ইরান যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা চলাকালে ভালো করতে পারেনি ভারতীয় মুদ্রা রুপি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে, তখন এক ডলারে বিপরীতে রুপির মান ছিল ৯০ দশমিক ৯৫। মার্চের শেষে মান আরও ৪ শতাংশ কমে বর্তমানে এক ডলারে পাওয়া যাচ্ছে ৯৪ দশমিক ৬৫ রুপি।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে শুল্কারোপ করলে তখনও রুপির মান প্রায় ৫ শতাংশ কমেছিল। এ ছাড়া দুর্বল অভ্যন্তরীণ বাজার এটিকে এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রায় পরিণত করে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রুপির ক্ষেত্রে গত মাসে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এবং গত বছরেও ঘন ঘন সংবাদপত্রে ‘রেকর্ড নিম্ন’ শব্দের ব্যবহার দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। তারা এমন কিছু নিয়ম চালু করে, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে রুপির মান আরও কমবে বলে বাজি ধরতে না পারে।
এর ফলে একদিকে ব্যাংকগুলো কিছু ক্ষতির মুখে পড়ে, কিন্তু অন্যদিকে রুপির পতন কিছুটা থাম যায় এবং এর মান প্রায় ৯২ দশমিক ৫-এর কাছাকাছি ধরে রাখা সম্ভব হয়।
এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনীতি সামলানোর জন্য নয়, রাজনৈতিক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুদ্রার মান কমে গেলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়তে পারে, যা সরকারের জন্য চাপ তৈরি করে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারতে মানুষ তাদের মুদ্রার মান নিয়ে বেশ সচেতন। সাধারণত তুরস্কের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে মানুষ মুদ্রার ওঠানামা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। এমনকি উন্নত দেশেও, যেমন ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যে, মুদ্রার মূল্য রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। দেশের সরকার তুলনামূলক স্থিতিশীল, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। তারপরও মানুষ রুপির মান নিয়ে এতটা চিন্তিত থাকে।
ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্সতবে রুপির দুর্বলতার পেছনে বহু কারণ রয়েছে, যার সবই কিন্তু অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু সাধারণভাবে মানুষ ক্ষমতাসীনদেরই দায়ী করে। কেন এমনটা হয়?
এর একটি কারণ হলো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাকে জোরদার করেছেন। ২০১৩ সালে দেশটিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বড় চলতি হিসাব ঘাটতির কারণে রুপির মান প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে যায়। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে কিছু নীতিগত পরিবর্তন হয়, যা দেখে বিনিয়োগকারীরা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং ভারত থেকে বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেন। এতে রুপির মান দ্রুত কমে যায়।
এই পরিস্থিতিতে, তখন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেন নরেন্দ্র মোদি এবং এই সংকটের জন্য তাদের দায়ী করেন। তিনি এক বক্তব্যে বলেন, “এটি শুধু অর্থনৈতিক কারণে হয়নি, বরং দিল্লির দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির ফল।”
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মোদি খুব হিসাব করে রাজনীতি করেন এবং পরিস্থিতি কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, তা জানেন। সে সময় কংগ্রেস দল জনপ্রিয় ছিল না এবং তাদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত রুপির মানকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে। তাই এই বিষয়টি মানুষের আবেগের সঙ্গেও জড়িত। দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক বিশ্লেষক সৃজন শুকলা বলেন, একটি শক্তিশালী মুদ্রাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই জায়গাটিই মোদি কাজে লাগিয়েছিলেন। রুপিকে কেন্দ্র করে যে আবেগ রয়েছে, সেটিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ দেন তিনি। এখন বিরোধী রাজনীতিকরাও সেই কাজটিই করছেন।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মানুষের কাছে রুপি ও দেশের বিশ্বে অবস্থানের সম্পর্কটা সবচেয়ে গভীরভাবে তৈরি হয় ১৯৯১ সালে। সেই বছর ভারত ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। তখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছিল এবং তেলের দামও বেড়ে গিয়েছিল, ফলে ভারতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। দেশটির হাতে এত কম বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল যে তা দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের আমদানি খরচ মেটানো যেত। এই সংকটের কারণেই ভারত বাধ্য হয়ে অর্থনীতি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করে।
ডলারের তুলনায় দাম কমেছে রুপির। ছবি: রয়টার্সসংকট সামাল দিতে সরকার প্রায় ৫০ টন স্বর্ণ বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়। যা অনেকের কাছে ছিল পরিবারের মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রাখার মতো অপমানজনক ঘটনা। এরপর রুপির মান প্রথমে ৯ শতাংশ এবং দুই দিন পর আরও ১১ শতাংশ কমানো হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তোলে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ১৯৯১ সালের সেই সংকট-পরবর্তী সংস্কারগুলোই ভারতকে অর্থনৈতিক উন্নতির পথে নিয়ে যায়। আজ দেশটি একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আরেকটি বড় পেমেন্ট সংকটের ঝুঁকি এখন কম, কারণ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিশ্বের অন্যতম বড়, যা প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম।
তবুও ১৯৯১ সালের সেই অভিজ্ঞতা জাতীয় মানসিকতায় গভীর ছাপ ফেলেছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে রুপির মান দ্রুত কমে যাওয়া এখনো অনেককে সেই সময়কার অপমান ও সংকটের স্মৃতির মনে করিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রুপির বর্তমান দরপতন বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেল, গ্যাস, খাবার ও অন্যান্য জিনিসের দাম বাড়তে পারে। সরকারেরও বেশি ভর্তুকি দিতে হয়, তাই খরচ বেড়ে যায়। তবে এর একটা ভালো দিকও আছে—ভারতের পণ্য বিদেশে তুলনামূলক সস্তা হয়ে গেলে রপ্তানি বাড়তে পারে।
একইসঙ্গে যদি তেলের দাম বেশি থাকে আর রুপির মান কমে যায়, তাহলে অর্থনীতির ওপর বড় চাপ পড়তে পারে। এটা দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে খারাপ হলেও সরকার কিছু নীতি নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
প্রতীকী ছবিএছাড়া গত কয়েক সপ্তাহে ভারত জ্বালানির খুচরা দাম বাড়ায়নি, যদিও অনেক দরিদ্র দেশে তা বেড়েছে। আর সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির কারণে কিছুটা আর্থিক স্বস্তিও মিলতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা এই ব্যয়বহুল ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন। উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং রুপির কাঠামোগত দুর্বলতা ভবিষ্যতেও মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যে আবার সংঘাত শুরু হলে বা নতুন কোনো বৈশ্বিক ধাক্কা এলে রুপির মান ডলারের বিপরীতে ১০০-এর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এটি সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ মোদি ভালোভাবেই জানেন, রুপির দরপতন মানুষের মধ্যে কতটা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ন্যায়সঙ্গত হোক বা না হোক, অনেক ভারতীয়ই রুপির মান ১০০-এ পৌঁছানোকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখবে।