২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ হয়। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুথানের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবি নিয়ে। সেই আন্দোলনের সময় ফারুক আহমেদ শিপন প্রতিদিনই আন্দোলনে গেছেন। আর এই বিক্ষোভ একসময়ে বিপ্লবে রুপ নেয়। শিপনের দেখা সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে শাসন করা শেখ হাসিনার পতন হয় এই বিপ্লবে। বাংলাদেশের তরুণদের এই বিস্ময়কর সাফল্য নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কারের মতো দেশগুলোর তরুণদের অনুরূপ প্রতিবাদ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
কিন্তু এখন, সেই জেন জি বিপ্লবের পর বাংলাদেশ যখন প্রথম জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন শিপন হতাশ। গত বছর স্নাতক শেষ করার পর থেকেই কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তাই নতুন নেতারা যে তরুণ প্রজন্মের অনেকের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন–সেই বিষয়ে আশা রাখতে পারছেন না শিপন।
তিনি বলেন “আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি চাকরি। আমার যদি টাকা থাকে, তবে আমি অনেক কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি। কিন্তু আমার যদি টাকা না থাকে, তবে খাব কী? কাপড় কিনব কীভাবে? থাকব কোথায়?”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শিপনের এই হতাশা বাংলাদেশের তরুণ বিক্ষোভকারীদের এক ব্যাপক আত্মোপলব্ধির প্রতিফলন। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করলে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। লাখ লাখ স্নাতকধারী এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন।
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকদের মতে, তারা দৃশ্যমান ফলাফল খুব কমই দিতে পেরেছে। বিশেষ করে, যে ছাত্রনেতারা শুরুতে নতুন সরকারে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ গঠন করেছিলেন, তারা সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণী হতাশ।
শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে নিষিদ্ধ করা, জনমত জরিপগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। এদিকে, ছাত্রনেতাদের গঠিত এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করেছে, যা অনেক শিক্ষার্থীকে শঙ্কিত করেছে। তারা দলটির রক্ষণশীল ধর্মীয় আদর্শ, বিশেষ করে নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তিত।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা, এমনকি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে কলঙ্কিত করেছে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু সংখ্যালঘু রয়েছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে ‘ভারতের সমর্থন’ পেয়ে আসছে। ২০২৪ সালের বিক্ষোভের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে, যার একটি কারণ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্বাসনে থাকা।
গত ডিসেম্বরে, ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত এক বিশিষ্ট ছাত্র কর্মীকে বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পৃথক একটি ঘটনায়, একই মাসে এক হিন্দু কারখানার শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সরকার পরিবর্তনের আগেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসছিল। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলা হচ্ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা দুর্নীতি, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সতর্ক হয়ে পড়েছিলেন। গত এক দশক ধরে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির, অন্যদিকে গত চার বছর ধরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। শিল্প সম্প্রসারণের প্রধান সূচক-মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিতে প্রণোদনা কমিয়ে দেওয়ায় ব্যবসার অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
ঢাকার থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচিত সরকার ছাড়া এই অনিশ্চিত সময়ে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী আসবে না।”
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প দীর্ঘকাল ধরে প্রশংসিত ছিল। তখন মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি এবং গড় আয়ু ও নারী সাক্ষরতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল। এর পেছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল স্বল্পমূল্যের পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের উত্থান।
ফাইল ছবি
কিন্তু কৃষির পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কর্মসংস্থান ৪১ লাখ থাকলেও গত বছর তা কমে ৩৭ লাখে নেমে এসেছে।
