চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। মাত্র দুটি আসনে জামায়াত জয়ী হয়েছে। বাকি ১৪টিতে বিএনপি সদর্পে তাদের বিজয়বার্তা ঘোষণা করেছে। নির্বাচনে সব দলমতের ভোটারদের তুলনামূলক ভালো উপস্থিতি এই ফলাফলে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ক্ষেত্রে দুই জোটের আচরণ, ইশতেহার, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মান্ধতা এসবও বিবেচনায় নিয়েছেন ভোটাররা। ভোটাররা গুমোট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করে রাজনৈতিক সরকারের অধীনস্থ হতে চেয়েছেন বলেও ধারণা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। ১৬টির মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় মোট ৬টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনটির অর্ধেকের বেশি এলাকা চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নগরের আসন মোট চারটি ধরা হয়। এ ছাড়া উত্তর চট্টগ্রামে রয়েছে সাতটি আসন।
এবারের নির্বাচনে নগর এবং দক্ষিণ জেলায় জামায়াত ভালো ফলাফল করার বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী ছিল। বিশেষ করে জামায়াতের ঘরের আসনখ্যাত চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) ছাড়াও আরও চার থেকে পাঁচটি আসনকে ঘিরে তারা পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। এগুলো হলো, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ), নগরের চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর-পাঁচলাইশ), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) ও চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া)।
চট্টগ্রামে ভোটের সার্বিক ফলাফল নিয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দখলবাজি প্রকাশ্যে এসেছে। জামায়াতও সরকারের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং নানাভাবে মবের মতো ন্যায়নীতি বিরোধী কর্মকাণ্ডে দুষ্ট ছিল। বিএনপির কর্মকাণ্ডগুলো বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এই অবস্থায় সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং ধর্মান্ধতার বিপক্ষে একটা অবলম্বন চেয়েছে মানুষ। নইলে বিএনপির অবস্থা আরও খারাপ হতো।
আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, এক্ষেত্রে ভাসমান ভোটারদের বিএনপি এবং জামায়াত– দুই পক্ষই টানতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভোটের মাঠে সেই শূন্যতা বেশি ছিল না। আওয়ামী সমর্থকেরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। যার কারণে তাদের প্রত্যাশিত ফল করতে অনেকটা সহজ হয়েছে।
বিভিন্ন আসনে জামায়াতের আগে থেকে ভোটার স্থানান্তর, ব্যালটে সিল মেরে রাখা, নারীদের সমালোচনা করে আবার তাদের প্রচারে কাজে লাগানোর মতো অতিকৌশলগুলোও সচেতন মানুষ ভালোভাবে নেয়নি বলে মনে করছেন এই আইনজীবী।
জামায়াত প্রত্যাশিতভাবেই সাতকানিয়া লোহাগাড়া আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীনকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করছেন। শাহজাহান চৌধুরী পান ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি ভোট। বিএনপি পায় ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট। সাতকানিয়ার ১১ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া পুরো লোহাগাড়া উপজেলার ৯ ইউনিয়নও আসনটির সঙ্গে আছে।
পাশের চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসনে জামায়াত প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. জহিরুল ইসলাম প্রায় আট হাজার ভোটে জিতেছেন। এখানে দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী লেয়াকত আলীর কারণে তার কপাল পুড়েছে। লেয়াকত ৫৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। এখানে ধানের শীষ পেয়েছে ৮৩ হাজারের বেশি। দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৯৩ হাজারের বেশি।
বাঁকবদলে অলির সাম্রাজ্যে পতন
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে। সাবেক মন্ত্রী অলি আহমেদ বীর বিক্রমের ঘরের আসনটিতে অলিপুত্র ওমর ফারুক মাত্র এক হাজার ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। জয়ী বিএনপি প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে একই দলের দুজন বিদ্রোহী প্রার্থীও শেষপর্যন্ত ভোটের মাঠে ছিলেন।
বিএনপির বিদ্রোহী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ও শফিকুল ইসলাম রাহী প্রায় পাঁচ হাজার ভোট পান। এলডিপির ওমর ফারুক এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখান থেকে বার বার নির্বাচিত হয়েছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। বিএনপি এবং এলডিপির হয়ে নির্বাচন করে বারবার তিনি জয়ী হন। মন্ত্রীও হয়েছেন। তার নিজস্ব একটা ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার সেটা ভেঙে পড়েছে। নিজে নির্বাচন না করে ছেলেকে প্রার্থী করেছিলেন অলি আহমেদ। কিন্তু ভোটাররা আগেরমতো সাড়া দেননি।
স্থানীয় লোকজন এবং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমেদের হঠাৎ করে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধাটা ভোটাররা ভালোভাবে নিতে পারেননি। শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোট নয়, নির্বাচনকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা সর্বোপরি বিভিন্ন দল এবং অঞ্চলের লোকজন সম্পর্কে অলি আহমেদের বিতর্কিত মন্তব্য বুমেরাং হয়েছে তার ছেলের জন্য।
চট্টগ্রাম নগরের যে তিন আসন নিয়ে জামায়াত আগে থেকে পরিকল্পনা করেছিল, সেটা তাদের প্রার্থী নির্ধারণ, ভোটার স্থানান্তর এবং নানামুখী প্রচার-প্রচারণা দেখে অনুমান করা গিয়েছিল। এ জন্য চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনে তারা দুজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে (সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর) বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছিল।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বিরুদ্ধে জামায়াতের সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী ৭৪ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও জামায়াতের ভোট আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখানে জামায়াত পায় ৩৭ শতাংশ ভোট।
ফাইল ছবি
একইভাবে চট্টগ্রাম-১১ এবং চট্টগ্রাম-৯ আসনেও দলটি ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রাম ১১ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলম ৭৬ হাজারের বেশি ভোট পান। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হক পেয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি ভোট। এখানে বিএনপির আবু সুফিয়ান ১ লাখ ৯ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন।
জয়ী বিএনপির আবু সুফিয়ান মনে করছেন, দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের লোকজন তাকে ভোট দিয়েছেন। তাই এত বড় ব্যবধানে তিনি জয়ী হতে পেরেছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণের মধ্যে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া ও চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা আসনে কাঙ্খিত জয় পেয়েছে যথাক্রমে বিএনপির এনামুল হক ও সরওয়ার জামাল নিজাম। তবে এই দুটি আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতকে পেছনে ফেলেছেন ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থীরা। পটিয়ায় মোমবাতির এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু প্রায় ২৯ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান পান ৫১ হাজারের বেশি ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ বিজয়ী হয়েছেন অনুমিতভাবেই। এখানে দ্বিতীয় হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ডা. আবু নাসের। তিনি প্রায় ৩৫ হাজার ভোট পান। এরশাদ উল্লাহ পেয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার ভোট।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামের নগর এবং জেলার সবগুলো আসনে জামায়াত ইসলামীর ভোট অন্যান্যবারের চেয়ে বেড়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কেবল সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটিতে জিতেছিল। সেবার চট্টগ্রামে জামায়াত মোট ভোট পেয়েছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ৩৪। যা সারা দেশে জামায়াতের মোট প্রাপ্ত ভোটের ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। সেবার সারা দেশে জামায়াতের ঘরে মোট ভোট জুটেছিল ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৪টি আসনে জামায়াত গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে তাদের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচন করেছে যথাক্রমে এলডিপি ও খেলাফত মজলিশের প্রার্থী। ওই দুজনের ভোটসহ হিসাব করলে জামায়াত জোট এবার ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। বিএনপির পরই ভোটপ্রাপ্তির দিক থেকে তাদের অবস্থান।
সবচেয়ে বেশি ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে। এর পর রয়েছে পাশের বাঁশখালী আসনটি, সেখানে ভোট পায় ৩৯ শতাংশ। দুটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীরা জিতেছে। জামায়াত সবচেয়ে কম ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন এবং পাশের উপজেলা রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-৭ এ বিএনপির দুই প্রার্থীই অনায়াসে জিতেছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ভাতিজা হুমাম কাদের চৌধুরী এই দুই আসনে প্রার্থী হন। এই দুই আসনে বিএনপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ভোট পেয়েছে রাউজানে ১৪ শতাংশ এবং রাঙ্গুনিয়ায় ২৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ভোট ব্যবধানের বিশাল জয় পেয়েছে কেন্দ্রীয় নেতা মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। এখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিশের নাসির উদ্দিন। তিনি ভোট পান মাত্র ২২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই এবং চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপ আসনেও বিএনপি অনায়াসে জয় পেয়েছে। মিরসরাইয়ে নুরুল আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পান। জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান পান ৮১ হাজারের কিছু বেশি। সন্দ্বীপে মোস্তফা কামাল পাশা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার ভোটে জামায়াতের মুহাম্মদ আলাউদ্দিনকে হারিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড আসনেও বিএনপির দুই প্রার্থী যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরী জিতেছেন। তবে ঋণ খেলাপীসংক্রান্ত মামলা জটিলতায় এখনই তাদের বিজয়ী ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন।
