সাকিবকে কি ফেরাতে চায় সরকার?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
সাকিবকে কি ফেরাতে চায় সরকার?

শনিবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে সাকিব আল হাসানকে ফেরাতে চায় তারা। সাকিবও নাকি রাজি, আবার বাংলাদেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে। কিন্তু হঠাৎ করেই সাকিব আল হাসানকে ফেরানোর উদ্যোগ কেন? আসলেই কী সাকিবকে ফেরানো হবে? সাকিবের ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবস্থান কী! সেই অবস্থান কী বদল হয়েছে? সাকিবের ব্যাপারে সরকার কী এখন খানিকটা নরম? বিসিবি কাল সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও সরকারের বিষয়ে পরিস্কার কোনো তথ্য দিতে পারেনি। বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন বলেছেন, ‘সাকিবের জাতীয় দলে খেলাটা অ্যাভেইলেবিলিটি, অ্যাক্সেসেবিলিটি, ফিটনেস ও যে জায়গায় খেলা হবে, ওখানে সাকিবের উপস্থিত থাকার সক্ষমতার শর্তগুলো আছে।

আমজাদ হোসেনের বক্তব্য থেকে আসলে পরিস্কার করে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না, আদৌ সাকিবকে বিসিবি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে ফেরাতে পারবে কিনা, কিংবা সাকিব আদৌ নির্ভার হয়ে বাংলাদেশ দলে খেলতে পারবেন কিনা।

বিসিবির মিডিয়া উইংয়ের প্রধানের একটি কথাতে বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে। যে জায়গায় খেলা হবে, সে জায়গায় সাকিবের উপস্থিত থাকার সক্ষমতার প্রসঙ্গটিই আসলে ধোঁয়াশা তৈরি করছে। বাংলাদেশে খেলা হলে সাকিব কী ফিরতে পারবেন? তাই সাকিবকে ফেরানোর সিদ্ধান্তটি কতটা আন্তরিক, কতটা কথার কথা, এ নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই যাচ্ছে।

সাকিবের ফেরায় কী সরকারের সায় আছে? ছবি: রয়টার্স
সাকিবের ফেরায় কী সরকারের সায় আছে? ছবি: রয়টার্স

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েই আসলে সর্বনাশটা হয়েছে সাকিবের। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সাকিব আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাগুরা–১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু এর কিছু দিন পরই তীব্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় ও শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আক্রোশ তো ছিলই, সেই ক্ষোভেরই শিকার হন সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার। জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় সাকিব ছিলেন আমেরিকা ও কানাডায়, সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাকিবের বিভিন্ন পোস্টও মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। তার জের হিসেবে সরকার পতনের পর সাকিব আর দেশেই ফিরতে পারেননি। দায়ের হয়েছে বিভিন্ন মামলা, এর মধ্যে আছে হত্যা মামলাও।

সরকার পতনের পরও সাকিব পাকিস্তানের বিপক্ষে পাকিস্তানের মাটিতেই টেস্ট খেলেছেন। বাংলাদেশের সেই দুর্দান্ত টেস্ট সিরিজ জয়ে দারুণ ভূমিকাও রাখেন। সেপ্টেম্বরে কানপুরে ভারতের বিপক্ষে টেস্টে শেষবারের মতো মাঠে নামেন। এরপর অক্টোবরেই দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলার জন্য স্কোয়াডে নাম থাকলেও ‘ক্ষোভ–বিক্ষোভের’ মুখে তিনি আসতে পারেননি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও সাকিবের ব্যাপারে সে সময় সবুজ সংকেত ছিল না। এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গও মানুষের ‘ক্ষোভ–বিক্ষোভের’ পক্ষেই মতামত দিয়েছেন, সমর্থন দিয়েছেন। তখনই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল, সাকিব আল হাসান আবার বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলুন, এটা চান না, সরকারের ওপরের মহলই। আর ওপরের মহল না চাইলে যে বিসিবির কিছু করার নেই, সেটা হাবেভাবে বিসিবির লোকজন বুঝিয়েও দিয়েছিল।

সাকিবকে ফেরানোর ব্যাপারে বিসিবির সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত? ছবি: রয়টার্স
সাকিবকে ফেরানোর ব্যাপারে বিসিবির সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত? ছবি: রয়টার্স

তবে এক বছর পর হঠাৎ কী হলো, যে সাকিবকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত হলো! সাকিব সব সময়ই বলেছেন, তিনি জাতীয় দলে খেলতে চান, তিনি এটাও বলেছেন, ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ তিনি মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেই খেলতে চান। কিন্তু তার সামনে বাধা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও তার বিরুদ্ধে হওয়া রাজনৈতিক মামলাগুলো। যেহেতু হত্যা মামলা আছে, তাই দেশে পা রাখলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে, এমন শঙ্কা সাকিবের আছে। বিসিবি কাল তাকে ফেরানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই নিয়েছে কিনা, সেটি পরিস্কার করা হয়নি। বিসিবি জানিয়েছে, সরকার কী করবে সেটা সরকারের ব্যাপার, তাদের সিদ্ধান্ত সাকিবকে ফেরানোর। এই কথাটার–ই বা মানে কী! সরকার না চাইলে বিসিবির চাওয়া–পাওয়া বা সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য যে নেই, সেটা সবাই জানেন।

সাকিবকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত বা সেই সিদ্ধান্তের ঘোষণা এমন একটা সময় দেওয়া হলো, যখন দেশের ক্রিকেট উত্তাল। মোস্তাফিজুর রহমান–ইস্যুতে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মতো আসর বয়কট করছে বাংলাদেশ। ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ না খেলার ব্যাপারে বাংলাদেশ একটা অবস্থান নেওয়ার পরই আইসিসি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রিপ্লেসমেন্ট ঘোষণা করেছে। নিরাপত্তা–ইস্যুতে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ না খেলার ব্যাপারে বাংলাদেশের অনুরোধ বা দাবি, যেটাই বলা হোক না কেন, আইসিসি রাখেনি। এমনকি বাংলাদেশের দাবির পক্ষে তেমন জোরালো সমর্থনও ক্রিকেট দুনিয়াতে ছিল না। ভারতে খেলা, না খেলার ব্যাপারটিকে ‘জাতীয় মর্যাদার ব্যাপার’ বলে বিশ্বকাপ বয়কট করা হলেও অদূর ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত যে দেশের ক্রিকেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সে শঙ্কা খুব ভালোমতোই আছে। বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে বিসিবি বরাবরই ‘সরকারের সিদ্ধান্ত’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এমন একটা সময় সাকিবকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে সবার দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরানো বা আলোচনার মোড় ঘোরানো কোনো ব্যাপার কিনা, সে প্রশ্ন উঠছে।

সাকিবকে ফেরানোর উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত যেহেতু হয়েছে–ই, তাই বিসিবির উচিত, এ ব্যাপারে সব ধোঁয়াশা পরিস্কার করা। সরকারেরও উচিত এ ব্যাপারে কথা বলা, সাকিব ফিরলে তিনি কোনো হেনস্তার শিকার হবেন না—এটা নিশ্চিত করা। নয়তো, এ ব্যাপারটিকে ক্রিকেটপ্রেমীরা বিসিবির আরও একটি ফাঁকা বুলি হিসেবেই ধরে নেবেন।

সম্পর্কিত