আল জাজিরার প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার প্রায় চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থামার কোনো লক্ষণ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে তেহরানের সাথে আলোচনায় বসেছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আলোচনার খবরের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে এটিই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সেনা সমাবেশ।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সরাসরি অভিযানে অংশ নিচ্ছে। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে ভূমধ্যসাগরে সাময়িকভাবে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে আরেক শক্তিশালী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের ভেতরে ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তু আঘাত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদর দপ্তর, ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কারখানা, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌ-ঘাঁটিগুলো।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় ইরানের ১৪০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ বা নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এর পাল্টা জবাবে ইরানও প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব দেশ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে বর্তমানে এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালী। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের পদাতিক সৈন্য সংখ্যা আরও বাড়ানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
প্রথম দফার হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পরিকল্পনার কথা স্পষ্ট করে আসছিলেন। গত জানুয়ারির শেষ দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, “আমাদের বিশাল এক সামরিক বাহিনী ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওই অভিমুখে আমাদের প্রচুর রণতরী পাঠানো হচ্ছে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে আমাদের একটি বড় নৌবহর সেখানে মোতায়েন থাকবে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।”
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের খারগ দ্বীপে হামলা চালানোর পর ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে জানান, সেখানে থাকা সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু তার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামো বা রিফাইনারিগুলো হবে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
গত ২৪ মার্চ পেন্টাগন মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের দুই প্রান্ত থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট ওই অঞ্চলের পথে রয়েছে। নতুন এই সেনা মোতায়েন সেই শক্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধের পরিধি এবং কৌশলগত বিকল্পগুলো বাড়ানোর জন্যই সেন্টকম এই অতিরিক্ত সৈন্য চেয়েছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের এক ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, ইরানর ভেতরে থাকা পরমাণু সরঞ্জাম বা উপকরণগুলো সশরীরে গিয়ে সুরক্ষিত করার প্রয়োজন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। কার মাধ্যমে এই কাজ করানো হবে তা সুনির্দিষ্ট না করলেও তিনি বলেন, কাউকে না কাউকে গিয়ে এগুলো উদ্ধার বা নিয়ন্ত্রণে নিতেই হবে।
যদিও এখন পর্যন্ত কোনো স্থল অভিযানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়নি, তবে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ উভচর বাহিনী, সেনাবাহিনীর চৌকস প্যারাট্রুপার এবং একটি ডিভিশন-পর্যায়ের কমান্ড কাঠামো যেভাবে একত্রিত হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি এখন এক নতুন এবং ব্যাপক স্তরে পৌঁছেছে।
তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে শক্তি বাড়াতে বর্তমানে তিনটি আলাদা শক্তিশালী সামরিক ফরমেশন পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই তিনটি বাহিনীর যাত্রা শুরুর স্থান, রুট এবং পৌঁছানোর সময় ভিন্ন।

প্রথম বাহিনী (ট্রিপোলি গ্রুপ): জাপানের সাসেবো থেকে গত ১৩ মার্চ রওনা হয়েছে ইউএসএস ট্রিপোলির নেতৃত্বাধীন ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। ২৩ মার্চের মধ্যে তারা ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া অতিক্রম করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মার্চ মাসের শেষ বা এপ্রিলের শুরুতেই তারা মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যাবে।
দ্বিতীয় বাহিনী (বক্সার গ্রুপ): যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১৯ ও ২০ মার্চের দিকে রওনা হয়েছে ইউএসএস বক্সার ও ১১তম মেরিন ইউনিট। বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে এই দলটির যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাতে অন্তত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
