প্রাক শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তাহলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ চরম তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করবে বলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে করা এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। আর তাপমাত্রার এই বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশেরও নাম।
গতকাল সোমবার গবেষণাটি নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণা পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণার শিরোনাম হলো, ‘Global gridded dataset of heating and cooling degree days under climate change scenarios’।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ২০১০ সালে বিশ্বের ২৩ শতাংশ মানুষ চরম তাপের মধ্যে বসবাস করলেও আগামী কয়েক দশকে বেড়ে ৪১ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীদের করা এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বের জন্য চরম উদ্বেগজনক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস এবং ব্রাজিলে বিপজ্জনক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হবে বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জনগণ।
গবেষণা বলছে, শীতপ্রধান দেশগুলোতেও উষ্ণতার স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বাড়বে, কিছু ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি।
এতে আরও বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছিল। এই তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে অস্ট্রিয়া ও কানাডায় উষ্ণদিন হবে দ্বিগুণ।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে ১৫০ শতাংশ, নরওয়েতে ২০০ শতাংশ এবং আয়ারল্যান্ডে ২৩০ শতাংশ পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। এসব দেশের অবকাঠামো মূলত ঠান্ডা আবহাওয়ার উপযোগী হওয়ায়, তাপমাত্রার মাঝারি বৃদ্ধিও তুলনামূলকভাবে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
অক্সফোর্ডের ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা বলেন, “শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও উষ্ণায়নের চাহিদায় বেশিরভাগ পরিবর্তন এক দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমায় পৌঁছানোর আগেই ঘটে যাবে। তাই দ্রুত অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই অনেক বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে তাপমাত্রা এরপরও বাড়তেই থাকবে।”
ড. জেসুসের পরামর্শ, ২০৫০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নির্গমন অর্জন করতে হলে ভবন খাতকে ডিকার্বনাইজ করার পাশাপাশি আরও কার্যকর ও সহনশীল অভিযোজন কৌশল গড়ে তুলতে হবে।
অক্সফোর্ড মার্টিন ফিউচার অব কুলিং প্রোগ্রামের প্রধান ও স্মিথ স্কুল অব এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাধিকা খোসলা বলেন, “আমাদের এই গবেষণাকে সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া উচিত। বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অভিবাসনসহ সব ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন প্রভাব পড়বে।”
তার পরামর্শ, টেকসই নেট-জিরো উন্নয়নই একমাত্র পথ, যা ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার এই প্রবণতা থামাতে পারে। রাজনীতিবিদদের দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য জ্বালানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং এর সঙ্গে বাড়বে সংশ্লিষ্ট নির্গমনও। বিপরীতে, কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে হিটারের চাহিদা কমে যাবে।
এদিকে, বিশ্ব যখন অপরিবর্তনীয় জলবায়ু ক্ষতি, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তখন জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে কোনো দূরবর্তী ধারণা নয়, বরং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদী ভাঙনে লাখো মানুষ স্থানচ্যুত হচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। উপকূল থেকে হাওর সব জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই সংকটকে আরও প্রকট হয়ে উঠছে নতুন এই গবেষণার ফলাফলে।