Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করছে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই যুদ্ধ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর সমঝোতাকে আরও হুমকির মুখে ফেলেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে চীনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় চীনের সঙ্গে বহুল প্রতীক্ষিত শীর্ষ বৈঠকটি এখন স্থগিত করার দিকে এগোচ্ছে।

স্থানীয় সময় সোমবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তিনি চলতি মাসের শেষে বেইজিং সফর স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এর ঠিক একদিন আগে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ মোকাবিলায় চীন যদি যুদ্ধজাহাজ না পাঠায়, তবে বৈঠক বিলম্বিত হতে পারে। এই অবরোধের ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “আমি যেতে চাই, কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখানে থাকতে চাই। তার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো।”

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রতিক্রিয়ায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, সম্পর্কটি যতটা উষ্ণ বলে দাবি করছেন ট্রাম্প, বাস্তবে ততটা নয়। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানে চীনা কর্মকর্তারা শীতল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

সোমবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান শুধু বলেন, তার দেশ ‘সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে চীনে ট্রাম্পের এই দাবিকে সরাসরি উপহাসও করা হয়েছে।

একজন প্রভাবশালী চীনা ব্লগার মন্তব্য করেন, এই অনুরোধ এতটাই অযৌক্তিক যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেন ইরানকেই মার্কিন জাহাজ পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, “এটা কি সত্যিই ‘দায়িত্ব ভাগাভাগি’, নাকি এমন এক যুদ্ধের ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া, যা ওয়াশিংটন শুরু করেছে কিন্তু শেষ করতে পারছে না?” অন্যান্য চীনা গণমাধ্যমও জানায়, অন্য দেশগুলোও ট্রাম্পের আহ্বানে নিষ্ক্রিয়ই থেকেছে।

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বেইজিংয়ের জন্য চীনা নৌবাহিনী ও জনবল ঝুঁকিতে ফেলা বা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো তেমন আগ্রহই নেই।

ইরান জানিয়েছে, তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করছে এবং চীনে তেল বহনকারী জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হতে দিচ্ছে।

সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিং লং বলেন, “এটি বোঝা কঠিন কোনো বিষয় নয়। ট্রাম্প আসুন বা না-ই আসুন, চীন কোনোভাবেই সুরক্ষামূলক (এসকর্ট) অভিযানে অংশ নিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না।”

তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাঠানোর মানে হলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যোগ দেওয়া-যা চীন করতে চায় না।

তাছাড়া চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিযানে অংশ নেওয়া মানে হবে ওয়াশিংটনের অধীনতা স্বীকার করা।

মার্কাটর ইনস্টিটিউট ফর চীনের বিশ্লেষক ক্লাউস সুং বলেন, “বেইজিং মনে করে যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, চীনের সমস্যা নয়। ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিলে মনে হবে চীন তার নির্দেশ অনুসরণ করছে।”

তবে একেবারেই সাড়া না দেওয়াও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক। বেইজিং আশা করছিল এই শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমানো যাবে।

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, চীন চায় যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের ওপর সমর্থন কমাক, প্রযুক্তি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করুক এবং গত বছর দীর্ঘ বাণিজ্যযুদ্ধের পর যে শুল্ক বিরতি হয়েছিল তা আরও বাড়ানো হোক।

এদিকে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তেলসহ বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগেই তেল মজুতও করেছে।

তবুও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয় দেশটি। চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই এই জলপথ দিয়ে আসে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানিয়েছে, খুব কম সংখ্যক চীনা জাহাজই এখন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করছে। সামুদ্রিক তথ্য প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত নয়টি চীনা জাহাজ উপসাগরীয় এলাকায় আটকে ছিল।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের চীন কর্মসূচির পরিচালক ইয়ুন সুন বলেন, “প্রণালীটি পুনরায় খুলে গেলে সবাই উপকৃত হবে।”

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

তার মতে, বেইজিং হয়তো মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে পারে অথবা নীরবে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে প্রণালীটি আবার খুলে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, প্রণালী পুনরায় চালুর জন্য আরও সক্রিয় ভূমিকা নিলে বেইজিং ওয়াশিংটনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে সদিচ্ছা তৈরি করতে পারবে, একটি দায়িত্বশীল পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করতে পারবে। সেই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অংশীদারদেরও সহায়তা করতে পারবে।

তবে একতরফাভাবে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা চীনের পক্ষে সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন ইয়ুন সুন। তার মতে, বেইজিং সম্ভবত ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে উৎসাহিত করবে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প ও সিয়ের মধ্যে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক বিলম্বিত হওয়াও চীনের স্বার্থে যেতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে, যা চীনের জন্য দরকষাকষির সুযোগ বাড়াতে পারে।

ক্লাউস বলেন, “বেইজিং ও ওয়াশিংটন উভয়েরই এই বৈঠক নিয়ে প্রত্যাশা রয়েছে, তবে হয়তো ট্রাম্পেরই এই বৈঠক বেশি প্রয়োজন। তিনি দেখাতে চান যে, তিনি একটি সমঝোতা করতে সক্ষম।”

সম্পর্কিত