ছবি: চরচা
চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। মাত্র দুটি আসনে জামায়াত জয়ী হয়েছে। বাকি ১৪টিতে বিএনপি সদর্পে তাদের বিজয়বার্তা ঘোষণা করেছে। নির্বাচনে সব দলমতের ভোটারদের তুলনামূলক ভালো উপস্থিতি এই ফলাফলে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ক্ষেত্রে দুই জোটের আচরণ, ইশতেহার, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মান্ধতা এসবও বিবেচনায় নিয়েছেন ভোটাররা। ভোটাররা গুমোট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করে রাজনৈতিক সরকারের অধীনস্থ হতে চেয়েছেন বলেও ধারণা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। ১৬টির মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় মোট ৬টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনটির অর্ধেকের বেশি এলাকা চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নগরের আসন মোট চারটি ধরা হয়। এ ছাড়া উত্তর চট্টগ্রামে রয়েছে সাতটি আসন।
এবারের নির্বাচনে নগর এবং দক্ষিণ জেলায় জামায়াত ভালো ফলাফল করার বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী ছিল। বিশেষ করে জামায়াতের ঘরের আসনখ্যাত চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) ছাড়াও আরও চার থেকে পাঁচটি আসনকে ঘিরে তারা পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। এগুলো হলো, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ), নগরের চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর-পাঁচলাইশ), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) ও চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া)।
চট্টগ্রামে ভোটের সার্বিক ফলাফল নিয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দখলবাজি প্রকাশ্যে এসেছে। জামায়াতও সরকারের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং নানাভাবে মবের মতো ন্যায়নীতি বিরোধী কর্মকাণ্ডে দুষ্ট ছিল। বিএনপির কর্মকাণ্ডগুলো বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এই অবস্থায় সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং ধর্মান্ধতার বিপক্ষে একটা অবলম্বন চেয়েছে মানুষ। নইলে বিএনপির অবস্থা আরও খারাপ হতো।
আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, এক্ষেত্রে ভাসমান ভোটারদের বিএনপি এবং জামায়াত– দুই পক্ষই টানতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভোটের মাঠে সেই শূন্যতা বেশি ছিল না। আওয়ামী সমর্থকেরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। যার কারণে তাদের প্রত্যাশিত ফল করতে অনেকটা সহজ হয়েছে।
বিভিন্ন আসনে জামায়াতের আগে থেকে ভোটার স্থানান্তর, ব্যালটে সিল মেরে রাখা, নারীদের সমালোচনা করে আবার তাদের প্রচারে কাজে লাগানোর মতো অতিকৌশলগুলোও সচেতন মানুষ ভালোভাবে নেয়নি বলে মনে করছেন এই আইনজীবী।
জামায়াত প্রত্যাশিতভাবেই সাতকানিয়া লোহাগাড়া আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীনকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করছেন। শাহজাহান চৌধুরী পান ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি ভোট। বিএনপি পায় ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট। সাতকানিয়ার ১১ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া পুরো লোহাগাড়া উপজেলার ৯ ইউনিয়নও আসনটির সঙ্গে আছে।
পাশের চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসনে জামায়াত প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. জহিরুল ইসলাম প্রায় আট হাজার ভোটে জিতেছেন। এখানে দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী লেয়াকত আলীর কারণে তার কপাল পুড়েছে। লেয়াকত ৫৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। এখানে ধানের শীষ পেয়েছে ৮৩ হাজারের বেশি। দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৯৩ হাজারের বেশি।
বাঁকবদলে অলির সাম্রাজ্যে পতন
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে। সাবেক মন্ত্রী অলি আহমেদ বীর বিক্রমের ঘরের আসনটিতে অলিপুত্র ওমর ফারুক মাত্র এক হাজার ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। জয়ী বিএনপি প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে একই দলের দুজন বিদ্রোহী প্রার্থীও শেষপর্যন্ত ভোটের মাঠে ছিলেন।
বিএনপির বিদ্রোহী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ও শফিকুল ইসলাম রাহী প্রায় পাঁচ হাজার ভোট পান। এলডিপির ওমর ফারুক এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখান থেকে বার বার নির্বাচিত হয়েছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। বিএনপি এবং এলডিপির হয়ে নির্বাচন করে বারবার তিনি জয়ী হন। মন্ত্রীও হয়েছেন। তার নিজস্ব একটা ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার সেটা ভেঙে পড়েছে। নিজে নির্বাচন না করে ছেলেকে প্রার্থী করেছিলেন অলি আহমেদ। কিন্তু ভোটাররা আগেরমতো সাড়া দেননি।
স্থানীয় লোকজন এবং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমেদের হঠাৎ করে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধাটা ভোটাররা ভালোভাবে নিতে পারেননি। শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোট নয়, নির্বাচনকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা সর্বোপরি বিভিন্ন দল এবং অঞ্চলের লোকজন সম্পর্কে অলি আহমেদের বিতর্কিত মন্তব্য বুমেরাং হয়েছে তার ছেলের জন্য।
