, কর্পোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দেয়। বিভিন্ন কোম্পানি এইসব সেবা গ্রহণ করে এবং নানা দেশ ও এলাকায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।