অটোমেশন এতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। ফজলে শামীম এহসান তার দুটি পোশাক কারখানা ও একটি টেক্সটাইলে সুতা ছাঁটাই এবং উৎপাদনের বাধা শনাক্ত করার মতো কাজগুলো মেশিনের মাধ্যমে করায় তার কর্মীবাহিনী এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে প্রায় ৩,৭০০-এ নামিয়ে এনেছেন। সম্প্রতি তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ডিজাইন সফটওয়্যার কিনেছেন, যার ফলে এখন দুজন ডিজাইনার দিয়েই আগের মতো এক ডজন কর্মীর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থান আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ লাখ কমেছে। ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার তারেক রহমান জানিয়েছেন, তার দল বিএনপি ফুটওয়্যার ও ফার্মাসিউটিক্যালের মতো খাতগুলো সম্প্রসারণের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি প্লাম্বিং ও কার্পেন্ট্রির মতো পেশায় কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেবে।
এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। যেহেতু দেশটিতে স্বল্প শিক্ষিতদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকার থাকার হার বেশি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখান থেকে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, গ্র্যাজুয়েটদের অনেকেরই কোনো ‘প্র্যাক্টিকাল’ দক্ষতা নেই।
ঢাকার একজন পোশাক রপ্তানিকারক আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, “আমাদের ইতিহাস বিভাগের এত শিক্ষার্থীর প্রয়োজন নেই। এটি কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”
তিনি জানান, তার চারটি কারখানা এবং তিনটি টেক্সটাইল মিলে যেখানে এইচএন্ডএম এবং আরমানি এক্সচেঞ্জের মতো গ্রাহকদের জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের খুব কমই নিয়োগ দেন। তিনি এমন কর্মীদের পছন্দ করেন, যারা কারিগরি বিভাগে পড়েছেন এবং কারখানার ফ্লোরে কাজ করতে আগ্রহী।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ- প্রায় ৯ লাখ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ শতাংশ। এর বিপরীতে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১.৩ শতাংশ।
শিপনের কথায় ফেরা যাক। গত বছর ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর থেকে শিপন কাজ খোঁজার জন্য সংগ্রাম করছেন। স্কুল, ব্যাংক এবং গ্রামীণ বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করেও তিনি সফল হননি। ইংরেজি পড়িয়ে তিনি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার আয় করেন। তিনি যাদেরকে পড়ান তারাও সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখে। সরকারি চাকরির লাখো প্রতিযোগীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি পদ এবং মর্যাদাপূর্ণ পদের জন্য কঠিন পরীক্ষা পার করতে হয়।
তার আয়ের অর্ধেকই ব্যয় হয় মায়ের দেখাশোনায়। এ ছাড়া রয়েছে ঘরভাড়া আর ওষুধের খরচ। শিপনের বাবা তার ১৫ বছর বয়সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। আর তখন থেকেই শিপন সংসারের হাল ধরেন।
চাকরির কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে রাজপথে নামেন শিপন। তার ভাষ্যমতে, এই পদ্ধতি ছিল শুধুমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধার্থে তৈরি।
কিন্তু একপর্যায়ে সিপনের সহপাঠী আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের পুরো চিত্রপট বদলে দেয়। এই ঘটনা চাকরিকেন্দ্রিক আন্দোলনকে বাংলাদেশে আরও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে রূপান্তর করে। রংপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলন বেগবান হয়।
বর্তমানে শিপন ভয় পাচ্ছেন, সাঈদের মতো আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ হয়তো বৃথা যেতে বসেছে। সাঈদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এই বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক মানুষই এখন পর্যন্ত স্থায়ী চাকরি পেয়েছেন।
আবু সাঈদের মামাতো ভাই রুহুল আমিন মাত্র ১৪ হাজারে একটি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, যা রংপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ পরিষ্কার করার সরকারি কর্মচারীর বেতনের চেয়েও কম। রুহুল আমিন বলেন, “বাংলাদেশে সরকারি চাকরি মানেই আলাদা মর্যাদা, এমনকি তা নিম্নপদ হলেও। এখানে ভালো বেতন এবং অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।”
শিপন জানান, তিনি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার আশা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। তার স্বপ্ন দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে সুইডেন বা সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমানো। তার অনেক বন্ধুও বিদেশে চলে যেতে চাচ্ছেন।