চট্টগ্রাম নগরের যে তিন আসন নিয়ে জামায়াত আগে থেকে পরিকল্পনা করেছিল, সেটা তাদের প্রার্থী নির্ধারণ, ভোটার স্থানান্তর এবং নানামুখী প্রচার-প্রচারণা দেখে অনুমান করা গিয়েছিল। এ জন্য চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনে তারা দুজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে (সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর) বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছিল।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বিরুদ্ধে জামায়াতের সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী ৭৪ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও জামায়াতের ভোট আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখানে জামায়াত পায় ৩৭ শতাংশ ভোট।
ফাইল ছবি
একইভাবে চট্টগ্রাম-১১ এবং চট্টগ্রাম-৯ আসনেও দলটি ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রাম ১১ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলম ৭৬ হাজারের বেশি ভোট পান। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হক পেয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি ভোট। এখানে বিএনপির আবু সুফিয়ান ১ লাখ ৯ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন।
জয়ী বিএনপির আবু সুফিয়ান মনে করছেন, দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের লোকজন তাকে ভোট দিয়েছেন। তাই এত বড় ব্যবধানে তিনি জয়ী হতে পেরেছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণের মধ্যে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া ও চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা আসনে কাঙ্খিত জয় পেয়েছে যথাক্রমে বিএনপির এনামুল হক ও সরওয়ার জামাল নিজাম। তবে এই দুটি আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতকে পেছনে ফেলেছেন ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থীরা। পটিয়ায় মোমবাতির এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু প্রায় ২৯ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান পান ৫১ হাজারের বেশি ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ বিজয়ী হয়েছেন অনুমিতভাবেই। এখানে দ্বিতীয় হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ডা. আবু নাসের। তিনি প্রায় ৩৫ হাজার ভোট পান। এরশাদ উল্লাহ পেয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার ভোট।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামের নগর এবং জেলার সবগুলো আসনে জামায়াত ইসলামীর ভোট অন্যান্যবারের চেয়ে বেড়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কেবল সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটিতে জিতেছিল। সেবার চট্টগ্রামে জামায়াত মোট ভোট পেয়েছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ৩৪। যা সারা দেশে জামায়াতের মোট প্রাপ্ত ভোটের ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। সেবার সারা দেশে জামায়াতের ঘরে মোট ভোট জুটেছিল ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৪টি আসনে জামায়াত গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে তাদের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচন করেছে যথাক্রমে এলডিপি ও খেলাফত মজলিশের প্রার্থী। ওই দুজনের ভোটসহ হিসাব করলে জামায়াত জোট এবার ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। বিএনপির পরই ভোটপ্রাপ্তির দিক থেকে তাদের অবস্থান।
সবচেয়ে বেশি ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে। এর পর রয়েছে পাশের বাঁশখালী আসনটি, সেখানে ভোট পায় ৩৯ শতাংশ। দুটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীরা জিতেছে। জামায়াত সবচেয়ে কম ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন এবং পাশের উপজেলা রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-৭ এ বিএনপির দুই প্রার্থীই অনায়াসে জিতেছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ভাতিজা হুমাম কাদের চৌধুরী এই দুই আসনে প্রার্থী হন। এই দুই আসনে বিএনপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ভোট পেয়েছে রাউজানে ১৪ শতাংশ এবং রাঙ্গুনিয়ায় ২৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ভোট ব্যবধানের বিশাল জয় পেয়েছে কেন্দ্রীয় নেতা মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। এখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিশের নাসির উদ্দিন। তিনি ভোট পান মাত্র ২২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই এবং চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপ আসনেও বিএনপি অনায়াসে জয় পেয়েছে। মিরসরাইয়ে নুরুল আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পান। জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান পান ৮১ হাজারের কিছু বেশি। সন্দ্বীপে মোস্তফা কামাল পাশা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার ভোটে জামায়াতের মুহাম্মদ আলাউদ্দিনকে হারিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড আসনেও বিএনপির দুই প্রার্থী যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরী জিতেছেন। তবে ঋণ খেলাপীসংক্রান্ত মামলা জটিলতায় এখনই তাদের বিজয়ী ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন।