Advertisement Banner

পথের পাঁচালীর যত ফাঁকি

পথের পাঁচালীর যত ফাঁকি
সত্যজিৎ রায়ের অমর কীর্তি ‘পথের পাঁচালী’

কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ করলেন সত্যজিৎ রায়। তারপর তো এই সিনেমা ইতিহাস গড়ল। এখনো এই সিনেমা নিয়ে আলোচনা ও পড়াশোনা হয়। ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে নতুন কিছু বলা বাকি নেই। হয়তো অনেকের জানা নেই—তাদের জন্য বলা যায় এই সিনেমার কয়েকটি ফাঁকি নিয়ে। হ্যাঁ, ‘পথের পাঁচালী’তে নিখুঁতভাবে একাধিকবার দর্শকদের ফাঁকি দিয়েছেন সত্যজিৎ। সিনেমা দেখে ফাঁকিগুলো ধরার উপায় নেই।

সিনেমাটি মুক্তির অনেক পর সত্যজিৎ নিজেই সেই ফাঁকিগুলোর কথা জানিয়েছিলেন। প্রথম ফাঁকিটি আছে অপু-দুর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্যে। রেললাইনের পাশেই কাশফুলে ভরা মাঠ। অপু দিদিকে ধাওয়া করতে করতে গ্রাম থেকে বেরিয়ে কাশবনে পৌঁছায়—এই পর্যন্ত প্রথম দিন ধারণ করা হয়। পরে সপ্তাহখানেক পর সেখানে গিয়ে দেখা গেল—কাশবন নেই। গরুর পাল সব কাশ খেয়ে ফেলেছে। তাই বাধ্য হয়ে বাকি দৃশ্য ধারণ করতে হয় পরের বছরের শরৎকালে। আমরা তো সিনেমায় একটি ট্রেনই দেখি। কিন্তু আসলে পুরো দৃশ্যে একটি নয়—ছিল তিনটি ট্রেন! সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একই দিক থেকে আসা তিনটি ট্রেনকে সিনেমায় দেখা যায়। ট্রেনে সত্যজিতের লোক থাকতেন; প্রতিবার শুটিং স্পটের কাছাকাছি এলেই বয়লারে কয়লা দেওয়া হতো—যাতে ধোঁয়া বের হয়।

অপু-দুর্গার প্রথম ট্রেন দেখার দৃশ্য
অপু-দুর্গার প্রথম ট্রেন দেখার দৃশ্য

আরেকটি ফাঁকি আছে অপু-দুর্গার পোষা কুকুর ভুলোকে নিয়ে। কুকুরটাকে গ্রাম থেকেই জোগাড় করা হয়েছিল। এক দৃশ্যে আমরা দেখি, সর্বজয়া অপুকে ভাত খাওয়াচ্ছে। দাওয়ায় বসে আছে ভুলো। অপুর হাতে তির-ধনুক, সে খেলতে যাবে। একসময় খাওয়া রেখেই দেয় ছুট। দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখা যায়, সর্বজয়া থালার বাকি ভাতটুকু ফেলে দেয়। সেই ভাতটুকু খায় ভুলো। দ্বিতীয় দৃশ্যটি একদিনে নেওয়া যায়নি। টাকার অভাবে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৬ মাস পর আবার শুটিং শুরু হলে জানা গেল ভুলো আর বেঁচে নেই। পরে সেই কুকুরের ভাত খাওয়ার দৃশ্যটি ভুলোর মতো দেখতে অন্য একটি কুকুরকে দিয়ে করানো হয়। অর্থাৎ, সিনেমায় কুকুর আসলে দুটি, আমরা জানি একটি!

চিনিবাস ময়রার কথা তো মনে আছে? ওই যে গ্রামে ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের মিষ্টান্ন বিক্রি করে। আমরা দেখি অপু-দুর্গার মিষ্টি কেনার সামর্থ্য নেই জেনে চিনিবাস মুখুজ্যে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। অপু-দুর্গাও তার পিছু নেয়। এ পর্যন্ত ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণের পর টাকার অভাবে শুটিং আবার বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক মাস পর শুটিং শুরু হলো ঠিকই—কিন্তু চিনিবাস ততদিনে বেঁচে নেই। কী বিপদ! উপায় নেই, চিনিবাসের মতো দেখতে একজনকে খুঁজে আনা হলো। দৃশ্যে প্রথমে দেখানো হয়, চিনিবাস বাঁশবন থেকে বের হচ্ছে। তারপরের শট, ক্যামেরার দিকে পিঠ করে সে মুখুজ্যেদের বাড়িতে ঢুকছে। তার চেহারা আর দেখানো হয়নি। ট্রেন ও কুকুরের মতো ময়রাও ডাবল, কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই! জাদুকরও আমাদের ফাঁকি দেয়, আমরা কি ধরতে পারি? আর জাদুকর যদি হয় সত্যজিৎ রায়ের মতো, তখন তো কথাই নেই!

তথ্যসূত্র: একেই বলে শুটিং, সত্যজিৎ রায়

সম্পর্কিত