শিপন বলেন, “যখন পেছনের দিনগুলোর কথা ভাবি, তখন হতাশ লাগে। শুধু শেখ হাসিনার পরিবর্তন হয়েছে। বাকি সবকিছু আগের মতোই রয়ে গেছে। একজন মানুষের পরিবর্তনই যদি বিপ্লবের একমাত্র ফল হয়, তাহলে সেই বিপ্লবের কোনো অর্থ নেই।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ হয়। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুথানের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবি নিয়ে। সেই আন্দোলনের সময় ফারুক আহমেদ শিপন প্রতিদিনই আন্দোলনে গেছেন। আর এই বিক্ষোভ একসময়ে বিপ্লবে রুপ নেয়। শিপনের দেখা সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে শাসন করা শেখ হাসিনার পতন হয় এই বিপ্লবে। বাংলাদেশের তরুণদের এই বিস্ময়কর সাফল্য নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কারের মতো দেশগুলোর তরুণদের অনুরূপ প্রতিবাদ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
কিন্তু এখন, সেই জেন জি বিপ্লবের পর বাংলাদেশ যখন প্রথম জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন শিপন হতাশ। গত বছর স্নাতক শেষ করার পর থেকেই কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তাই নতুন নেতারা যে তরুণ প্রজন্মের অনেকের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন–সেই বিষয়ে আশা রাখতে পারছেন না শিপন।
তিনি বলেন “আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি চাকরি। আমার যদি টাকা থাকে, তবে আমি অনেক কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি। কিন্তু আমার যদি টাকা না থাকে, তবে খাব কী? কাপড় কিনব কীভাবে? থাকব কোথায়?”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শিপনের এই হতাশা বাংলাদেশের তরুণ বিক্ষোভকারীদের এক ব্যাপক আত্মোপলব্ধির প্রতিফলন। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করলে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। লাখ লাখ স্নাতকধারী এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন।
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকদের মতে, তারা দৃশ্যমান ফলাফল খুব কমই দিতে পেরেছে। বিশেষ করে, যে ছাত্রনেতারা শুরুতে নতুন সরকারে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ গঠন করেছিলেন, তারা সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণী হতাশ।
শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে নিষিদ্ধ করা, জনমত জরিপগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। এদিকে, ছাত্রনেতাদের গঠিত এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করেছে, যা অনেক শিক্ষার্থীকে শঙ্কিত করেছে। তারা দলটির রক্ষণশীল ধর্মীয় আদর্শ, বিশেষ করে নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তিত।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা, এমনকি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে কলঙ্কিত করেছে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু সংখ্যালঘু রয়েছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে ‘ভারতের সমর্থন’ পেয়ে আসছে। ২০২৪ সালের বিক্ষোভের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে, যার একটি কারণ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্বাসনে থাকা।
গত ডিসেম্বরে, ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত এক বিশিষ্ট ছাত্র কর্মীকে বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পৃথক একটি ঘটনায়, একই মাসে এক হিন্দু কারখানার শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সরকার পরিবর্তনের আগেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসছিল। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলা হচ্ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা দুর্নীতি, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সতর্ক হয়ে পড়েছিলেন। গত এক দশক ধরে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির, অন্যদিকে গত চার বছর ধরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। শিল্প সম্প্রসারণের প্রধান সূচক-মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিতে প্রণোদনা কমিয়ে দেওয়ায় ব্যবসার অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
ঢাকার থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচিত সরকার ছাড়া এই অনিশ্চিত সময়ে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী আসবে না।”
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প দীর্ঘকাল ধরে প্রশংসিত ছিল। তখন মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি এবং গড় আয়ু ও নারী সাক্ষরতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল। এর পেছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল স্বল্পমূল্যের পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের উত্থান।
ফাইল ছবি
কিন্তু কৃষির পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কর্মসংস্থান ৪১ লাখ থাকলেও গত বছর তা কমে ৩৭ লাখে নেমে এসেছে।
