Advertisement Banner

‘গড় দারিদ্র্যে’ কে এগিয়ে, ইউরোপ নাকি আমেরিকা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘গড় দারিদ্র্যে’ কে এগিয়ে, ইউরোপ নাকি আমেরিকা

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি ও অন্যতম ধনী রাষ্ট্র আমেরিকা। কিন্তু দৃশ্যত শক্তিশালী এই অর্থনীতির আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার এক কঠিন বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক অলিভিয়ার স্টার্কের এই গবেষণাটি প্রথাগত দারিদ্র্য পরিমাপের সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে, যার নাম ‘গড় দারিদ্র্য’। এই নতুন পরিমাপক অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, গড় দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।

অলিভিয়ার স্টার্কের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে দারিদ্র্যকে কেবল আয়ের অংকে না মেপে, একজন মানুষের ১ ডলার আয় করতে কতটুকু সময়ের প্রয়োজন হয়, তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, আমেরিকায় ১ ডলার আয় করতে গড়ে ৬৩ মিনিট সময় ব্যয় করতে হয়।

এর বিপরীতে ইউরোপের দেশগুলোতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জার্মানিতে এই সময় লাগে মাত্র ২৬ মিনিট, ফ্রান্সে ৩১ মিনিট এবং যুক্তরাজ্যে ৩৪ মিনিট। অর্থাৎ, ১ ডলার সমপরিমাণ পণ্য কেনার সক্ষমতা অর্জনে একজন মার্কিন নাগরিককে ইউরোপীয়দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় লড়াই করতে হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে গড় দারিদ্র্যের তীব্রতা ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি।

প্রথাগত অর্থনৈতিক সূচক যেমন—মাথাপিছু জিডিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতম অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির মাথাপিছু জিডিপিও ( ৫৩ হাজার ৮৭২ ডলার) জার্মানির মাথাপিছু জিডিপির কাছাকাছি। তবুও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিফলিত হচ্ছে না। গবেষণার এই তথ্যটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেন দেশটির সাধারণ মানুষ ইউরোপের তুলনায় বেশি অভাব বোধ করছে?

গবেষক অলিভিয়ার স্টার্কের মতে, এই অসঙ্গতির মূল কারণ হলো প্রকট ‘আয় বৈষম্য’। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১ ডলার আয় করতে যেখানে ৪৩ মিনিট সময় লাগতো, ৩৫ বছর পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ মিনিটে। অথচ একই সময়ে জার্মানি বা ফ্রান্সে এই সময় কমেছে। এর কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক দশকে জিডিপি বা গড় আয় বাড়লেও সেই সম্পদের সিংহভাগ একটি নির্দিষ্ট ধনিক শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা এবং আয়ের সুষম বণ্টন বজায় থাকায় সেখানে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। কোনো দেশের আয় বা সম্পদের বৈষম্য পরিমাপের একটি পরিসংখ্যানগত সূচক গিনি কোইফিশিয়েন্ট অনুযায়ী, ধনী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই বর্তমানে বৈষম্যের হার সবচেয়ে বেশি।

তবে এই গবেষণায় একটি ইতিবাচক বৈশ্বিক প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য প্রায় ৫৫ শতাংশ কমেছে। গড়ে ১ ডলার আয় করতে প্রয়োজনীয় সময়ও পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতিবাচক প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে, কেবল জিডিপির সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। যদি আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না যায়, তবে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিও সাধারণ মানুষকে দরিদ্রতর করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য শুধু অর্থ উৎপাদন নয়, বরং আয়ের বৈষম্য কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের সময়ের মূল্য নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: ইউরোনিউজ

সম্পর্কিত