গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন তিনি।
বেসরকারি ফলাফলে অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে বিএনপি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
তারেক রহমান আমেরিকার প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশগঠনে তার পাঁচটি প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত ও সামাজিক বৈষম্য নিরসনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা-মানুষ যেন রাস্তায় ও ব্যবসায় নিরাপদ থাকে।” তিনি আরও বলেন, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে কোনো নীতি বা কর্মসূচি দিয়েই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
জাতীয়ঐক্য
টাইম বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া গত ১৫ বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০০ জন গুমের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার ক্ষত এখনো গভীর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয়করণ হওয়া সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া ২০০১ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার নজির এখনো মনে রেখেছে সাধারণ মানুষ।
তবে এবার প্রতিশোধ নয়, ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রতিহিংসা কিছুই ফিরিয়ে আনবে না বরং সংযম ও ঐক্য দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। দেশে শান্তি বজায় রাখতে বিএনপি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তারেক।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। ২০০৬ সালে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও তরুণ বেকারত্ব অসন্তোষ বাড়ায়।
ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক সহায়তা দেওয়া। এ ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংক খাত উদারীকরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুর্নগঠন
টাইম বলছে, রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে গণঅভ্যুত্থানের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা বাড়ার এক পর্যায়ে জানুয়ারিতে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে। এর জবাবে সরকার বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
চলমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিএনপির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আশাবাদী ভারত। গত ডিসেম্বরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ একাধিক ইস্যুতে এখনো বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি বলেছে, তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেবে বিএনপি।
তারেকের ভাষ্য, শেখ হাসিনার আমলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত অনেক চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনৃ্র্গরঠনের জন্য সংশোধন করা প্রয়োজন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। বাংলাদেশের স্বার্থ এবং আমাদের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা আগে নিশ্চিত করতে হবে, এরপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ছবি: চরচা
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যুতে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। মার্কিন বাজারে কিছু পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগও তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং উড়োজাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপি ছাড়া বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে দেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। হাসিনা আমলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন জয় পেয়েছে।
দলীয় ইশতেহারে শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত তুলনামূলক সংযত ভাষা ব্যবহার করেছে। তারা নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, দলটির মৌলিক অবস্থান বদলায়নি। বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয় অস্বীকারসহ জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের কিছু নারীবিদ্বেষী মন্তব্য অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
টাইম বলছে, এর আগে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট থাকলেও এবার বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ইসলামপন্থীদের প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও আগামীতেও জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই থাকবে। তারেক রহমান বলেছেন, দেশের কল্যাণে সব দলের সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
টাইমকে তিনি বলেন, “শুধু বিএনপির নয়, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার বিশ্বাস করে-এমন সব রাজনৈতিক দলেরই দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে না যাই। জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে সামনের দিকে এগোতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা
কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা এই রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে রূপ নেয়।
পুরো আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা অগ্রভাগে ছিল এবং পরে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তবে ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ায় নারী ও সংখ্যালঘু সদস্যদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
আবার বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনে বিভাজন দেখা দেয়। পুরনো দলগুলোর নির্বাচনী প্রাধান্যে অনেক তরুণ হতাশ হয়েছে। বিশেষত জুলাই বিপ্লবে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও সংস্কার প্রক্রিয়ায় তারা অনেকটাই উপেক্ষিত ছিলেন।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সাবেক এনসিপি নেতা তাসনিম জারা বলেন, “বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের রাজনৈতিক বিকল্পের আশা এখনো আছে। তবে তা রাতারাতি আসবে না। পেশাগত সততা নিয়ে নাগরিকদের রাজনীতিতে আসা, চাপের মুখেও নীতিতে অটল থাকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে ধীরে ধীরে আস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সেটি সম্ভব। একটি আসনেও যদি তা সফল হয়, সেটিই প্রমাণ করবে যে পুরোনো ধারাই আমাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়।”
অন্যদিকে তারেক রহমান বলেন, “যারা (জুলাই অভ্যুত্থানে) প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, সে জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন তিনি।