তৃতীয় বাহিনী (প্যারাট্রুপার কন্টিনজেন্ট): সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার চৌকস প্যারাট্রুপারকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছে।
এই দুটি মেরিন গ্রুপ এবং প্যারাট্রুপার দল মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার অতিরিক্ত সৈন্য এই যুদ্ধে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও পদাতিক বাহিনীর শক্তিমত্তা কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
‘ইউএসএস বক্সার’ এবং ১১তম মেরিন ইউনিটের সক্ষমতা
পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়া দুটি প্রধান মার্কিন জাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ‘ইউএসএস ট্রিপোলি’। এটি একটি ‘আমেরিকা-ক্লাস’ উভচর হামলাকারী জাহাজ।
জাপানের সাসেবো বন্দরে অবস্থানরত ইউএসএস নিউ অর্লিন্সের সাথে এই জাহাজটি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর অগ্রবর্তী শক্তির অংশ হিসেবে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে এটি মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই বহরের মূল শক্তি হচ্ছে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। এতে প্রায় দুই হাজার ২০০ দক্ষ মেরিন সেনা ও নৌ-সদস্য রয়েছেন। এই ইউনিটে রয়েছে শক্তিশালী আর্টিলারি (কামান), উভচর যান এবং বিশেষায়িত সামরিক দল।
মার্কিন মেরিন কোরের একমাত্র স্থায়ীভাবে মোতায়েনকৃত ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড দল হলো এই ৩১তম এমইইউ। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ দীর্ঘ। এর আগে ১৯৯৮ সালে ইরাকের অস্ত্র পরিদর্শন সংকট চলাকালীন কুয়েত উপকূলে টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা অপারেশন ডেজার্ট ফক্সে সরাসরি অংশ নিয়েছিল।
অপারেশন ডেজার্ট ফক্স ছিল ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের যৌথ চার দিনের এক বিশাল বিমান হামলা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। মূলত ইরাকের সামরিক সক্ষমতা ও গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির অবকাঠামো ধ্বংস করতেই ওই হামলা চালানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে রওনা হওয়া দ্বিতীয় মার্কিন উভচর দলটির নেতৃত্বে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ভিত্তিক ‘ওয়াস্প-ক্লাস’ হামলাকারী জাহাজ ‘ইউএসএস বক্সার’।
এই শক্তিশালী নৌ-বহরে ‘ইউএসএস বক্সার’-এর পাশাপাশি রয়েছে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ রণতরী- ‘ইউএসএস কমস্টক’ এবং ‘ইউএসএস পোর্টল্যান্ড’। এই বহরটি ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প পেন্ডলটন ভিত্তিক ‘১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’কে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ‘ইউএসএস বক্সার’ গত ১৯ মার্চ সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছে। এই দলটির মোতায়েনের সময়সীমা পূর্বনির্ধারিত সূচির চেয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয়েছে।
বর্তমানে এই নৌ-বহরটি ওমান উপসাগর থেকে প্রায় ২২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। বিশাল এই পথ পাড়ি দিয়ে রণক্ষেত্রে পৌঁছাতে তাদের আরও অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগে তাদের এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ইউএসএস ট্রিপোলির মতোই ইউএসএস বক্সার রণতরীটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ বি যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনায় সক্ষম। এই ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটে রয়েছেন প্রায় দুই হাজার ২০০ দক্ষ মেরিন সেনা। এছাড়া বহরের তিনটি জাহাজ মিলিয়ে আরও প্রায় দুই হাজার নৌ-সদস্য সেখানে মোতায়েন রয়েছেন।
পারস্য উপসাগরে এই ইউনিটের যুদ্ধজয়ের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৯০-৯১ সালে ৩৫টি দেশের প্রায় সাত লাখ সেনার সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর অংশ ছিল এই ইউনিটটি। সে সময় ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের পর, কুয়েত উপকূলে একটি কৌশলী উভচর বিভ্রান্তি (Amphibious Deception) পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা ইরাকি বাহিনীকে সফলভাবে আটকে রেখেছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসেও এই ১১তম মেরিন ইউনিট ইরাকের নাজাফ প্রদেশে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেয় এবং ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করে।
৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের দ্রুত মোতায়েন
ফোর্ট ব্র্যাগ ভিত্তিক ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন মার্কিন সেনাবাহিনীর অষ্টাদশ এয়ারবোর্ন কোরের মূল শক্তি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি এই ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স থেকে প্রায় দুই হাজার সৈন্যকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এই ব্রিগেড-আকারের বাহিনীটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মাত্র ১৮ ঘণ্টার নোটিশে মোতায়েন হতে সক্ষম।
শত্রু এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশের ক্ষেত্রে ৮২তম ডিভিশন মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান ভরসা। তারা প্যারাসুট জাম্পের মাধ্যমে অতর্কিতে হামলা চালানো, বিমানঘাঁটি দখল করা এবং পরবর্তী অন্যান্য বাহিনীর আগমনের পথ সুগম করতে এলাকা সুরক্ষিত করায় বিশেষভাবে পারদর্শী। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের সাথে কোনো ভারী সাঁজোয়া যান বা ট্যাংক থাকে না, যার ফলে শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণের মুখে দীর্ঘ সময় এলাকা দখলে রাখা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
এই ডিভিশনের রয়েছে দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধের ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরমান্ডি ও নেদারল্যান্ডস অভিযানে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধেও তারা সরাসরি যুক্ত ছিল। এছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও এই বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল।
মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্য কী? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই বিশাল সৈন্য সমাবেশের উদ্দেশ্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ অভিযান হতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট আল জাজিরাকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানের সম্ভাবনা খুবই কম।
তার মতে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার সৈন্যের প্রয়োজন হয়েছিল, অথচ ইরান আয়তনে ইরাকের চারগুণ বড়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মাত্র তিন হাজার ছয়শ জনের মতো কমব্যাট ফোর্স (দুই ব্যাটালিয়ন মেরিন ও দুই ব্যাটালিয়ন প্যারাট্রুপার) মোতায়েন করছে। স্টুয়ার্ট বলেন, “এই বাহিনীটি মূলত ঝটিকা অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল এবং স্বল্প সময়ের মিশনের জন্য উপযুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী সাঁজোয়া ইউনিট বা রসদ সরবরাহের ঘাটতি এখানে স্পষ্ট।”
স্থল অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বর্তমান সামরিক বিন্যাস থেকে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে-
১. খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধ:
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপটি দিয়ে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন বিমান হামলায় এখানকার সামরিক অবকাঠামো ও বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২. হরমুজ প্রণালী পুনর্দখল:
ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ায় মার্কিন মেরিন বাহিনী হেলিকপ্টারের সাহায্যে অভিযান চালিয়ে ইরানের মিসাইল সাইট ও মাইন মজুদ ধ্বংস করে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
৩. পরমাণু স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ:
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তবে স্টুয়ার্টের মতে, এটি বর্তমান স্বল্প সংখ্যক সৈন্য দিয়ে করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এর জন্য বিশাল এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থল উপস্থিতি প্রয়োজন।

সাবেক ন্যাটো কমান্ডার অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস সতর্ক করে বলেছেন, খাশক দ্বীপে হামলা চালাতে গেলে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের ড্রোন, বিস্ফোরক বোঝাই ছোট নৌকা এবং মিসাইল হামলার মুখে পড়তে হবে। দ্বীপটি দখল করা সহজ হলেও সেখানে ইরানি বাহিনী প্রচুর ‘মরণফাঁদ’ পেতে রাখতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
পরিশেষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খারগ দ্বীপ বা পরমাণু স্থাপনার মতো কৌশলগত জায়গায় হামলা চালানো হলে ইরান আরও কঠোর পাল্টাপাল্টি জবাব দিতে পারে, যা পুরো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে দেবে।
উত্তেজনার মাঝেও কূটনীতির শেষ চেষ্টা: চাপের মুখে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে এই বিশাল সামরিক সমাবেশ মূলত একটি খণ্ডিত ও অনিশ্চিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমান্তরালে পরিচালিত হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞ রুবেন স্টুয়ার্টের মতে, এই পদক্ষেপকে যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বরং ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হিসেবে দেখা ভালো।
এই সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা ইরানকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক পথও খোলা আছে।”
তবে স্টুয়ার্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এটি একটি অত্যন্ত নাজুক ভারসাম্য রক্ষা মাত্র। তার ভাষায়, “যদি সৈন্য সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে এবং বিশেষ করে দ্রুত সাড়াদানকারী ইউনিটের পরিবর্তে ভারী ও দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কাঠামো তৈরি করা হয়, তবে যুদ্ধের এই গতি ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে সৈন্য মোতায়েনের মাত্রা সেই সীমার নিচেই আছে, তবে এই ধারা অব্যাহত থাকলে অনিচ্ছাকৃতভাবে বড় ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি এবং কূটনীতির সুযোগ উভয়ই কমে আসতে পারে।”
ট্রাম্পের আলোচনার দাবি বনাম ইরানের অস্বীকার: মধ্যস্থতায় পাকিস্তান
গত ২৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৫টি পয়েন্টে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই আলোচনাকে তিনি ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইরান সরাসরি কোনো আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, কিছু বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনের আলোচনার প্রস্তাব পেয়েছেন এবং তার যথাযথ জবাবও দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষে ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, হয় হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে, না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে। তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি আলোচনার অগ্রগতি উল্লেখ করে এই আলটিমেটাম আরও পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেন।
এই তীব্র উত্তেজনার মাঝে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পাকিস্তান। দেশটি নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে। গত রবিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ট্রাম্পের সাথে কথা বলেন এবং সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে আলোচনা করেন।
গত ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সরাসরি ট্রাম্প ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে ট্যাগ করে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত থাকলে চলমান সংঘাতের একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধানের লক্ষ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তান প্রস্তুত এবং সম্মানিত বোধ করবে।” কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেহবাজ শরীফের এই প্রস্তাবটি শেয়ার করেন।

অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার প্রায় চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থামার কোনো লক্ষণ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে তেহরানের সাথে আলোচনায় বসেছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আলোচনার খবরের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে এটিই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সেনা সমাবেশ।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সরাসরি অভিযানে অংশ নিচ্ছে। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে ভূমধ্যসাগরে সাময়িকভাবে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে আরেক শক্তিশালী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের ভেতরে ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তু আঘাত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদর দপ্তর, ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কারখানা, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌ-ঘাঁটিগুলো।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় ইরানের ১৪০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ বা নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এর পাল্টা জবাবে ইরানও প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব দেশ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে বর্তমানে এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালী। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের পদাতিক সৈন্য সংখ্যা আরও বাড়ানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
প্রথম দফার হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পরিকল্পনার কথা স্পষ্ট করে আসছিলেন। গত জানুয়ারির শেষ দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, “আমাদের বিশাল এক সামরিক বাহিনী ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওই অভিমুখে আমাদের প্রচুর রণতরী পাঠানো হচ্ছে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে আমাদের একটি বড় নৌবহর সেখানে মোতায়েন থাকবে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।”
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের খারগ দ্বীপে হামলা চালানোর পর ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে জানান, সেখানে থাকা সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু তার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামো বা রিফাইনারিগুলো হবে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
গত ২৪ মার্চ পেন্টাগন মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের দুই প্রান্ত থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট ওই অঞ্চলের পথে রয়েছে। নতুন এই সেনা মোতায়েন সেই শক্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধের পরিধি এবং কৌশলগত বিকল্পগুলো বাড়ানোর জন্যই সেন্টকম এই অতিরিক্ত সৈন্য চেয়েছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের এক ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, ইরানর ভেতরে থাকা পরমাণু সরঞ্জাম বা উপকরণগুলো সশরীরে গিয়ে সুরক্ষিত করার প্রয়োজন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। কার মাধ্যমে এই কাজ করানো হবে তা সুনির্দিষ্ট না করলেও তিনি বলেন, কাউকে না কাউকে গিয়ে এগুলো উদ্ধার বা নিয়ন্ত্রণে নিতেই হবে।
যদিও এখন পর্যন্ত কোনো স্থল অভিযানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়নি, তবে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ উভচর বাহিনী, সেনাবাহিনীর চৌকস প্যারাট্রুপার এবং একটি ডিভিশন-পর্যায়ের কমান্ড কাঠামো যেভাবে একত্রিত হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি এখন এক নতুন এবং ব্যাপক স্তরে পৌঁছেছে।
তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে শক্তি বাড়াতে বর্তমানে তিনটি আলাদা শক্তিশালী সামরিক ফরমেশন পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই তিনটি বাহিনীর যাত্রা শুরুর স্থান, রুট এবং পৌঁছানোর সময় ভিন্ন।

প্রথম বাহিনী (ট্রিপোলি গ্রুপ): জাপানের সাসেবো থেকে গত ১৩ মার্চ রওনা হয়েছে ইউএসএস ট্রিপোলির নেতৃত্বাধীন ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। ২৩ মার্চের মধ্যে তারা ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া অতিক্রম করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মার্চ মাসের শেষ বা এপ্রিলের শুরুতেই তারা মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যাবে।
দ্বিতীয় বাহিনী (বক্সার গ্রুপ): যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১৯ ও ২০ মার্চের দিকে রওনা হয়েছে ইউএসএস বক্সার ও ১১তম মেরিন ইউনিট। বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে এই দলটির যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাতে অন্তত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
তৃতীয় বাহিনী (প্যারাট্রুপার কন্টিনজেন্ট): সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার চৌকস প্যারাট্রুপারকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছে।
এই দুটি মেরিন গ্রুপ এবং প্যারাট্রুপার দল মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার অতিরিক্ত সৈন্য এই যুদ্ধে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও পদাতিক বাহিনীর শক্তিমত্তা কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
‘ইউএসএস বক্সার’ এবং ১১তম মেরিন ইউনিটের সক্ষমতা
পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়া দুটি প্রধান মার্কিন জাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ‘ইউএসএস ট্রিপোলি’। এটি একটি ‘আমেরিকা-ক্লাস’ উভচর হামলাকারী জাহাজ।
জাপানের সাসেবো বন্দরে অবস্থানরত ইউএসএস নিউ অর্লিন্সের সাথে এই জাহাজটি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর অগ্রবর্তী শক্তির অংশ হিসেবে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে এটি মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই বহরের মূল শক্তি হচ্ছে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। এতে প্রায় দুই হাজার ২০০ দক্ষ মেরিন সেনা ও নৌ-সদস্য রয়েছেন। এই ইউনিটে রয়েছে শক্তিশালী আর্টিলারি (কামান), উভচর যান এবং বিশেষায়িত সামরিক দল।
মার্কিন মেরিন কোরের একমাত্র স্থায়ীভাবে মোতায়েনকৃত ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড দল হলো এই ৩১তম এমইইউ। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ দীর্ঘ। এর আগে ১৯৯৮ সালে ইরাকের অস্ত্র পরিদর্শন সংকট চলাকালীন কুয়েত উপকূলে টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা অপারেশন ডেজার্ট ফক্সে সরাসরি অংশ নিয়েছিল।
অপারেশন ডেজার্ট ফক্স ছিল ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের যৌথ চার দিনের এক বিশাল বিমান হামলা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। মূলত ইরাকের সামরিক সক্ষমতা ও গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির অবকাঠামো ধ্বংস করতেই ওই হামলা চালানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে রওনা হওয়া দ্বিতীয় মার্কিন উভচর দলটির নেতৃত্বে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ভিত্তিক ‘ওয়াস্প-ক্লাস’ হামলাকারী জাহাজ ‘ইউএসএস বক্সার’।
এই শক্তিশালী নৌ-বহরে ‘ইউএসএস বক্সার’-এর পাশাপাশি রয়েছে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ রণতরী- ‘ইউএসএস কমস্টক’ এবং ‘ইউএসএস পোর্টল্যান্ড’। এই বহরটি ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প পেন্ডলটন ভিত্তিক ‘১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’কে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ‘ইউএসএস বক্সার’ গত ১৯ মার্চ সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছে। এই দলটির মোতায়েনের সময়সীমা পূর্বনির্ধারিত সূচির চেয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয়েছে।
বর্তমানে এই নৌ-বহরটি ওমান উপসাগর থেকে প্রায় ২২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। বিশাল এই পথ পাড়ি দিয়ে রণক্ষেত্রে পৌঁছাতে তাদের আরও অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগে তাদের এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ইউএসএস ট্রিপোলির মতোই ইউএসএস বক্সার রণতরীটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ বি যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনায় সক্ষম। এই ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটে রয়েছেন প্রায় দুই হাজার ২০০ দক্ষ মেরিন সেনা। এছাড়া বহরের তিনটি জাহাজ মিলিয়ে আরও প্রায় দুই হাজার নৌ-সদস্য সেখানে মোতায়েন রয়েছেন।
পারস্য উপসাগরে এই ইউনিটের যুদ্ধজয়ের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৯০-৯১ সালে ৩৫টি দেশের প্রায় সাত লাখ সেনার সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর অংশ ছিল এই ইউনিটটি। সে সময় ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের পর, কুয়েত উপকূলে একটি কৌশলী উভচর বিভ্রান্তি (Amphibious Deception) পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা ইরাকি বাহিনীকে সফলভাবে আটকে রেখেছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসেও এই ১১তম মেরিন ইউনিট ইরাকের নাজাফ প্রদেশে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেয় এবং ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করে।
৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের দ্রুত মোতায়েন
ফোর্ট ব্র্যাগ ভিত্তিক ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন মার্কিন সেনাবাহিনীর অষ্টাদশ এয়ারবোর্ন কোরের মূল শক্তি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি এই ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স থেকে প্রায় দুই হাজার সৈন্যকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এই ব্রিগেড-আকারের বাহিনীটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মাত্র ১৮ ঘণ্টার নোটিশে মোতায়েন হতে সক্ষম।
শত্রু এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশের ক্ষেত্রে ৮২তম ডিভিশন মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান ভরসা। তারা প্যারাসুট জাম্পের মাধ্যমে অতর্কিতে হামলা চালানো, বিমানঘাঁটি দখল করা এবং পরবর্তী অন্যান্য বাহিনীর আগমনের পথ সুগম করতে এলাকা সুরক্ষিত করায় বিশেষভাবে পারদর্শী। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের সাথে কোনো ভারী সাঁজোয়া যান বা ট্যাংক থাকে না, যার ফলে শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণের মুখে দীর্ঘ সময় এলাকা দখলে রাখা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
এই ডিভিশনের রয়েছে দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধের ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরমান্ডি ও নেদারল্যান্ডস অভিযানে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধেও তারা সরাসরি যুক্ত ছিল। এছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও এই বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল।
মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্য কী? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই বিশাল সৈন্য সমাবেশের উদ্দেশ্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ অভিযান হতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট আল জাজিরাকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানের সম্ভাবনা খুবই কম।
তার মতে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার সৈন্যের প্রয়োজন হয়েছিল, অথচ ইরান আয়তনে ইরাকের চারগুণ বড়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মাত্র তিন হাজার ছয়শ জনের মতো কমব্যাট ফোর্স (দুই ব্যাটালিয়ন মেরিন ও দুই ব্যাটালিয়ন প্যারাট্রুপার) মোতায়েন করছে। স্টুয়ার্ট বলেন, “এই বাহিনীটি মূলত ঝটিকা অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল এবং স্বল্প সময়ের মিশনের জন্য উপযুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী সাঁজোয়া ইউনিট বা রসদ সরবরাহের ঘাটতি এখানে স্পষ্ট।”
স্থল অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বর্তমান সামরিক বিন্যাস থেকে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে-
১. খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধ:
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপটি দিয়ে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন বিমান হামলায় এখানকার সামরিক অবকাঠামো ও বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২. হরমুজ প্রণালী পুনর্দখল:
ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ায় মার্কিন মেরিন বাহিনী হেলিকপ্টারের সাহায্যে অভিযান চালিয়ে ইরানের মিসাইল সাইট ও মাইন মজুদ ধ্বংস করে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
৩. পরমাণু স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ:
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তবে স্টুয়ার্টের মতে, এটি বর্তমান স্বল্প সংখ্যক সৈন্য দিয়ে করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এর জন্য বিশাল এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থল উপস্থিতি প্রয়োজন।

সাবেক ন্যাটো কমান্ডার অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস সতর্ক করে বলেছেন, খাশক দ্বীপে হামলা চালাতে গেলে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের ড্রোন, বিস্ফোরক বোঝাই ছোট নৌকা এবং মিসাইল হামলার মুখে পড়তে হবে। দ্বীপটি দখল করা সহজ হলেও সেখানে ইরানি বাহিনী প্রচুর ‘মরণফাঁদ’ পেতে রাখতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
পরিশেষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খারগ দ্বীপ বা পরমাণু স্থাপনার মতো কৌশলগত জায়গায় হামলা চালানো হলে ইরান আরও কঠোর পাল্টাপাল্টি জবাব দিতে পারে, যা পুরো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে দেবে।
উত্তেজনার মাঝেও কূটনীতির শেষ চেষ্টা: চাপের মুখে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে এই বিশাল সামরিক সমাবেশ মূলত একটি খণ্ডিত ও অনিশ্চিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমান্তরালে পরিচালিত হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞ রুবেন স্টুয়ার্টের মতে, এই পদক্ষেপকে যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বরং ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হিসেবে দেখা ভালো।
এই সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা ইরানকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক পথও খোলা আছে।”
তবে স্টুয়ার্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এটি একটি অত্যন্ত নাজুক ভারসাম্য রক্ষা মাত্র। তার ভাষায়, “যদি সৈন্য সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে এবং বিশেষ করে দ্রুত সাড়াদানকারী ইউনিটের পরিবর্তে ভারী ও দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কাঠামো তৈরি করা হয়, তবে যুদ্ধের এই গতি ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে সৈন্য মোতায়েনের মাত্রা সেই সীমার নিচেই আছে, তবে এই ধারা অব্যাহত থাকলে অনিচ্ছাকৃতভাবে বড় ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি এবং কূটনীতির সুযোগ উভয়ই কমে আসতে পারে।”
ট্রাম্পের আলোচনার দাবি বনাম ইরানের অস্বীকার: মধ্যস্থতায় পাকিস্তান
গত ২৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৫টি পয়েন্টে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই আলোচনাকে তিনি ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইরান সরাসরি কোনো আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, কিছু বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনের আলোচনার প্রস্তাব পেয়েছেন এবং তার যথাযথ জবাবও দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষে ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, হয় হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে, না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে। তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি আলোচনার অগ্রগতি উল্লেখ করে এই আলটিমেটাম আরও পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেন।
এই তীব্র উত্তেজনার মাঝে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পাকিস্তান। দেশটি নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে। গত রবিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ট্রাম্পের সাথে কথা বলেন এবং সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে আলোচনা করেন।
গত ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সরাসরি ট্রাম্প ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে ট্যাগ করে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত থাকলে চলমান সংঘাতের একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধানের লক্ষ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তান প্রস্তুত এবং সম্মানিত বোধ করবে।” কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেহবাজ শরীফের এই প্রস্তাবটি শেয়ার করেন।