মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন ও ভয়াবহ বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে– এই যুদ্ধ শুধু তেল বা সামরিক ঘাঁটি ঘিরে নয়, বরং জীবনধারণের মৌলিক অবকাঠামো, বিশেষ করে পানির উৎসকে কেন্দ্র করেও বিস্তৃত হতে পারে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব মিঠা পানির উৎস প্রায় অনুপস্থিত, সেখানে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ বা ডেসালিনেশনই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। আর সেই ব্যবস্থাই এখন যুদ্ধের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে।
এই অঞ্চলের পানি নিরাপত্তা মূলত প্রযুক্তিনির্ভর। হাজার হাজার ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট প্রতিদিন কোটি কোটি ঘনমিটার পানি উৎপাদন করে শহর, শিল্প ও জনজীবন সচল রাখে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন– এসব দেশে পানির প্রায় পুরোটাই আসে এসব প্ল্যান্ট থেকে। সৌদি আরবের মতো বড় দেশও তার প্রধান শহরগুলোর জন্য এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, এই অবকাঠামোতে কোনো বড় ধরনের আঘাত মানে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যকারিতা থমকে যাওয়া।
যুদ্ধের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে যে আঘাতের লক্ষ্যবস্তু সামরিক স্থাপনা ছাড়িয়ে এই ধরনের বেসামরিক অবকাঠামোয় গিয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে কিছু ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এই আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেছে। একটি প্ল্যান্টের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেমন উচ্চচাপের পাম্প বা মেমব্রেন ইউনিট– ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি বড় শহর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে।
এই সংকটের গভীরতা আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, অধিকাংশ ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত মানে পানি উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই দ্বৈত নির্ভরতা একটি ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিওর’ তৈরি করেছে, অর্থাৎ একটি আঘাতেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা অচল হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহই অনিশ্চিত, তখন পানি উৎপাদনও সমানভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই অবকাঠামোগুলোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, এগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান। অধিকাংশ প্ল্যান্টই উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত, যা সহজেই ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আওতায় পড়ে। এগুলোকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করা প্রায় অসম্ভব। বড় আকার, খোলা অবস্থান এবং সরাসরি সমুদ্রের ওপর নির্ভরতা– সব মিলিয়ে এগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। একটি মাত্র সফল হামলাই কয়েক লাখ বা কয়েক মিলিয়ন মানুষের পানির সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।
এই যুদ্ধের আরেকটি অদৃশ্য দিক হলো সাইবার আক্রমণ। আধুনিক ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো জটিল ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে সরাসরি বোমা হামলার বদলে সফটওয়্যার বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেও পুরো প্ল্যান্ট অচল করে দেওয়া সম্ভব। এমনকি পানির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে তা ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলাও সম্ভব। এই ধরনের আক্রমণ শনাক্ত করা কঠিন। এবং তা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে– যা যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবেই ব্যবহৃত হতে পারে।
পরিবেশগত ঝুঁকিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। পারস্য উপসাগরের পানি তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ এবং ধীরগতিতে নবায়ন হয়। ফলে বড় ধরনের তেল দূষণ বা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে যেতে পারে। ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো তখন তাদের পানি গ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হবে, যাতে সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এর ফলে পানি উৎপাদন হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক মডেল স্থিতিশীলতা এবং অবিচ্ছিন্ন পরিষেবার ওপর দাঁড়িয়ে। পানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শিল্প, রিয়েল এস্টেট এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। বিমা খরচ বেড়ে যায়, প্রকল্প স্থগিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলো কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। মোবাইল ডেসালিনেশন ইউনিট, ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ এবং ছোট ছোট বিকেন্দ্রীভূত প্ল্যান্ট– এসব উদ্যোগে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভূগর্ভে বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। একইসঙ্গে পানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তবে এইসব উদ্যোগ সত্ত্বেও মূল সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে। এই অঞ্চল প্রকৃতিগতভাবে পানির জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তিনির্ভর। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মানবসম্পদ– সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক এবং দক্ষ কর্মীদের অভাব হলে প্ল্যান্ট চালু রাখা কঠিন হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বেসামরিক জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং তা লক্ষ্যবস্তু করা নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এই নীতির প্রয়োগ প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ‘ডুয়াল ইউজ’ বা দ্বৈত ব্যবহারের যুক্তিতে এই ধরনের অবকাঠামোও আঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এর ফলে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
সবশেষে, এই যুদ্ধ একটি মৌলিক সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে– তেল নয়, পানিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার প্রধান নির্ধারক। সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সম্পদ কিছুই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না, যদি পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই পানি নির্ভরতার কাঠামোকে আরও স্থিতিশীল, বিকেন্দ্রীভূত এবং সুরক্ষিত করে তোলা।
কারণ এই অঞ্চলে উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে বিশাল কাঠামো গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি একটাই– পানি। আর সেই ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়তে সময় লাগবে না।
(দ্য ক্রেডেল অবলম্বনে)