২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রিত অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী সামরিক কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন। হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সামরিক যানবহরের পাশাপাশি এ বছর এক নতুন দৃশ্য চোখে পড়ে। তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পতাকা বহনকারী সেনাদের একটি ছোট দল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা।
পরদিন এক যৌথ সম্মেলনে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাধিক চুক্তি ঘোষণা করে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতির পেছনে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুল্ক আরোপে তার আগ্রাসী নীতি এবং মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার প্রবণতা না থাকলে, হয়ত ভারত ও ইউরোপ এত দ্রুত একে অপরের কাছে আসত না।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ভারত ও ইউরোপ একই ধরনের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
ব্রিটিশ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের চিয়েতিজ বাজপেয়ীর ভাষায়, ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাবের মুখে ভারত এবং আটলান্টিকে আমেরিকার ছায়ায় ইউরোপ—উভয়ই ‘গৌণ শক্তি’ হিসেবে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ভারত এশীয় প্রতিযোগীদের পাশ কাটিয়ে ক্রমশ পশ্চিমা বাজারের দিকে ঝুঁকছে, আর ইউরোপ বিশ্বজুড়ে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ খুঁজছে। এরই অংশ হিসেবে গত ১৭ জানুয়ারি ইইউ ল্যাটিন আমেরিকার মেরকোসুর জোটের সঙ্গেও একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সস্বল্পমেয়াদে ভারত–ইইউ চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিতই থাকবে। বর্তমানে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নবম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারতে ইইউ-এর রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ইউরো, যা ইইউ-এর মোট জিডিপির মাত্র ০.৪ শতাংশ। ভারত ইউরোপীয় পণ্যের ওপর গড়ে ৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস তাৎপর্যপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে নামানো হবে, যদিও তা নির্দিষ্ট কোটা সাপেক্ষে। তবু বড় বাধা রয়ে গেছে শুল্ক-বহির্ভূত নিয়মকানুনে। ভারতের গুণমান নিয়ন্ত্রণ আদেশের কারণে বহু ইউরোপীয় পণ্য বন্দরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে থাকে। চুক্তিতে এই সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বিতর্কিত নিয়ন্ত্রক বিষয়গুলো মূলত অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই চুক্তির গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক অভিযানে ভারত ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে রুশ তেল আমদানির কারণে আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্কের ফলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানির পরিমাণ ১০৫ বিলিয়ন ইউরো, যা প্রায় আমেরিকায় ভারতের রপ্তানির সমান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্ক মাত্র ৪ শতাংশ। তবে ভারতের ঐতিহাসিক সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে এই চুক্তি ইইউ-এর অন্যান্য সাম্প্রতিক চুক্তির তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম বিস্তৃত। অনেক কৃষিপণ্য এবং সংবেদনশীল বিষয় এর বাইরে রাখা হয়েছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (যেমন গ্রিসের ফেটা চিজ বা ভারতের বাসমতি চাল) সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলাদা চুক্তিতে নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ সত্ত্বেও ভারত তার ঐতিহাসিক রুশ সম্পর্ক থেকে সরে আসতে নারাজ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিএই চুক্তির মূল লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা জোরদার করা। মুক্ত বাণিজ্যের পাশাপাশি একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বও স্বাক্ষরিত হয়েছে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের গরিমা মোহনের মতে, এটি পারস্পরিক আস্থার এক নতুন স্তরের ইঙ্গিত দেয়। ভারত আশা করছে, ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের জন্য বড় পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা সরবরাহ করতে পারবে। পাশাপাশি, তরুণ ভারত থেকে বার্ধক্যপীড়িত ইউরোপে দক্ষ জনশক্তি স্থানান্তর এবং ইইউ-এর গবেষণা তহবিল ‘হরাইজন’-এ ভারতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ সত্ত্বেও ভারত তার ঐতিহাসিক রুশ সম্পর্ক থেকে সরে আসতে নারাজ। উল্লেখযোগ্যভাবে, রাশিয়ার ওপর ইইউ-এর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞায় তিনটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ইইউ-এর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম নিয়েও ভারতের আপত্তি রয়েছে। ভারতের মতে, এটি পরিবেশ সুরক্ষার নামে নতুন ধরনের সুরক্ষাবাদ।
সব বাধা সত্ত্বেও এই সপ্তাহের চুক্তিগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তিদের দ্বন্দ্বের বাইরে থেকেও ভারত ও ইউরোপের মতো শক্তিগুলোর জন্য নিজেদের পথ গড়ে নেওয়ার সুযোগ এখনো খোলা আছে।