বেসরকারি ফলাফলে অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে বিএনপি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
তারেক রহমান আমেরিকার প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশগঠনে তার পাঁচটি প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত ও সামাজিক বৈষম্য নিরসনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা-মানুষ যেন রাস্তায় ও ব্যবসায় নিরাপদ থাকে।” তিনি আরও বলেন, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে কোনো নীতি বা কর্মসূচি দিয়েই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
জাতীয়ঐক্য
টাইম বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া গত ১৫ বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০০ জন গুমের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার ক্ষত এখনো গভীর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয়করণ হওয়া সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া ২০০১ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার নজির এখনো মনে রেখেছে সাধারণ মানুষ।
তবে এবার প্রতিশোধ নয়, ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রতিহিংসা কিছুই ফিরিয়ে আনবে না বরং সংযম ও ঐক্য দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। দেশে শান্তি বজায় রাখতে বিএনপি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তারেক।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। ২০০৬ সালে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও তরুণ বেকারত্ব অসন্তোষ বাড়ায়।
ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক সহায়তা দেওয়া। এ ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংক খাত উদারীকরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুর্নগঠন
টাইম বলছে, রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে গণঅভ্যুত্থানের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা বাড়ার এক পর্যায়ে জানুয়ারিতে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে। এর জবাবে সরকার বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
চলমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিএনপির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আশাবাদী ভারত। গত ডিসেম্বরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ একাধিক ইস্যুতে এখনো বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি বলেছে, তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেবে বিএনপি।
তারেকের ভাষ্য, শেখ হাসিনার আমলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত অনেক চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনৃ্র্গরঠনের জন্য সংশোধন করা প্রয়োজন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। বাংলাদেশের স্বার্থ এবং আমাদের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা আগে নিশ্চিত করতে হবে, এরপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ছবি: চরচা
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যুতে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। মার্কিন বাজারে কিছু পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগও তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং উড়োজাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপি ছাড়া বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে দেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। হাসিনা আমলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন জয় পেয়েছে।
দলীয় ইশতেহারে শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত তুলনামূলক সংযত ভাষা ব্যবহার করেছে। তারা নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, দলটির মৌলিক অবস্থান বদলায়নি। বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয় অস্বীকারসহ জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের কিছু নারীবিদ্বেষী মন্তব্য অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
টাইম বলছে, এর আগে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট থাকলেও এবার বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ইসলামপন্থীদের প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও আগামীতেও জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই থাকবে। তারেক রহমান বলেছেন, দেশের কল্যাণে সব দলের সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
টাইমকে তিনি বলেন, “শুধু বিএনপির নয়, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার বিশ্বাস করে-এমন সব রাজনৈতিক দলেরই দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে না যাই। জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে সামনের দিকে এগোতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা
কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা এই রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে রূপ নেয়।
পুরো আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা অগ্রভাগে ছিল এবং পরে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তবে ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ায় নারী ও সংখ্যালঘু সদস্যদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
আবার বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনে বিভাজন দেখা দেয়। পুরনো দলগুলোর নির্বাচনী প্রাধান্যে অনেক তরুণ হতাশ হয়েছে। বিশেষত জুলাই বিপ্লবে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও সংস্কার প্রক্রিয়ায় তারা অনেকটাই উপেক্ষিত ছিলেন।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সাবেক এনসিপি নেতা তাসনিম জারা বলেন, “বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের রাজনৈতিক বিকল্পের আশা এখনো আছে। তবে তা রাতারাতি আসবে না। পেশাগত সততা নিয়ে নাগরিকদের রাজনীতিতে আসা, চাপের মুখেও নীতিতে অটল থাকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে ধীরে ধীরে আস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সেটি সম্ভব। একটি আসনেও যদি তা সফল হয়, সেটিই প্রমাণ করবে যে পুরোনো ধারাই আমাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়।”
অন্যদিকে তারেক রহমান বলেন, “যারা (জুলাই অভ্যুত্থানে) প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, সে জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”