যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালে হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয় ঘোষণা করে জানিয়েছিল যে, একসময়ের অতি পরিচিত ও প্রাণঘাতী এই রোগটি দেশ থেকে নির্মূল হয়েছে। কিন্তু সেই চিত্রটি এখন বদলে যেতে পারে, কারণ বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। কানাডা গত বছরই হামমুক্ত দেশের মর্যাদা হারিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোও একই পরিণতির মুখে দাঁড়িয়ে। এই দুটি দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারে পৌঁছেছে।
মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাম রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এটি খুব সহজেই প্রতিরোধযোগ্য। ১৯৬৩ সালে এর টিকা উদ্ভাবন হয়। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে চলা শিশু টিকাদান কর্মসূচির কারণে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে হামের প্রকোপ মূলত বাংলাদেশ, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি) এবং পাকিস্তানের মতো নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়, যেখানে টিকাদানের হার এখনো কম।
তবে গত এক দশকে টিকার প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর বিপর্যয়ের ফলে হামের সংক্রমণ আবারও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাবার কোলে হামে আক্রান্ত এক শিশু। ছবি: চরচাবিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচিতে বাজেট কমিয়ে দেওয়া বা কাটছাঁটও হামের অব্যাহত বিস্তারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের মহামারি বা প্রাদুর্ভাবের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
হাম আসলে কী?
হাম বা রুবিওলা হলো একটি প্রচণ্ড সংক্রামক ব্যাধি। এর সংক্রমণের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি তার আশেপাশে থাকা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন মানুষের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিতে পারেন।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন।
১৯৬০-এর দশকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে হাম ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি রোগ। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মানুষ ১৫ বছর বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত হতো। তখন প্রতি ২ থেকে ৩ বছর পরপরই হামের মহামারি দেখা দিত। এক সময় বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষ হামে মারা যেত, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু।
১৯৬৩ সালে হামের টিকা আবিষ্কৃত হয়। ১৯৭১ সালে বিজ্ঞানীরা হাম, মাম্পস এবং রুবেলা—এই তিনটি রোগের প্রতিষেধককে একত্রিত করে এমএমআর ভ্যাকসিন তৈরি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) শিশুদের জন্য দুটি ডোজের পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রথম ডোজ ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সে। দ্বিতীয় ডোজটি ৪ বছর বয়সে।
সফল টিকাদান কর্মসূচির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালে নিজেদের হামমুক্ত ঘোষণা করে। ২০২৩ সাল নাগাদ বিশ্বের ৮২টি দেশ একই কৃতিত্ব অর্জন করে।
ধারণা করা হয়, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে চালানো টিকাদান কর্মসূচির ফলে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে হামের টিকা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের সহযোগী অধ্যাপক জোনাথন মোসার বৈশ্বিক বৈষম্য, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং টিকার প্রতি অনীহাকে দায়ী করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইথিওপিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইরাক এবং কাজাখস্তানে হাজার হাজার মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে।
কোনো দেশে টানা এক বছর স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ না ঘটলে তাকে হামমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি অনেক দেশ এই মর্যাদা হারিয়েছে। কানাডা গত বছরের নভেম্বরে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের কারণে হামমুক্ত দেশের মর্যাদা হারায়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিশ্চিত করেছে যে,আর্মেনিয়া, অস্ট্রিয়া, আজারবাইজান, স্পেন, যুক্তরাজ্য এবং উজবেকিস্তান তাদের নির্মূল মর্যাদা হারিয়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজারের বেশি ও চলতি বছরের শুরুতেই ১ হাজার ৬০০-এর বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। ফলে আগামী নভেম্বরে এই দেশগুলোও তাদের হামমুক্ত তকমা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
আমেরিকার ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক জেনিফার নুজো বলেন, কোনো দেশের এই মর্যাদা হারানো মানে হলো বিশ্ব এখন ভবিষ্যতের বড় কোনো মহামারি মোকাবিলায় কম প্রস্তুত। তিনি একে বিপদের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
একটি জনপদে হামের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হয়। একে বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’।
জোনাথন মোসারের ভাষায়, টিকার হার বেশি থাকলে কোনো এলাকায় নতুন হামের রোগী আসা মানে হলো ভেজা মাটিতে আগুনের ফুলকি পড়ার মতো, যা কোথাও ছড়াতে পারে না।
হাম কেন আবার ছড়িয়ে পড়ছে?
২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিক টিকাদানের হার স্থবির হয়ে পড়েছে। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে।
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব: লকডাউন এবং ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে অনেক শিশু নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ভুল তথ্য ও অবিশ্বাস: টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ এবং ভুল তথ্য অনেক জনপদে টিকাদানের হার কমিয়ে দিয়েছে।
বৈশ্বিক বৈষম্য: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকার সুষম বণ্টনের অভাব।
ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এখানে প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন প্রয়োজনীয় টিকা পাচ্ছে না, যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। মেক্সিকোতে ২০২১ সালে টিকা না পাওয়া শিশুর হার ছিল ৩০ শতাংশ। কানাডায় দুই বছর বয়সীদের টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ থেকে নেমে ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের পর টিকাদানের হার প্রায় ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সহামের সংকট মোকাবিলায় শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি না থাকলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে যে, টিকাদানের ব্যবধান আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে প্রাদুর্ভাব আরও প্রকট হবে। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর টিকাদান ও নজরদারি কার্যক্রমে সহায়তা করে থাকে। তবে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই সংস্থাটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করার পর এটি গভীর সংকটের মুখে পড়ে; অথচ ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই সংস্থার অন্যতম প্রধান অর্থদাতা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল মিজলস অ্যান্ড রুবেলা ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক ২০২৬ সালের জন্য তাদের বার্ষিক প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ১৫ শতাংশ সংগ্রহ করতে পেরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ মার্কিন অর্থায়ন বন্ধ হওয়া। অন্যদিকে, ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিতে কাজ করে বৈশ্বিক টিকা জোট ‘গাভি’ জানিয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন বাইডেন আমলের অর্থায়ন বাতিল করায় ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের জন্য তাদের ৩ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সিএফআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাভি তাদের কলেরা, মেনিনজাইটিস, টাইফয়েড, ইবোলা এবং পীতজ্বরের (ইয়েলো ফিভার) মতো রোগের জরুরি টিকার মজুত ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেবে। এর ফলে সংস্থাটি ধারণা করছে, তারা আগে যত মৃত্যু প্রতিরোধ করতে পারত, সেই সংখ্যা অন্তত ছয় লাখ কমে যাবে।
মার্কিন কংগ্রেস গত জানুয়ারিতে একটি দ্বিপাক্ষিক বিল উত্থাপন করেছে। এই বিলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে বিলিয়ন ডলার এবং গাভি-র জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন অর্থায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে গাভি-কে বলেছে যাতে তারা টিকায় থিমোরসাল (পারদভিত্তিক প্রিজারভেটিভ) ব্যবহার বন্ধ করে। ফলে গাভি এবং অন্যান্য বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগের অর্থায়নের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তেমনি চিকিৎসার প্রতি জনঅবিশ্বাসের মাঝে টিকাদানের হার বাড়ানোর পরিকল্পনাও হুমকির মুখে।
হাম পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় জোনাথন মোসার জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা এবং টিকাদানের হার বাড়ানোর জন্য জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো অপরিহার্য।