ইরানের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে: আমেরিকা কি ইরানে সামরিক অভিযান চালাবে? তবে আক্রমণ করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বিবিসির সিনিয়র করেসপনডেন্ট ফ্রাঙ্ক গার্ডনার ইরানের ওপর মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় সম্ভাব্য সাতটি দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করেছেন।
১. নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা ও গণতন্ত্রে উত্তরণ (আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি)
একটি দৃশ্যপট হতে পারে এমন—যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে নিখুঁত হামলা চালাবে। এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সীমিত থাকবে। এই চাপের মুখে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে এবং ইরান বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে।
বাস্তবতা হলো এটি অত্যন্ত আশাবাদী চিন্তা। ইতিহাস বলে, ইরাক ও লিবিয়ায় সরকার পতন হলেও গণতন্ত্র নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ২০২৪ সালে সিরিয়ার বিপ্লব (পশ্চিমা সহায়তা ছাড়াই) একটি ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে।
২. নীতি পরিবর্তন কিন্তু শাসনব্যবস্থা বজায় (ভেনেজুয়েলা মডেল)
এক্ষেত্রে শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপে ইরান তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য হবে। ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে নমনীয় হতে হবে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। ছবি: সংগৃহীততবে বাস্তবে এর সম্ভাবনা কম। কারণ দীর্ঘ ৪৭ বছরের কট্টরপন্থী নীতি থেকে ইরান সহজে সরে আসবে এমন ইঙ্গিত নেই। আর এটি সাধারণ ইরানিদের প্রত্যাশা পূরণ করবে না।
৩. সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল
ফ্রাঙ্ক গার্ডনারের মতে, এটি অন্যতম শক্তিশালী সম্ভাবনা। ইরানে বছরের পর বছর জনবিক্ষোভ চললেও শাসনব্যবস্থা টিকে আছে মূলত সেনাবাহিনীর সমর্থনে। মার্কিন হামলার ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় সেনাবাহিনী দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অজুহাতে সরাসরি ক্ষমতা দখল করতে পারে। সেক্ষেত্রে ইরান আইআরজিসি-র নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সামরিক সরকারের অধীনে চলে যাবে।
৪. মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত
আমেরিকা হামলা চালালে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যদিও তারা সরাসরি মার্কিন নৌ বা বিমানবাহিনীর সমকক্ষ নয়, তবে তাদের বিশাল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার অত্যন্ত শক্তিশালী। কাতার বা বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোতে হওয়া হামলা প্রমাণ করেছে যে, ইরানি প্রযুক্তির ড্রোন ও মিসাইল কতটা বিধ্বংসী হতে পারে।
৫. হরমুজ প্রণালী অবরোধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
বিশ্বের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ তেল এবং ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবাহিত হয় সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান ইতিমধ্যে সেখানে নৌ-মাইন স্থাপনের মহড়া দিয়েছে। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান যদি এই পথ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধস নামবে।
৬. সোয়ার্ম অ্যাটাক
ইরানি নৌবাহিনী একসাথে শত শত বিস্ফোরক ড্রোন ও দ্রুতগতির টর্পেডো দিয়ে সোয়ার্ম অ্যাটাক চালাতে পারে। এর ফলে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পরাস্ত হতে পারে। যদি কোনোভাবে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া যায় বা নাবিকদের বন্দি করা হয়, তবে তা আমেরিকার জন্য হবে চরম অপমানজনক। ২০০০ সালে ইউএসএস কোল-এর ওপর হামলার ঘটনা এর একটি বড় উদাহরণ।
৭. শাসনব্যবস্থার পতন ও চরম গৃহযুদ্ধ
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্সসবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়া। ক্ষমতার শূন্যতায় সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। কুর্দি বা বালুচদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রক্ষায় অস্ত্র তুলে নিতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলো ইরানের বর্তমান শাসনের বিদায় চাইলেও, এই অস্থিতিশীলতার আঁচ সরাসরি তাদের ওপরও পড়বে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করার পর আক্রমণ না করে ফিরে আসেন, তবে তাকে ‘দুর্বল’ ভাবা হতে পারে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে এর পরিণতি কী হবে এবং তা কতদূর গড়াবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।