২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ হয়। ছবি: রয়টার্স
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন এই নির্বাচন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
কিনের দীর্ঘ লেখাটির তৃতীয় অংশে আলোচিত হয়েছে নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের বিষয়টি। বিশ্লেষণটির হুবহু অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
নির্বাচন কী শান্তিপূর্ণ হবে?
নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলো মূলত ভোটের আগে এবং নির্বাচন চলাকালীন সময়ের নিরাপত্তার ব্যাপারেই। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই এই সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জেলাগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সমর্থকেরা বিরোধীদের প্রচারণায় বাধা দিতে পারে; এমন শঙ্কাও আছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার নিজ শহর গোপালগঞ্জে এনসিপির একটি কর্মসূচিতে এমন ঘটনা ঘটেছিল। এতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও উদ্বেগের আরেকটি কারণ, যেখানে বিভিন্ন উপদল স্থানীয় চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার নিয়ন্ত্রণ নিতে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত। কিছু মানবাধিকার সংগঠনের মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার একটা বড় উৎস ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নির্বাচনী উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাদি ছিলেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্র আন্দোলনের একজন কর্মী এবং এর পরপরই তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি নাগরিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছিল। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দিন–দুপুরে ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তায় প্রচারণার সময় তাকে গুলি করে আহত করা হয় হয়। কয়েকদিন পর তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। অনেকে মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আওয়ামী লীগ জড়িত ছিল। তার মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে চরম শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। যেহেতু অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতকে দায়ী করেন, তাই উত্তেজিত জনতা ‘ভারত-পন্থী’ তকমা দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং ভারতের বেশ কয়েকটি কনস্যুলেটে হামলা চালায়। এর মধ্যেই একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দিয়ে। এই ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
ওসমান হাদি। ছবি: ফেসবুক
হাদির হত্যাকাণ্ডের জন্য যে–ই দায়ী হোক না কেন, এই ঘটনা পুরো দেশকে একটি অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিককে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত করে তুলেছিল। ডিসেম্বরের শুরুতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনীতিবিদ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির। নির্বাচনের প্রার্থীদের টার্গেট করে আরও সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে, সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থক বা বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কাও রয়েছে—যাদের সাধারণত হাসিনা সরকারের অনুগত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং গণপিটুনির (মব সন্ত্রাস) ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। ভোটের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং ১ লাখেরও বেশি সেনাসদস্যসহ মোট ৯ লাখের বেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে।
যদি নির্বাচনের ফলাফল কোনোভাবে বিতর্কিত হয়, তবে তা একটি রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। গত ১৮ মাস ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকে থাকা নির্ভর করছে সেনাবাহিনী এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য ধরে রাখার ওপরই। সংস্কারের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউনূসকে সব পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছে।
কিন্তু নির্বাচনের গুরুত্ব বিবেচনা করলে, ভোটের ফলাফল নিয়ে কোনো বিরোধ সামাল দেওয়া হবে তার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ফলাফল ঘোষণার সময় পরিস্থিতি শান্ত থাকার আশা করার মতো কারণও আছে। কারণ জামায়াতের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে যে, তারা এই নির্বাচনে জয়ের আশা করছে না, বরং এই ভোটকে তারা পাঁচ বছর পরের নির্বাচনের জন্য একটি ধাপ হিসেবে দেখছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কিছু কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোট শুধু বাংলাদেশকে একটি দৃঢ় সাংবিধানিক ভিত্তির ওপরই দাঁড় করাবে না, বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর এই প্রথম সত্যিকার অর্থেই মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় আসবে। তবে নবনির্বাচিত সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে—যার মধ্যে রয়েছে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার, তৈরি পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতি-নির্ভরশীল মন্থর অর্থনীতি এবং বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। পাশাপাশি জটিল বৈদেশিক নীতিগুলোও সামলাতে হবে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব এবং মিয়ানমার সীমান্তের কাছে ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনে স্থবিরতা। এ ছাড়া হাসিনা সরকারের পতনের পর হিযবুত তাহরীরের মতো কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সহিংস চরমপন্থী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
আগামী বছরগুলোতে স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সী এবং তাদের অনেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে গভীর হতাশায় ভুগছেন। শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই নয়, বাংলাদেশের তরুণেরা চায় দেশ সততার সঙ্গে পরিচালিত হোক। প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাক। ‘জুলাই সনদ’ দিয়ে শুরু হওয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে কোনো প্রকার বিচ্যুতি ঘটলে তাদের মধ্যে এই ধারণা প্রবল হবে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা ছিল কেবলই লোক দেখানো।
আগামী সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল ইস্যুও মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্ব বিচারে এবং শক্তিশালী ভোটব্যাংকের কারণে আওয়ামী লীগকে চিরকাল মাঠের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু হাসিনার অধীনে কর্মকাণ্ড—বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের কারণে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ দেওয়া (এমনকি নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও) রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
আওয়ামী লীগ কোন শর্তে ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য গড়ে তোলা গেলে এই ইস্যুটিকে বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া থেকে ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে এর জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো সহিংসতার জন্য অকপট অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে, যা শেখ হাসিনাসহ বাকিরা এখনো করেননি। ভারত এবং প্রভাব খাটাতে সক্ষম অন্যান্য বিদেশি সরকারগুলো এই রাজনৈতিক দল ও ভবিষ্যৎ সরকারের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের চেয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি নির্বাচিত সরকার দেশের রাজনৈতিক তিক্ততা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে; যদিও সামনে থাকা কাজগুলো অনেক জটিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ হয়। ছবি: রয়টার্স
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন এই নির্বাচন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
কিনের দীর্ঘ লেখাটির তৃতীয় অংশে আলোচিত হয়েছে নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের বিষয়টি। বিশ্লেষণটির হুবহু অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
নির্বাচন কী শান্তিপূর্ণ হবে?
নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলো মূলত ভোটের আগে এবং নির্বাচন চলাকালীন সময়ের নিরাপত্তার ব্যাপারেই। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই এই সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জেলাগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সমর্থকেরা বিরোধীদের প্রচারণায় বাধা দিতে পারে; এমন শঙ্কাও আছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার নিজ শহর গোপালগঞ্জে এনসিপির একটি কর্মসূচিতে এমন ঘটনা ঘটেছিল। এতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও উদ্বেগের আরেকটি কারণ, যেখানে বিভিন্ন উপদল স্থানীয় চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার নিয়ন্ত্রণ নিতে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত। কিছু মানবাধিকার সংগঠনের মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার একটা বড় উৎস ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নির্বাচনী উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাদি ছিলেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্র আন্দোলনের একজন কর্মী এবং এর পরপরই তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি নাগরিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছিল। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দিন–দুপুরে ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তায় প্রচারণার সময় তাকে গুলি করে আহত করা হয় হয়। কয়েকদিন পর তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। অনেকে মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আওয়ামী লীগ জড়িত ছিল। তার মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে চরম শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। যেহেতু অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতকে দায়ী করেন, তাই উত্তেজিত জনতা ‘ভারত-পন্থী’ তকমা দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং ভারতের বেশ কয়েকটি কনস্যুলেটে হামলা চালায়। এর মধ্যেই একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দিয়ে। এই ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
ওসমান হাদি। ছবি: ফেসবুক
হাদির হত্যাকাণ্ডের জন্য যে–ই দায়ী হোক না কেন, এই ঘটনা পুরো দেশকে একটি অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিককে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত করে তুলেছিল। ডিসেম্বরের শুরুতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনীতিবিদ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির। নির্বাচনের প্রার্থীদের টার্গেট করে আরও সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে, সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থক বা বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কাও রয়েছে—যাদের সাধারণত হাসিনা সরকারের অনুগত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং গণপিটুনির (মব সন্ত্রাস) ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। ভোটের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং ১ লাখেরও বেশি সেনাসদস্যসহ মোট ৯ লাখের বেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে।
যদি নির্বাচনের ফলাফল কোনোভাবে বিতর্কিত হয়, তবে তা একটি রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। গত ১৮ মাস ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকে থাকা নির্ভর করছে সেনাবাহিনী এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য ধরে রাখার ওপরই। সংস্কারের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউনূসকে সব পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছে।
কিন্তু নির্বাচনের গুরুত্ব বিবেচনা করলে, ভোটের ফলাফল নিয়ে কোনো বিরোধ সামাল দেওয়া হবে তার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ফলাফল ঘোষণার সময় পরিস্থিতি শান্ত থাকার আশা করার মতো কারণও আছে। কারণ জামায়াতের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে যে, তারা এই নির্বাচনে জয়ের আশা করছে না, বরং এই ভোটকে তারা পাঁচ বছর পরের নির্বাচনের জন্য একটি ধাপ হিসেবে দেখছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কিছু কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোট শুধু বাংলাদেশকে একটি দৃঢ় সাংবিধানিক ভিত্তির ওপরই দাঁড় করাবে না, বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর এই প্রথম সত্যিকার অর্থেই মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় আসবে। তবে নবনির্বাচিত সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে—যার মধ্যে রয়েছে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার, তৈরি পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতি-নির্ভরশীল মন্থর অর্থনীতি এবং বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। পাশাপাশি জটিল বৈদেশিক নীতিগুলোও সামলাতে হবে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব এবং মিয়ানমার সীমান্তের কাছে ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনে স্থবিরতা। এ ছাড়া হাসিনা সরকারের পতনের পর হিযবুত তাহরীরের মতো কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সহিংস চরমপন্থী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
আগামী বছরগুলোতে স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সী এবং তাদের অনেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে গভীর হতাশায় ভুগছেন। শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই নয়, বাংলাদেশের তরুণেরা চায় দেশ সততার সঙ্গে পরিচালিত হোক। প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাক। ‘জুলাই সনদ’ দিয়ে শুরু হওয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে কোনো প্রকার বিচ্যুতি ঘটলে তাদের মধ্যে এই ধারণা প্রবল হবে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা ছিল কেবলই লোক দেখানো।
আগামী সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল ইস্যুও মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্ব বিচারে এবং শক্তিশালী ভোটব্যাংকের কারণে আওয়ামী লীগকে চিরকাল মাঠের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু হাসিনার অধীনে কর্মকাণ্ড—বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের কারণে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ দেওয়া (এমনকি নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও) রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
আওয়ামী লীগ কোন শর্তে ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য গড়ে তোলা গেলে এই ইস্যুটিকে বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া থেকে ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে এর জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো সহিংসতার জন্য অকপট অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে, যা শেখ হাসিনাসহ বাকিরা এখনো করেননি। ভারত এবং প্রভাব খাটাতে সক্ষম অন্যান্য বিদেশি সরকারগুলো এই রাজনৈতিক দল ও ভবিষ্যৎ সরকারের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের চেয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি নির্বাচিত সরকার দেশের রাজনৈতিক তিক্ততা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে; যদিও সামনে থাকা কাজগুলো অনেক জটিল।