জাতিসংঘ এখনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে ৮০ বছরে পা দিয়েছে জাতিসংঘ। পৌনে শতাব্দীর বেশি বয়স পার করলেও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই সংস্থাটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা যেমন: বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে একটি সার্বভৌম দেশে ট্রাম্পীয় ধাঁচের সামরিক পদক্ষেপ, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসন, এবং গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়–সবই জাতিসংঘের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি জাতিসংঘ তার প্রথম ও প্রধান অঙ্গীকার-আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা–পালন করতে না পারে, তাহলে এই সংস্থার আদৌ কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের আচরণ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন যতই গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হোক না কেন, ভেটো ক্ষমতা কোনো কাজ করে না। এই কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে আছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ এই ক্ষমতা। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী ভেটো ব্যবহারের ওপর কার্যকর কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়নি। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগও নেই।
এখানেই জাতিসংঘ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইচ্ছাকৃত নকশাগত ত্রুটি নিহিত। সনদটি স্থায়ী পাঁচ সদস্যকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। এর ফলে কোনো শুভ উদ্যোগ যা হয়তো একটা দেশের স্বার্থবিরোধী, সেখানে ভেটো দেওয়ার মাধ্যমে তা আর ফলপ্রসূ হয় না।
জাতিসংঘ সনদের ১০৮ ও ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কার করা সম্ভব। কিন্তু এটা তাত্ত্বিকভাবে, কার্যত তা অসম্ভব। একটি নতুন সনদের অধীনে জাতিসংঘকে বিলুপ্ত করে পুনর্গঠন করাই একমাত্র কাঠামোগত বিকল্প। তবে এর জন্য যে বৈশ্বিক সমষ্টিগত ঐক্য প্রয়োজন, বর্তমানে তা নেই। স্থায়ী পাঁচ সদস্যের এক বা একাধিক দেশ সম্ভবত এমন যেকোনো সংস্কার বা পুনর্গঠন ঠেকিয়ে দেবে, যাতে তাদের ভেটো ক্ষমতা না হারাতে হয়।
জাতিসংঘকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ দ্বিমুখী। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই জাতিসংঘের সমালোচনা করে মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য, আবার কর্তৃত্ববাদী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের মঞ্চ হিসেবে এটিকে ব্যবহার করে।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে পরিকল্পিতভাবে জাতিসংঘের বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ কাটছাঁট করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে ৮০ কোটি ডলার কমিয়ে দেওয়া, যা ইতোমধ্যেই কংগ্রেস থেকে অনুমোদন পেয়েছে। যদিও প্রশাসন হাইতি, লেবানন ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে পরিচালিত নির্দিষ্ট কিছু শান্তিরক্ষা মিশনে অর্থায়নে সম্মত হয়েছে। তবুও সামগ্রিক কাটছাঁটের ফলে জাতিসংঘ তাদের বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা বাহিনীতে লোকবল ২৫ শতাংশ কমাতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের আবশ্যিক চাঁদাও আটকে রেখেছে। ফলে অনুমান করা হচ্ছে যে জাতিসংঘের বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কাটছাঁট করবে। এর ফলে জাতিসংঘ এখন ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট হ্রাস এবং প্রায় ২০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছে।
মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে দুর্বল করে দিচ্ছেন– যা সংঘাত প্রশমন এবং অসংখ্য জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ তিনি আবার নিজেকে প্রকাশ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবুও জাতিসংঘের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক দেশগুলো একসঙ্গে কার্যকরভাবে মানবিক সহায়তা এগিয়ে নিতে কাজ করছে। গত দুই দশকে এই সংস্থায় চীনের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে ২২ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ২৬.২ শতাংশ অর্থ দিয়ে থাকে, সেখানে চীন এখন নিয়মিত বাজেটে ২০ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষায় ২৩.৮ শতাংশ অর্থ দিচ্ছে। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে শান্তিরক্ষা বাহিনীতে সর্বাধিক সেনা চীনই সরবরাহ করে। জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলোতে চীনের অর্থায়ন এখনো তুলনামূলকভাবে কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলে বেইজিং দ্রুতই এই অর্থায়ন বাড়াতে পারে।
জাতিসংঘকে এখন কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে হলে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন দরকার। এর মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্ষেত্রগুলোর ওপর মনোযোগ বাড়াতে হবে এবং মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেসব সংস্থা অপরিহার্য নয় সেগুলো বিলুপ্ত করা উচিত। জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডসহ অনেকে প্রস্তাব করেছেন, জাতিসংঘের সদরদপ্তর নিউইয়র্ক সিটি থেকে সরিয়ে অন্য কোনো শহরে নেওয়া উচিত। এতে ব্যয় কমবে এবং ওয়াশিংটন যেসব দেশকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে না সেসব দেশের প্রতিনিধিদের ভিসা প্রাপ্তির ঝুঁকিও দূর হবে। ট্রাম্পের বাজেট কাটছাঁটের জবাবে প্রতিটি দেশকে নিয়মিত বাজেটের বাইরে আরও বেশি সহায়তা প্রদান করা উচিত এবং বেসরকারি খাত থেকে সম্পদ ও দক্ষতা আহরণে জাতিসংঘকে সক্রিয় হতে চাপ দেওয়া উচিত। এসব পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে যে ট্রাম্পের বিরোধিতার কারণে জাতিসংঘ অকার্যকর হয়ে যাবে না।
এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বিরোধিতাকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে জাতিসংঘ দীর্ঘদিনের সংস্কার কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ওশান কনফারেন্স এবং স্পেনে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ‘ফাইন্যান্সিং ফর ডেভেলপমেন্ট’ সম্মেলন বয়কট করেছে। তবে জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছে। ওয়াশিংটনের অনুপস্থিতিতেও দেশগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ঋণ প্রদান এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আর্থিক চুক্তিসমূহ সফল হয়েছে।
(প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে)