চরচা ডেস্ক

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অশান্ত রাজ্য মণিপুরে এখন প্রধান সড়কগুলোজুড়ে সামরিক চেকপোস্ট। জাতিগত সহিংসতা শুরুর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির ক্ষত এখনো গভীর। এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক শ মানুষ, ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন দশ হাজারেরও বেশি। বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবাদমান পক্ষগুলোকে আলাদা করে রেখেছে, ফলে আপাত শান্তি ফিরেছে বটে। কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ভারতের অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে বিষয়টি দূরের কোনো সংকট মনে হলেও, বাস্তবে এটি পুরো দেশের জন্যই একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
বাহ্যিকভাবে, ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মণিপুরের দাঙ্গা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সহিংসতার মতোই মনে হতে পারে। দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকা দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে জমে থাকা উত্তেজনা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মণিপুরে এই সংঘাতের মূল দুই পক্ষ হলো—রাজ্যের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি কুকি সম্প্রদায়। তারা যাদের বেশিরভাগই খ্রিষ্টান এবং মণিপুরের জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ।
এই সহিংসতার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পরিচিত এক বিতর্ক—বিশেষ অধিকার ও সংরক্ষণ নিয়ে দ্বন্দ্ব। একটি আদালত মেইতেইদের ‘তফসিলি উপজাতি’ তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এতে মেইতেইরা সরকারি চাকরিতে কোটা এবং উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত জমিতে অধিকার পেত। বর্তমানে এসব সুবিধা পাওয়া কুকিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে এবং মেইতেইদের এই অতিরিক্ত সুবিধার আদৌ প্রয়োজন নেই। একটি কুকি প্রতিবাদ মিছিল থেকেই শুরু হয় সংঘাত, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নেয়।
মণিপুর সংকটকে অন্য দাঙ্গা থেকে আলাদা করে তুলেছে এর দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন। প্রায় তিন বছর পরও রাজ্যটি কার্যত জাতিগত রেখায় বিভক্ত। মেইতেইরা রাজধানী ইম্ফল ও আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ, আর কুকিরা বসবাস করছে পাহাড়ি অঞ্চলে। গত ৫ জানুয়ারি মেইতেই অধ্যুষিত বিষ্ণুপুরে দুটি বোমা বিস্ফোরণ প্রমাণ করে, সহিংসতা এখনো পুরোপুরি থামেনি।
উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখনও শরণার্থী শিবিরে বাস করছে। পরিত্যক্ত সরকারি ভবনে গাদাগাদি করে থাকা এসব মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অধিকাংশেরই স্থায়ী কাজ নেই। তারা দিনে মাত্র ৮৪ রুপি সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, আজীবনের সঞ্চয় কিংবা জীবনের নিরাপত্তাবোধ। এই হতাশা থেকেই কুকিরা এখন ‘আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’-এর দাবি তুলেছে, যা মেইতেই এবং কেন্দ্রীয় সরকার—দুই পক্ষই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মেইতেই ও কুকি—উভয় সম্প্রদায়ই মনে করে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মেইতেই নারী তাখেলবাম পূর্ণিমার ভাষায়, “সরকার চাইলে এই সংঘাত থামানো সম্ভব ছিল।” কুকিদের অভিযোগ, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী—যিনি একজন মেইতেই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উস্কে দিয়েছিলেন। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, চরমপন্থীদের দমনে প্রশাসনের ধীরগতি ও সিদ্ধান্তহীনতাই সহিংসতাকে দীর্ঘায়িত করেছে।
এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও বিজেপিকে দিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মণিপুরের দুটি আসনেই কংগ্রেস জয় পায়। তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতা চোখে পড়েনি। মুখ্যমন্ত্রী ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন; পরে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পদত্যাগ করলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। এর ফলে রাজ্যের শাসনভার সরাসরি দিল্লির আমলাদের হাতে চলে যায়। কেন্দ্রের এই দীর্ঘসূত্রিতা স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা তৈরি করেছে—দিল্লি তাদের সমস্যাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।
সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাফার জোনের আশপাশে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর দিল্লিতে দুই পক্ষের নেতারা এক বৈঠকে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সাম্প্রতিক সময়ে মণিপুর সফরও করেছেন। তবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না—তা এখনও অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মণিপুরের সংকট শুধু একটি রাজ্যের সমস্যা নয়; এর গভীর জাতীয় তাৎপর্য রয়েছে। অতীতে স্তিমিত হয়ে পড়া মেইতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবনা নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। সর্বোপরি, মণিপুর দেখিয়ে দিচ্ছে ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’র ভয়াবহ পরিণতি। জাতি বা গোষ্ঠীভিত্তিক বিশেষ সুবিধার প্রতিশ্রুতি বিভেদ কমানোর বদলে সমাজে আরও গভীর ফাটল তৈরি করতে পারে মণিপুর তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অশান্ত রাজ্য মণিপুরে এখন প্রধান সড়কগুলোজুড়ে সামরিক চেকপোস্ট। জাতিগত সহিংসতা শুরুর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির ক্ষত এখনো গভীর। এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক শ মানুষ, ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন দশ হাজারেরও বেশি। বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবাদমান পক্ষগুলোকে আলাদা করে রেখেছে, ফলে আপাত শান্তি ফিরেছে বটে। কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ভারতের অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে বিষয়টি দূরের কোনো সংকট মনে হলেও, বাস্তবে এটি পুরো দেশের জন্যই একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
বাহ্যিকভাবে, ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মণিপুরের দাঙ্গা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সহিংসতার মতোই মনে হতে পারে। দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকা দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে জমে থাকা উত্তেজনা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মণিপুরে এই সংঘাতের মূল দুই পক্ষ হলো—রাজ্যের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি কুকি সম্প্রদায়। তারা যাদের বেশিরভাগই খ্রিষ্টান এবং মণিপুরের জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ।
এই সহিংসতার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পরিচিত এক বিতর্ক—বিশেষ অধিকার ও সংরক্ষণ নিয়ে দ্বন্দ্ব। একটি আদালত মেইতেইদের ‘তফসিলি উপজাতি’ তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এতে মেইতেইরা সরকারি চাকরিতে কোটা এবং উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত জমিতে অধিকার পেত। বর্তমানে এসব সুবিধা পাওয়া কুকিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে এবং মেইতেইদের এই অতিরিক্ত সুবিধার আদৌ প্রয়োজন নেই। একটি কুকি প্রতিবাদ মিছিল থেকেই শুরু হয় সংঘাত, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নেয়।
মণিপুর সংকটকে অন্য দাঙ্গা থেকে আলাদা করে তুলেছে এর দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন। প্রায় তিন বছর পরও রাজ্যটি কার্যত জাতিগত রেখায় বিভক্ত। মেইতেইরা রাজধানী ইম্ফল ও আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ, আর কুকিরা বসবাস করছে পাহাড়ি অঞ্চলে। গত ৫ জানুয়ারি মেইতেই অধ্যুষিত বিষ্ণুপুরে দুটি বোমা বিস্ফোরণ প্রমাণ করে, সহিংসতা এখনো পুরোপুরি থামেনি।
উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখনও শরণার্থী শিবিরে বাস করছে। পরিত্যক্ত সরকারি ভবনে গাদাগাদি করে থাকা এসব মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অধিকাংশেরই স্থায়ী কাজ নেই। তারা দিনে মাত্র ৮৪ রুপি সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, আজীবনের সঞ্চয় কিংবা জীবনের নিরাপত্তাবোধ। এই হতাশা থেকেই কুকিরা এখন ‘আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’-এর দাবি তুলেছে, যা মেইতেই এবং কেন্দ্রীয় সরকার—দুই পক্ষই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মেইতেই ও কুকি—উভয় সম্প্রদায়ই মনে করে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মেইতেই নারী তাখেলবাম পূর্ণিমার ভাষায়, “সরকার চাইলে এই সংঘাত থামানো সম্ভব ছিল।” কুকিদের অভিযোগ, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী—যিনি একজন মেইতেই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উস্কে দিয়েছিলেন। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, চরমপন্থীদের দমনে প্রশাসনের ধীরগতি ও সিদ্ধান্তহীনতাই সহিংসতাকে দীর্ঘায়িত করেছে।
এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও বিজেপিকে দিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মণিপুরের দুটি আসনেই কংগ্রেস জয় পায়। তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতা চোখে পড়েনি। মুখ্যমন্ত্রী ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন; পরে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পদত্যাগ করলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। এর ফলে রাজ্যের শাসনভার সরাসরি দিল্লির আমলাদের হাতে চলে যায়। কেন্দ্রের এই দীর্ঘসূত্রিতা স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা তৈরি করেছে—দিল্লি তাদের সমস্যাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।
সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাফার জোনের আশপাশে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর দিল্লিতে দুই পক্ষের নেতারা এক বৈঠকে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সাম্প্রতিক সময়ে মণিপুর সফরও করেছেন। তবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না—তা এখনও অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মণিপুরের সংকট শুধু একটি রাজ্যের সমস্যা নয়; এর গভীর জাতীয় তাৎপর্য রয়েছে। অতীতে স্তিমিত হয়ে পড়া মেইতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবনা নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। সর্বোপরি, মণিপুর দেখিয়ে দিচ্ছে ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’র ভয়াবহ পরিণতি। জাতি বা গোষ্ঠীভিত্তিক বিশেষ সুবিধার প্রতিশ্রুতি বিভেদ কমানোর বদলে সমাজে আরও গভীর ফাটল তৈরি করতে পারে মণিপুর তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।