অটোমেশন এতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। ফজলে শামীম এহসান তার দুটি পোশাক কারখানা ও একটি টেক্সটাইলে সুতা ছাঁটাই এবং উৎপাদনের বাধা শনাক্ত করার মতো কাজগুলো মেশিনের মাধ্যমে করায় তার কর্মীবাহিনী এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে প্রায় ৩,৭০০-এ নামিয়ে এনেছেন। সম্প্রতি তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ডিজাইন সফটওয়্যার কিনেছেন, যার ফলে এখন দুজন ডিজাইনার দিয়েই আগের মতো এক ডজন কর্মীর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থান আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ লাখ কমেছে। ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার তারেক রহমান জানিয়েছেন, তার দল বিএনপি ফুটওয়্যার ও ফার্মাসিউটিক্যালের মতো খাতগুলো সম্প্রসারণের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি প্লাম্বিং ও কার্পেন্ট্রির মতো পেশায় কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেবে।
এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। যেহেতু দেশটিতে স্বল্প শিক্ষিতদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকার থাকার হার বেশি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখান থেকে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, গ্র্যাজুয়েটদের অনেকেরই কোনো ‘প্র্যাক্টিকাল’ দক্ষতা নেই।
ঢাকার একজন পোশাক রপ্তানিকারক আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, “আমাদের ইতিহাস বিভাগের এত শিক্ষার্থীর প্রয়োজন নেই। এটি কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”
তিনি জানান, তার চারটি কারখানা এবং তিনটি টেক্সটাইল মিলে যেখানে এইচএন্ডএম এবং আরমানি এক্সচেঞ্জের মতো গ্রাহকদের জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের খুব কমই নিয়োগ দেন। তিনি এমন কর্মীদের পছন্দ করেন, যারা কারিগরি বিভাগে পড়েছেন এবং কারখানার ফ্লোরে কাজ করতে আগ্রহী।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ- প্রায় ৯ লাখ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ শতাংশ। এর বিপরীতে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১.৩ শতাংশ।
শিপনের কথায় ফেরা যাক। গত বছর ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর থেকে শিপন কাজ খোঁজার জন্য সংগ্রাম করছেন। স্কুল, ব্যাংক এবং গ্রামীণ বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করেও তিনি সফল হননি। ইংরেজি পড়িয়ে তিনি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার আয় করেন। তিনি যাদেরকে পড়ান তারাও সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখে। সরকারি চাকরির লাখো প্রতিযোগীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি পদ এবং মর্যাদাপূর্ণ পদের জন্য কঠিন পরীক্ষা পার করতে হয়।
তার আয়ের অর্ধেকই ব্যয় হয় মায়ের দেখাশোনায়। এ ছাড়া রয়েছে ঘরভাড়া আর ওষুধের খরচ। শিপনের বাবা তার ১৫ বছর বয়সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। আর তখন থেকেই শিপন সংসারের হাল ধরেন।
চাকরির কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে রাজপথে নামেন শিপন। তার ভাষ্যমতে, এই পদ্ধতি ছিল শুধুমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধার্থে তৈরি।
কিন্তু একপর্যায়ে সিপনের সহপাঠী আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের পুরো চিত্রপট বদলে দেয়। এই ঘটনা চাকরিকেন্দ্রিক আন্দোলনকে বাংলাদেশে আরও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে রূপান্তর করে। রংপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলন বেগবান হয়।
বর্তমানে শিপন ভয় পাচ্ছেন, সাঈদের মতো আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ হয়তো বৃথা যেতে বসেছে। সাঈদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এই বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক মানুষই এখন পর্যন্ত স্থায়ী চাকরি পেয়েছেন।
আবু সাঈদের মামাতো ভাই রুহুল আমিন মাত্র ১৪ হাজারে একটি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, যা রংপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ পরিষ্কার করার সরকারি কর্মচারীর বেতনের চেয়েও কম। রুহুল আমিন বলেন, “বাংলাদেশে সরকারি চাকরি মানেই আলাদা মর্যাদা, এমনকি তা নিম্নপদ হলেও। এখানে ভালো বেতন এবং অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।”
শিপন জানান, তিনি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার আশা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। তার স্বপ্ন দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে সুইডেন বা সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমানো। তার অনেক বন্ধুও বিদেশে চলে যেতে চাচ্ছেন।
শিপন বলেন, “যখন পেছনের দিনগুলোর কথা ভাবি, তখন হতাশ লাগে। শুধু শেখ হাসিনার পরিবর্তন হয়েছে। বাকি সবকিছু আগের মতোই রয়ে গেছে। একজন মানুষের পরিবর্তনই যদি বিপ্লবের একমাত্র ফল হয়, তাহলে সেই বিপ্লবের কোনো অর্থ নেই।”