কুমিল্লা-১১: বন্ধু বিএনপি এবার প্রতিপক্ষ, তাহেরের সামনে কঠিন লড়াই

গাজীউল হক সোহাগ
গাজীউল হক সোহাগ
কুমিল্লা-১১: বন্ধু বিএনপি এবার প্রতিপক্ষ, তাহেরের সামনে কঠিন লড়াই
জামায়াতের প্রার্থী ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা। ছবি: এআই দিয়ে বানানো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা দুজনই জয়ের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। তবে চৌদ্দগ্রামে বিএনপি ও জামায়াতের জয়-পরাজয়ে বড় নিয়ামক আওয়ামী লীগের ভোট।

বিএনপির প্রার্থীর দাবি, সুষ্ঠু নির্বাচনে ধানের শীষ ব্যালট বিপ্লব ঘটাবে। জামায়াতের প্রার্থী বলেছেন, “অতীতে আমি নির্বাচন করেছি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ ও সাবেক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে। কামরুল হুদা লোকাল নেতা, উপজেলা পর্যায়ের নেতা। তার সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে না।”

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে জয় পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা। তাদের ভোটের দিকে তাকিয়ে আছে বিএনপি ও জামায়াত।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল আটটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার হাইওয়ে ইন হোটেল থেকে পথে যেতে যেতে সড়ক বিভাজকে দেখা মেলে জামায়াতের প্রার্থী ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের ফেস্টুন। পদচারী সেতুর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদার ব্যানার। এই দুই প্রার্থী ছাড়া অন্য আরও পাঁচ প্রার্থীর তেমন একটা প্রচার নেই।

জগন্নাথদিঘি এলাকার তৃপ্তি হোটেল এলাকায় বাতিসা গ্রামের মো. গোলাম হোসেন বলেন, “চৌদ্দগ্রামে এবারের নির্বাচনটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত কার জেতার সম্ভাবনা আছে এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। দুই প্রার্থীই আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটের দিকে তাকিয়ে আছেন।”

মিয়াবাজারে কর্মজীবী ভোটার মোশারফ হোসেন বলেন, “চৌদ্দগ্রামে কামরুল হুদার নেতৃত্বে বিএনপিতে জাগরণ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ চৌদ্দগ্রামের আলকরা, গুনবতী ও জগন্নাথদিঘি ইউনিয়নে সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি জিতবে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভায় বিএনপি ও জামায়াতের ভোট প্রায় সমান সমান। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে আলকরা, গুনবতী ও জগন্নাথদিঘি ইউনিয়নে জামায়াতের প্রভাব বেশি। অতীতের সব নির্বাচনে জামায়াত এখানে প্রভাব তৈরি করে একচ্ছত্র ভোট করে। এই তিন ইউনিয়নে ভোটও বেশি। অন্যদিকে উত্তর চৌদ্দগ্রামের ইউনিয়নগুলোতে জামায়াতের ভোট অপেক্ষাকৃত কম। এই ইউনিয়নগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোট বেশি। এবার এখানে বিএনপির শক্তি ও সমর্থন বেড়েছে। এই ইউনিয়নগুলোর ভোটকে পুঁজি করে বিএনপি জনমত তৈরি করেছে।

আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “২৪-এর জুলাইয়ের পর বিএনপি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। নিরীহ লোককে মামলার আসামি করেছে। এটাও নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে।” সাবেক চেয়ারম্যানরা কয়েকজন ইতিমধ্যে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে ভিড়েছেন।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির মো. শাহজাহান বলেন, “ডা. তাহের এই মাঠের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। তিনি জয়ী হবেন।”

ডা. তাহেরের বাড়ি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরা গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংসদের জিএস ও শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।

বিএনপির মো. কামরুল হুদার বাড়ি চৌদ্দগ্রামের উজিরপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে। তিনি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ী। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন তিনি।

জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। ছবি: ফেসবুক
জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। ছবি: ফেসবুক

 একক নির্বাচনে জামায়াতের ভোট

কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজ দল থেকে এককভাবে নির্বাচন করে ভোট পান ২৫ হাজারের কিছু বেশি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনের ভোটের ফলাফলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে একবার বিজয়ী হয়েছেন ডা. তাহের। আরেকবার সম্মানজনক ভোট পেয়েছেন।

চৌদ্দগ্রামের বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার দক্ষিণ এলাকার তিনটি ইউনিয়ন আলকরা, গুনবতী ও জগন্নাথদিঘি ইউনিয়নে জামায়াতের ভোট ও প্রভাব আছে। উপজেলা ও পৌরসভার আর কোনো ইউনিয়নে এককভাবে জামায়াতের প্রভাব নেই। বছরের পর বছর বিএনপির নেতা-কর্মীরা জোটের কারণে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে ভোট দিতেন। ফলে ডা. তাহের নির্বাচনে একবার জয়ী হয়েছেন। এবার বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করছে। মো. কামরুল হুদার মতো পরিচ্ছন্ন প্রার্থী পেয়েছে।

১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী  ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ভোট পেয়েছিলেন ২৫ হাজার ৪১৮। ১৯৯৬ সালে পেয়েছিলেন ২৫ হাজার ৯৮৪। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের হয়ে তিনি পান  ১ লাখ ৮ হাজার ৪০৭ ভোট। ২০০৮ সালে চারদলীয় জোট থেকে ৭৭ হাজার ৯২৪ ভোট। ২০১৮ সালের ভোটে ডা. তাহের পান এক হাজার ১৩৩ ভোট। ওই নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী কামাল উদ্দিন পেয়েছিলেন দুই হাজার ২৬৪ ভোট।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা -১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা বলছেন, “দক্ষিণ চৌদ্দগ্রামের তিনটি ইউনিয়নে জামায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। ওরাই সব করে। সেখানেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি জিতবে। কিন্তু পুরো উপজেলায় তাদের ওই অবস্থান নেই। একক নির্বাচন করে জামায়াত বেশি ভোট পায় না। বিএনপির সহযোগিতায় তারা পাস করে। এবার চৌদ্দগ্রামে ধানের শীষের ব্যালট বিপ্লব হবে। নির্বাচন এলে জামায়াত শিবিরের সব লোক এই আসনে চলে আসে।”

জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, কামরুল হুদা উপজেলা পর্যায়ের নেতা। এখানে কেন্দ্রীয় ও জেলার প্রভাবশালী নেতারা মন্ত্রী-এমপি হতেন। কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মুজিবুল হক রেলপথমন্ত্রী ছিলেন। হুইপ ছিলেন। এখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রার্থী। তিনি জিতবেন। চৌদ্দগ্রামের মানুষ জাতীয় নেতাদের ভোট দেবেন। আঞ্চলিক নেতাকে নয়।

তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা। ছবি: ফেসবুক
তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা। ছবি: ফেসবুক

অতীতে চৌদ্দগ্রামে বিএনপির ভোট

১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী আমান উদ্দিন আহমেদ আট হাজার ৪৫৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মালেক সমর্থিত আনোয়ার উল্লাহ জয়ী হন। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জামাল উদ্দিন ১০ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। ওই নির্বাচনে ইউপিপির প্রার্থী কাজী জাফর আহমেদ ও আওয়ামী লীগের মিজান সমর্থিত মনিরুল হক চৌধুরী পেয়েছিলেন দুই হাজার ৩৪৩ ভোট।

১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ আহম্মদ মজুমদার ভোট পেয়েছিলেন ৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপি চতুর্থ হয়। ১৯৯৬ সালে বিএনপির আ.সফুর পটু পান সাত হাজার ২৫৫ ভোট। এই নির্বাচনেও চতুর্থ হয় বিএনপি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুল হুদা বলেন, “তখন দল গোছানো ছিল না। জামায়াতের সঙ্গে ছিল। এখন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী।”

এ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা সাত। বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে আছেন-জাতীয় পার্টির মো. মাইন উদ্দিন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মো. মহিউদ্দিন শহিদ (হাতপাখা), গণফ্রন্টের মো. আলমগীর (মাছ), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মোহাম্মদ ইউসুফ (ছড়ি) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের আ ফ ম আব্দুর রহিম (ডাব)। এ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ২১ হাজার ৬৩২ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটার ১২ হাজার ৫৪১ জন। এ আসনে একটি পৌরসভা ও ১৩ টি ইউনিয়ন আছে।

গাজীউল হক সোহাগ: সম্পাদক, আমার শহর (কুমিল্লা)

সম্পর্কিত