দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস তরল আকারে (এলএনজি) রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় পরিবহনের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার পরিবর্তে ভোলাতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জোরাল প্রস্তাব এসেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) মনে করছে, এই বিকল্প প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বছরে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন বিশেষজ্ঞদের একজন।
ভোলা থেকে গ্যাস আনার যে প্রস্তাব
ভোলার গ্যাস দেশের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও করা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনার পরিকল্পনা করে। পেট্রোবাংলা পরিবহন খরচসহ প্রতি ঘনফুট গ্যাসের দাম ৪৭ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের ওপরই গণশুনানি হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস সিএনজি আকারে দৈনিক পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট আনার জন্য একটি দেশীয় কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। তখন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্যাসের দাম ১৭ টাকা এবং পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ ৩০ দশমিক ৫০ টাকাসহ সর্বমোট ৪৭ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে বর্তমানে আইনি পরিবর্তনের ফলে নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম নির্ধারণের সুযোগ নেই।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন যে, এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহনের বিষয়টি একেবারেই নতুন এবং এর বিভিন্ন কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নদীপথে এলএনজি আকারে পরিবহন করে ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকাগুলোতে সরবরাহ করা হবে। যে সকল কোম্পানি এই গ্যাস পরিবহনের দায়িত্ব পাবে, তারা ভোলা থেকে গ্যাস কিনে নির্ধারিত দরে আগ্রহী শিল্প কারখানায় পৌঁছে দেবে। এই কাজ পাওয়ার জন্য মেঘনা শিপ অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ঢাকা, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারী ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন এবং জিসিজি এলএনজিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, সরবরাহ কোম্পানি তিতাস গ্যাসের আওতাভুক্ত এলাকার প্রায় ৩২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান এই গ্যাস নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে, যাদের মোট দৈনিক চাহিদা ১৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাসের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে এবং ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে সরবরাহ শুরু করার বিষয়ে আশা জানিয়েছে।
সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মজুত নিশ্চিত করার জন্য গ্যাস সরবরাহ ও সংগ্রহের উভয় প্রান্তে পাঁচ দিনের এলএনজি মজুত করার মতো স্টোরেজ নির্মাণের শর্ত দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট থাকলেও অবকাঠামো ও পাইপলাইনের অভাবে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও কয়েক দশক ধরে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন স্থাপনের আলোচনা চলছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু মূলত অর্থায়ন সংকটের কারণেই এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে রয়েছে।
এলপিজি সিলিন্ডারবিপিডিবির বিকল্প প্রস্তাব ও ব্যয়ের তুলনা
মঙ্গলবার ভোলার প্রস্তাবিত এলএনজির দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত শুনানিতে বিপিডিবির অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী নতুন প্রস্তাব দেন। তার মতে, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনতে প্রতি ঘনমিটারে পরিবহন ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ দশমিক ৯০ টাকা। এই হিসেবে বছরে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনে ব্যয় হবে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা এবং ১০ বছরের চুক্তিতে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
সৈয়দ জুলফিকার আলী প্রস্তাব করেন, এই বিপুল অর্থ অপচয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা অনেক বেশি যৌক্তিক। তিনি বলেন, প্রতি ঘনমিটার গ্যাস থেকে ৪ থেকে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব । সেই বিদ্যুৎ বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ঢাকায় আনতে প্রতি ইউনিটে খরচ হবে মাত্র ১ দশমিক ২৪ টাকা। মাত্র দুই বছরের পরিবহন ব্যয়ের সমান অর্থ দিয়েই একটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বিপিডিবির এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাইপলাইন ছাড়াই গ্যাস পরিবহনের জন্য এত বড় বিনিয়োগ বর্তমানে যৌক্তিক নয়।
ইজাজ হোসেনের চরচাকে বলেন, “ওখান থেকে এটাকে (গ্যাস) আনব কেন? পাইপলাইন করে যদি ওখানেই ব্যবহার করা যায় ওরাও তো দেশেরই লোক।”
এই বিশেষজ্ঞ আরও উল্লেখ করেন যে, ভোলার ওইসব এলাকায়ও বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তাই গ্যাস সেখানে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাটাই শ্রেয়।
তার মতে, “ভোলার গ্যাসের বর্তমান যে মজুত আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, তাতে এত বিপুল অর্থ খরচ করে এলএনজি আকারে গ্যাস আনা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা হিসেবে সঠিক হবে না। বর্তমানে ভোলায় দৈনিক ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে এবং অনেক শিল্পকারখানা সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। যদি আরও শিল্পকারখানা সেখানে যায়, তবে ওই গ্যাস স্থানীয়ভাবেই ব্যবহৃত হবে, যা জাতীয় গ্রিডে আনার চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।”
গ্যাস সিলিন্ডারভোলার গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চললেও দ্বীপ জেলা ভোলায় চাহিদার অভাবে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, ভোলায় এ পর্যন্ত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা না থাকায় এবং জাতীয় গ্রিডের সাথে কোনো সংযোগ না থাকায় মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা আগামীতে আরও ১৫টি কূপ খননের পরিকল্পনা করছে, যা হলে ভোলার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। ভোলার এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে কয়েক দশক ধরে পাইপলাইন স্থাপনের আলোচনা চললেও অর্থায়ন জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের প্রাক-সমীক্ষা শেষ হয়েছে এবং বরিশাল-ঢাকা অংশের কাজ চলছে।
গণশুনানিতে অন্য মত ও বিইআরসি
গণশুনানিতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি জানিয়েছে, এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন একটি নতুন ধারণা হওয়ায় এর সুনির্দিষ্ট ব্যয় নির্ধারণ করা কঠিন, তবে ২৯ দশকি ৯০ টাকা সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে ধরা যেতে পারে। বর্তমানে পেট্রোবাংলা নির্বাহী আদেশে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে পরিবহন করছে, যার দামসহ ভোক্তাকে ৪৭ দশকি ৫০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
তবে এই উচ্চ মূল্যের তীব্র সমালোচনা করেন শুনানিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন বক্তা। তাদের মতে, বিগত সময়ে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল এবং বর্তমান কমিশনের উচিত এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, তারা সব পক্ষের মতামত নোট করেছেন এবং আগামী ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যে কেউ লিখিত মতামত জমা দিতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, ভোলার গ্যাস আনার ক্ষেত্রে পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়টিও তাদের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব পাবে।
দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি কৌশল
ইজাজ হোসেন দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে আমাদের যে বিশাল গ্যাসের ঘাটতি, তা কেবল ভোলার গ্যাস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আমাদের আরও বড় ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হবে অথবা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। তার মতে, ধীরে ধীরে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন এবং যারা আমদানি করা এলএনজির প্রকৃত দাম দিতে পারবে, কেবল তাদেরই গ্রিডে রাখা উচিত।
সার্বিকভাবে, ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে রাজধানীতে আনার চেয়ে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা পাইপলাইন স্থাপন করা অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এখন দেখার বিষয়, বিইআরসি ও সরকার বিপিডিবির এই ৯৩০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের প্রস্তাবকে কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে।