চরচা ডেস্ক

জানুয়ারিতে ভারত যখন আমেরিকার সাথে শুল্ক কমানোর চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন তারা হঠাৎ করেই রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে ভারত এই ‘কঠিন আপস’ করতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এর মাত্র দুই মাস পরেই ভারত ও রাশিয়ার জ্বালানি সম্পর্ক আবার নিবিড় হতে দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়া থেকে সরাসরি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দেশ। ভারত যদি এই চুক্তিতে রাজি হয়, তবে এতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই এই গোপন আলোচনার তথ্য সামনে এলো। গত ১৯ মার্চ দিল্লিতে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী পাভেল সোরোকিন এবং ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির মধ্যে এক বৈঠক হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেখানেই সরাসরি এলএনজি আমদানির বিষয়ে একটি ‘মৌখিক সমঝোতা’ হয়েছে।
বৈঠকে দুই পক্ষ ভারতমুখী রুশ তেলের পরিমাণ আরও বাড়াতে একমত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এক মাসের মধ্যে এই আমদানির পরিমাণ জানুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ভারতের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সস্তায় রুশ তেল কেনায় ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে, যা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ভারতের টানাপোড়েন তৈরি হয়। গত বছর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এই দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তেল কিনেছে, যা যুদ্ধের মাঝেও রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, ভারত ইতিমধ্যেই তার জ্বালানি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রুশ এলএনজি কেনা শুরু করার প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এই কেনাকাটায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কোনো ছাড় পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে দিল্লি ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ করেছে বলেও জানা গেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র বা জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত বেশ কয়েকটি দেশের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে। এছাড়া ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা রাশিয়া থেকে এলপিজি বা রান্নার গ্যাস কিনছে, যার ওপর কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেই।
এই আলোচনার বিষয়ে রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, আমেরিকাও নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। হোয়াইট হাউস বা দিল্লিতে অবস্থিত ইউক্রেনীয় দূতাবাসও এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মস্কোতে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রা বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ভারত সেই পথটিই বেছে নিয়েছে, যা তার নিজের দেশের স্বার্থে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত বন্ধুত্বের খাতিরে ভারতের উচিত এখন এই চুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা সুযোগ দাবি করা।
গত কয়েক দশক ধরে চীনকে মোকাবিলা করতে আমেরিকা ভারতকে কাছে টানার চেষ্টা করলেও, গত এক বছরে ওয়াশিংটনের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ভারতকে দুবার বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়েছে।
এতদিন রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনে আসলেও, গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করলে ভারত হঠাৎ করেই রুশ তেল কেনা কমিয়ে দেয়। যদিও পরবর্তীতে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে, ট্রাম্পের ওই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি আইনত সঠিক ছিল না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েলের ও আমেরিকার হামলার পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের জ্বালানি সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই এই সরু পথ দিয়ে আসে।
এরপর থেকে ভারতের অনেক পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে এবং অনেক রেস্তোরাঁয় রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। রাশিয়ার জ্বালানি এশিয়ায় আসার পথে পারস্য উপসাগর ব্যবহার করতে হয় না বলে বর্তমানে এই অঞ্চলে রুশ জ্বালানির চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
৫ মার্চ আমেরিকা যখন ভারতকে নিষিদ্ধ রুশ তেল কেনার সাময়িক অনুমতি দেয়, তার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ভারতের সরকারি শোধনাগারগুলো বাড়তি তেল কেনার অর্ডার দেওয়া শুরু করে। তেলের দাম বাড়তে থাকায় পরবর্তীতে ওয়াশিংটন এই বিধিনিষেধ আরও শিথিল করতে বাধ্য হয়।
রয়টার্সের হাতে আসা একটি সরকারি নথি থেকে জানা গেছে, ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক এখন আফসোস করছেন। তাদের মতে, আমেরিকাকে খুশি করতে গিয়ে ভারত সস্তায় রুশ তেল কেনা কমিয়ে দিয়ে ভুল করেছে। ২০ মার্চ মন্ত্রিসভার জন্য তৈরি এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত যদি আগে থেকে সস্তায় রুশ তেল কেনা না কমাতো, তবে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া অনেক সহজ হতো।
ওই রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আসা যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে ভারতের অর্থনীতি বড় বিপদে পড়বে। এতে করে জিনিসের দাম বাড়বে, অর্থের মান কমে যাবে এবং বিদেশের কাছে ঋণের বোঝা আরও ভারী হবে। এছাড়া দেশের রপ্তানি ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং পাইকারি বাজারে পণ্যের দামও অনেকটা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সাথে ভারতের বেশ ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া এখন সেই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চাইছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, নতুন করে এলএনজি চুক্তি হলে তার শর্তগুলো ২০১২ সালের মতো ভারতের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক হবে না। কারণ, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি, তাই বিক্রেতারাই এখন শর্ত নির্ধারণ করছে। ২০১২ সালে ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘গেইল’ রাশিয়ার ‘গ্যাজপ্রম’-এর সাথে ২০ বছরের একটি লাভজনক চুক্তি করেছিল, যা এখন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এই মাসেই রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘রোসেটি’-র কর্মকর্তারা একটি সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লি সফর করেন। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তারা ভারতের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে মিলে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
যদি এই চুক্তিটি সফল হয়, তবে ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন খাতে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করবে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলকভো বিমানবন্দরের কর্মকর্তা তিমোফেই তিতারেনকো রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা ভারতের সাথে সরাসরি বিমান চলাচল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। এই লক্ষ্যে তিনি ইতিমধ্যেই ভারতের বেশ কিছু বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক সম্মেলনে জানান, বর্তমানে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ব্যবসাই রুপি এবং রুবলের মাধ্যমে হচ্ছে। তিনি এই সম্পর্ককে একটি ‘আদর্শ বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমেই এমন দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
রাশিয়ার ‘সেরব্যাঙ্ক’-এর ভারতীয় শাখার এক কর্মকর্তা জানান, রুপি-রুবলের মাধ্যমে এখন লেনদেন অনেক দ্রুত হচ্ছে। বর্তমানে ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত লেনদেন মাত্র এক দিনেই সম্পন্ন করা সম্ভব, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দ্রুত।

জানুয়ারিতে ভারত যখন আমেরিকার সাথে শুল্ক কমানোর চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন তারা হঠাৎ করেই রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে ভারত এই ‘কঠিন আপস’ করতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এর মাত্র দুই মাস পরেই ভারত ও রাশিয়ার জ্বালানি সম্পর্ক আবার নিবিড় হতে দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়া থেকে সরাসরি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দেশ। ভারত যদি এই চুক্তিতে রাজি হয়, তবে এতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই এই গোপন আলোচনার তথ্য সামনে এলো। গত ১৯ মার্চ দিল্লিতে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী পাভেল সোরোকিন এবং ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির মধ্যে এক বৈঠক হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেখানেই সরাসরি এলএনজি আমদানির বিষয়ে একটি ‘মৌখিক সমঝোতা’ হয়েছে।
বৈঠকে দুই পক্ষ ভারতমুখী রুশ তেলের পরিমাণ আরও বাড়াতে একমত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এক মাসের মধ্যে এই আমদানির পরিমাণ জানুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ভারতের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সস্তায় রুশ তেল কেনায় ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে, যা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ভারতের টানাপোড়েন তৈরি হয়। গত বছর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এই দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তেল কিনেছে, যা যুদ্ধের মাঝেও রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, ভারত ইতিমধ্যেই তার জ্বালানি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রুশ এলএনজি কেনা শুরু করার প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এই কেনাকাটায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কোনো ছাড় পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে দিল্লি ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ করেছে বলেও জানা গেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র বা জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত বেশ কয়েকটি দেশের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে। এছাড়া ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা রাশিয়া থেকে এলপিজি বা রান্নার গ্যাস কিনছে, যার ওপর কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেই।
এই আলোচনার বিষয়ে রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, আমেরিকাও নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। হোয়াইট হাউস বা দিল্লিতে অবস্থিত ইউক্রেনীয় দূতাবাসও এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মস্কোতে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রা বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ভারত সেই পথটিই বেছে নিয়েছে, যা তার নিজের দেশের স্বার্থে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত বন্ধুত্বের খাতিরে ভারতের উচিত এখন এই চুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা সুযোগ দাবি করা।
গত কয়েক দশক ধরে চীনকে মোকাবিলা করতে আমেরিকা ভারতকে কাছে টানার চেষ্টা করলেও, গত এক বছরে ওয়াশিংটনের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ভারতকে দুবার বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়েছে।
এতদিন রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনে আসলেও, গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করলে ভারত হঠাৎ করেই রুশ তেল কেনা কমিয়ে দেয়। যদিও পরবর্তীতে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে, ট্রাম্পের ওই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি আইনত সঠিক ছিল না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েলের ও আমেরিকার হামলার পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের জ্বালানি সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই এই সরু পথ দিয়ে আসে।
এরপর থেকে ভারতের অনেক পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে এবং অনেক রেস্তোরাঁয় রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। রাশিয়ার জ্বালানি এশিয়ায় আসার পথে পারস্য উপসাগর ব্যবহার করতে হয় না বলে বর্তমানে এই অঞ্চলে রুশ জ্বালানির চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
৫ মার্চ আমেরিকা যখন ভারতকে নিষিদ্ধ রুশ তেল কেনার সাময়িক অনুমতি দেয়, তার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ভারতের সরকারি শোধনাগারগুলো বাড়তি তেল কেনার অর্ডার দেওয়া শুরু করে। তেলের দাম বাড়তে থাকায় পরবর্তীতে ওয়াশিংটন এই বিধিনিষেধ আরও শিথিল করতে বাধ্য হয়।
রয়টার্সের হাতে আসা একটি সরকারি নথি থেকে জানা গেছে, ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক এখন আফসোস করছেন। তাদের মতে, আমেরিকাকে খুশি করতে গিয়ে ভারত সস্তায় রুশ তেল কেনা কমিয়ে দিয়ে ভুল করেছে। ২০ মার্চ মন্ত্রিসভার জন্য তৈরি এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত যদি আগে থেকে সস্তায় রুশ তেল কেনা না কমাতো, তবে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া অনেক সহজ হতো।
ওই রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আসা যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে ভারতের অর্থনীতি বড় বিপদে পড়বে। এতে করে জিনিসের দাম বাড়বে, অর্থের মান কমে যাবে এবং বিদেশের কাছে ঋণের বোঝা আরও ভারী হবে। এছাড়া দেশের রপ্তানি ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং পাইকারি বাজারে পণ্যের দামও অনেকটা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সাথে ভারতের বেশ ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া এখন সেই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চাইছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, নতুন করে এলএনজি চুক্তি হলে তার শর্তগুলো ২০১২ সালের মতো ভারতের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক হবে না। কারণ, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি, তাই বিক্রেতারাই এখন শর্ত নির্ধারণ করছে। ২০১২ সালে ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘গেইল’ রাশিয়ার ‘গ্যাজপ্রম’-এর সাথে ২০ বছরের একটি লাভজনক চুক্তি করেছিল, যা এখন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এই মাসেই রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘রোসেটি’-র কর্মকর্তারা একটি সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লি সফর করেন। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তারা ভারতের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে মিলে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
যদি এই চুক্তিটি সফল হয়, তবে ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন খাতে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করবে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলকভো বিমানবন্দরের কর্মকর্তা তিমোফেই তিতারেনকো রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা ভারতের সাথে সরাসরি বিমান চলাচল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। এই লক্ষ্যে তিনি ইতিমধ্যেই ভারতের বেশ কিছু বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক সম্মেলনে জানান, বর্তমানে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ব্যবসাই রুপি এবং রুবলের মাধ্যমে হচ্ছে। তিনি এই সম্পর্ককে একটি ‘আদর্শ বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমেই এমন দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
রাশিয়ার ‘সেরব্যাঙ্ক’-এর ভারতীয় শাখার এক কর্মকর্তা জানান, রুপি-রুবলের মাধ্যমে এখন লেনদেন অনেক দ্রুত হচ্ছে। বর্তমানে ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত লেনদেন মাত্র এক দিনেই সম্পন্ন করা সম্ভব, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দ্রুত।