ছেলেকে কেন সর্বোচ্চ নেতা বানাতে চাননি খামেনি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ছেলেকে কেন সর্বোচ্চ নেতা বানাতে চাননি খামেনি?
তেহরানের রাস্তায় নতুন ব্যানার, একসঙ্গে ইরানের তিন সর্বোচ্চ নেতা। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতাবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে মেনে নিতে পারেননি বা তিনি মানবেন না, এটাই অনুমেয়। তবে খোদ মোজতাবার বাবা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও চাননি যে তার ছেলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হোক।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আলি খামেনি তার ছেলেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে দেখতে চাননি। তবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসই (আইআরজিসি) মূলত মোজতাবাতে এই পদে বসাতে চাপ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদে বসার জন্য মোজতাবা খামেনির উপযুক্ততা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন আলি খামেনি।

ইরানের বিরোধী গ্রুপ ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসির গবেষণা পরিচালক খসরো ইসফাহানি নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, “খামেনি তার উইলে স্পষ্টভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন মোজতবাকে উত্তরসূরি করা না হয়।”

ইসফাহানি বলছেন, আলি খামেনি বিশ্বাস করতেন, মোজতাবার দেশ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক মর্যাদার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, “মোজতবা একজন অকার্যকর তরুণ আলেম, রাজনৈতিক জীবনে যার উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই। এত বছর তিনি কেবল তার বাবার নামের ওপর নির্ভর করেই ছিলেন।”

সাধারণত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস, যা আলেমদের একটি পরিষদ। কিন্তু ইসফাহানির দাবি, মোজতবার নিয়োগ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়নি। তার ভাষ্য, গত সপ্তাহে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন আইআরজিসি তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি কার্যত চাপিয়ে দেয়।

ইরানের ভেতরের সূত্রের বরাত দিয়ে ইসফাহানি আরও দাবি করেন, মোজতবা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটও পাননি। আইআরজিসির চাপের কারণে কয়েকজন আলেম সেই বৈঠক বয়কট করেন, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করা হয়।

ইসফাহানি জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় আলি খামেনি নিহত হলে তার জায়গায় অন্য কাউকে নির্বাচিত করার দায়িত্ব ছিল অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের। তবে এই পরিষদের সদস্যরা মোজতাবাকে ভোট দেননি।

তার দাবি, আইআরজিসি মোজতাবাকে এমন একজন হিসেবে দেখে, যাকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তিনি বলেন, “তারা তাকে একটি পুতুল হিসেবে দেখে, একটি ফাঁকা ক্যানভাস- যার ওপর তারা যা খুশি আঁকতে পারে।”

এদিকে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত থাকতে হবে। ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় যেমন ভূমিকা ছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকা উচিত।”

ট্রাম্প বলেন, “তারা সময় নষ্ট করছে। খামেনির ছেলে দুর্বল নেতা। আমরা এমন একজন নেতাকে দেখতে চাই, যিনি ইরানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারবেন।”

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এমন কোনো নতুন ইরানি নেতা মেনে নেবেন না, যিনি আগের মতোই নীতি অনুসরণ করবেন। তার মতে, তা হলে পাঁচ বছরের মধ্যে আবার যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোজতবা খামেনির জন্ম ১৯৬৯ সালে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর মাশহাদে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক আগে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত মোজতবা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর ১৯৮৭ সালের দিকে ইসলামি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।

এর এক বছর পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার বাবা আলি খামেনি। পরে মোজতবা খামেনি কোম শহরের শীর্ষ ধর্মীয় আলেমদের অধীনে পড়াশোনা করেন এবং নিজেও একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন। এর মাধ্যমে ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে এবং প্রভাব বাড়তে শুরু করে।

তবে দীর্ঘ সময় তিনি জনসমক্ষে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। পর্দার আড়াল থেকেই সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন এবং মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসতেন।

২০০৫ সালে রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সংস্কারপন্থীরা অভিযোগ করেন, মোজতবা খামেনি ধর্মীয় নেতৃত্ব ও বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে আহমাদিনেজাদকে জেতাতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

অন্যদিকে, যিনিই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হবেন তাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, আলি খামেনির মৃত্যুর পর মোজতাবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার পেছনে আইআরজিসির বড় ভূমিকা ছিল। এই পদক্ষেপ ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে সামরিক প্রভাব আরও বাড়াতে পারে।

সম্পর্কিত