Advertisement Banner

পশ্চিমবঙ্গকে কোন পথে নিয়ে যেতে চান শুভেন্দু?

পশ্চিমবঙ্গকে কোন পথে নিয়ে যেতে চান শুভেন্দু?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

দীর্ঘ ৩৪ বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ছিল ক্ষমতায়। সেই মসনদ ভেঙে তাতে জেঁকে বসেছিলেন একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের সেই ঢিবি এবার ভেঙে দিল বিজেপি। আর চেয়ারে বসানো হলো তার দলেরই সাবেক এক নেতাকে, শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এসেই ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ শুরু করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে একটা বাড়তি আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশিদের মধ্যে। বিশেষ করে সেখানকার রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকে সীমান্তের এপারের বাসিন্দাদের। এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেই আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। আর শপথ নিয়েই বাংলাদেশ সীমান্ত সম্পর্কে কঠোর বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। এমনকি তার দলের নেতারা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গকে তারা বাংলাদেশের মতো হতে দেবেন না।

বিজেপির এই মুখ্যমন্ত্রী ও তার দল আসলে কী চাইছেন?

শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম সপ্তাহের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি মূলত শাসন ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলতে চাইছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রে বিজেপির নীতি ও হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একাত্মতা তৈরি করতে চাইছেন তিনি। এর অংশ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়েছেন, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের তিনি রেয়াত করবেন না। কলকাতার ভেতরে তিলজলার বেআইনি কারখানায় আগুন লাগার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুলডোজার দিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তারই নির্দেশে।

আলোচিত আর জি কর কাণ্ডে গাফিলতির অভিযোগে কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ ৩ আইপিএস অফিসারকে বরখাস্ত করেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক স্তরে একটি কড়া বার্তা দিয়ে রাখলেন শুভেন্দু।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বিজনেস টুডে বলছে, শুভেন্দু সরকার রাজ্যে বিএনএস এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদমশুমারি সংক্রান্ত নির্দেশিকা অবিলম্বে কার্যকর করেছে, যা আগের সরকার আটকে রেখেছিল।

শুভেন্দু সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত, ৪৫ দিনের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তর করা। এছাড়া, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি।

বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ রাহুল সিনহা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, “বাংলার মানুষ মূলত তৃণমূলের দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং বাংলাকে ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ’ বানানোর অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। শুভেন্দু বাবুর সরকার প্রথমে দুর্নীতি উপড়ে ফেলবে। কারণ দুর্নীতি দূর হলেই উন্নয়ন আসবে। আগের সরকার বিনীত গোয়েলদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করত, কিন্তু এই সরকার অ্যাকশন নিচ্ছে।”

বিজেপির মতে, শুভেন্দু বাংলাকে একটি সুরক্ষিত, তোষণমুক্ত এবং কেন্দ্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা প্রগতিশীল রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলছেন। নির্বাচনের আগেও এই বার্তাই দিয়েছিল দলটি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে কেন্দ্রের একটা যোগসূত্র না থাকলে জনগণ বঞ্চিত হওয়ার বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মমতার সরকার যেসব কেন্দ্রীয় প্রকল্প (যেমন–আয়ুষ্মান ভারত, পিএম কিষাণ বিমা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও) রাজ্যে কার্যকর করেনি, শুভেন্দু তা অবিলম্বে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি, যুবকদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৫ বছর বাড়িয়েছেন। সরকারি খালি পদে দ্রুত নিয়োগের ঘোষণাও এসেছে।

২০২১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার মামলাগুলো পুনরায় শুরুর নির্দেশ এবং ১৬ মে থেকে রাজ্যজুড়ে বেআইনি অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে বড়সড় অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো তৃণমূলের রাজনৈতিক ভিত্তিকে আইনিভাবে দুর্বল করা।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যেখানে সেখানে পশু জবাই নিষিদ্ধ করা, ‘ফিট টু স্লটার’ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক এবং ধর্মীয় স্থানে লাউডস্পিকারের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণ বা রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার বন্ধের নির্দেশ এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। এই বার্তা উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের ‘শাসন মডেল’-এর ছোঁয়া বহন করে। তবে এমন এক সময় এই ঘোষণা দিল শুভেন্দু সরকার, যখন কোরবানি ঈদ সামনে। তবে এতে মুসলমানদের কোনো সমস্যা হবে না বলে দাবি করেছেন দলটির একাধিক নেতা। পশু জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। সেখানেই কোরবানি দেওয়া যাবে।

শুভেন্দুর এই পথ চলা কতটা গণতান্ত্রিক আর কতটা রাজনৈতিক–তা নিয়ে রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ রয়েছে।

পরাজয়ের পর তৃণমূল প্রধান মমতা নিজেই কলকাতা হাইকোর্টে গিয়েছেন ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় তাদের কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে। দলটির এক শীর্ষ নেতা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, “প্রথম সাতদিনেই আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। শুভেন্দুর এই তৎপরতা আসলে সহিংসতা ঢাকার চেষ্টা। তবে মমতা একজন লড়াকু নেত্রী, আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব।”

দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছেন বলে তৃণমূলের অভিযোগ। তাদের দাবি, মনোজ আগরওয়ালকে মুখ্যসচিব বা সুব্রত গুপ্তকে উপদেষ্টা করে আমলাতন্ত্রে একটা ঝামেলা তৈরি করা হচ্ছে।

সিপিআই (এম)–এর রাজ্য সম্পাদক মুহম্মদ সেলিম শুভেন্দুর এই প্রথম সপ্তাহের তৎপরতাকে ‘গুড কপ-ব্যাড কপ’ খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, “আর জি কর কাণ্ডে আইপিএসদের সাসপেন্ড করা ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু সিবিআই মূল ষড়যন্ত্র কেন উদঘাটন করতে পারল না? আর তিলজলায় বুলডোজার দিয়ে ভবন ভাঙা তো পেশী শক্তির রাজনীতি। ভবন ভাঙলেন, কিন্তু যে শ্রমিকরা মারা গেলেন বা কাজ হারালেন, তাদের ক্ষতিপূরণের কী হবে? বেআইনি ভবনের জন্য কলকাতা পৌরসভাও দায়ী, সেটার বিচার কই?”

ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী তিলজলার বুলডোজার অ্যাকশনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, “এটি সুশাসনের কোনো উদাহরণ হতে পারে না। বাড়ির মালিকদের তাদের নথিপত্র দেখানোর বা নিজেদের পক্ষ সমর্থনের সময় দেওয়া উচিত ছিল। এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।”

প্রাথমিক কার্যক্রম দেখে এই ধারণা করা ভুল হবে না, শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গকে অত্যন্ত আগ্রাসী, কেন্দ্রীয় নীতি-অনুগামী এবং কড়া আইন-শৃঙ্খলার পথে নিয়ে যেতে চাইছেন।

তার সমর্থকেরা এটিকে বাংলার ‘পরিবর্তন ২.০’ হিসেবে দেখলেও বিরোধীদের চোখে এটি বুলডোজার নীতি ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক চরমপন্থী রূপ। শুভেন্দুর এই আগ্রাসী মনোভাব দীর্ঘমেয়াদে বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কতটা স্থিতিশীল করতে পারবে–তা সময়ই বলবে।

সম্পর্কিত