সোহরাব হাসান

চার মাস বয়সী মাননীয় সংসদ সদস্যদের একাংশ নানা কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। সংসদে তাদের কেউ কেউ যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তা সংসদ সদস্য কিংবা সংসদের জন্য মর্যাদাকর নয়। সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, “বিরোধী দলের বাড়াবাড়ি দেখে বলতে ইচ্ছে হয় তোরা রাজাকার।” আবার বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও কথায় কথায় বিএনপির মধ্যে বাকশালী ভুত আবিষ্কার করেন। কিন্তু জনজীবনের মৌলিক সমস্যা, নিত্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে তেমন কথা বলেন না। আসলে সংসদে যাওয়ার পর কাউকে বাজারের ঊর্ধ্বগতি স্পর্শ করে না।
একজন সংসদ সদস্য এলাকায় যাতায়াতের জন্য গাড়ি দেওয়ার দাবি জানালেন। আরেকজন সরকারি ভবনে ওয়াশিং মেসিন ও মাইক্রোওভেনের আরজি পেশ করলেন। বাকি সময়ে তারা নিজেদের জন্য আরও কী কী দাবি জানান দেখার অপেক্ষায় আছি।
সরকারি দলের অভিযোগের জবাবে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে গিয়ে জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য তো জীবিত বাবাকে একাত্তরের শহীদ বানিয়ে ফেলেছিলেন। তার দাবি, তাদের পরিবারে ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আছেন। থাকতেই পারেন। তাই বলে জীবিত বাবাকে শহীদ বানাতে হবে কেন? সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি মাথাব্যথার দোহাই দিয়ে সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
আবার সংসদ সদস্যদের সন্তানেরাও কম যান না। একজন সংসদ সদস্যের পুত্র তো চাঁদাবাজির অভিযোগে ধরা পড়েন এবং মুচলেকা নিয়ে পরে পরিবারের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। আরেক সংসদ সদস্য কাম প্রতিমন্ত্রী নিজের দুই সন্তানের নামে ইউনিয়ন পরিষদের নাম করাকে কাকতাল বলে সাফাই গাইতে চাইলেন। ইউনিয়ন পরিষদের নাম বদলের জন্য কথিত গণশুনানিও করা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের ঘাড়ে কটি মাথা আছে যে ক্ষমতাধর প্রতিমন্ত্রীর সন্তানের নামে প্রস্তাব এলে নাকচ করে দেবে? বিষয়টি সরকার ও সরকারি দলের জন্য অস্বস্তি তৈরি করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইউনিয়নের পরিবর্তিত নাম বাতিল করে দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তার একটি ছিল স্থানীয় সরকার বিষয়ক সংস্কার কমিশন। তারা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে এবং সংসদ সদস্য তথা কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু আরও অনেক বিষয়ের মতো সেই সুপারিশও হিমাগারে চলে গিয়েছে।
এরই মধ্যে খবর এসেছে, নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হবে সংসদ সদস্যদের জন্য। প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছর এই টাকা দিয়ে সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দমতো অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবেন (প্রথম আলো, ২৩ জুন, ২০২৬)।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি) নামের প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সংসদ সদস্যরা অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজ নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ঘাট ইত্যাদির তালিকা দেবেন। সে তালিকা ধরে বরাদ্দের টাকায় কাজ করবে এলজিইডি।
অনেকেই বলেছেন, বিএনপি বদলে গেছে। কিন্তু সরকারের এই পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে আসলে কিছু্ই বদল হয়নি। সংসদ সদস্যদের এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। ওই বছর সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক সদস্যকে দুই কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হয়।
সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় সরকারের জনপ্রিতিনিধিরা বহু বছর ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। কে শোনে কার কথা। যারা সরকার চালান এবং আইন প্রণয়ন করেন, তাদের কথাই তো চূড়ান্ত।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার সংস্থায় যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের সংসদ সদস্যদের কৃপার ওপর নির্ভর করতে হবে। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কাজ সংসদ সদস্যরা করবেন। স্থানীয় সরকার সংস্থা সংসদ সদস্যের মর্জির বাইরে যেতে পারবেন না।
আসলে রাজনৈতিক দলগুলো যতই সংস্কারের কথা বলুক না কেন, তারা যে প্রকৃত সংস্কার চায় না, সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাবই তার প্রমাণ। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী দলকেও কিছুটা সন্তুষ্ট রাখতে পারবে। অন্তত যেসব এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আছেন, তারা ছোট হিস্যা পেয়েই খুশি থাকবেন। অন্য এলাকায় কী হলো তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবেন না। তারা ভাবেন, পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের জন্য এটাই মোক্ষম দাওয়াই।
আগের বিএনপির আমলের বিশেষ বরাদ্দ আওয়ামী লীগ বাতিল করেনি। বরং বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিএনপির নতুন সরকারও সেই ধারাবাহিকতা রাখার পক্ষপাতী। যদি অধিদপ্তরের প্রস্তাবটি সরকার অনুমোদন করে তাহলে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা আরও বাড়বে। আর স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো পরিণত হবে ঠুঁটো জগন্নাথে।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি নতুন সমস্যাও দেখা দেবে। সরকারি দলের সদস্য সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তাদের এলাকায় সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিরা ছড়ি ঘোরাবেন। কর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের আরও ক্ষমতাবান ভাববেন। ঠিকাদারি বাগিয়ে নেবেন। স্থানীয় সরকার সংস্থার কিছুই করার থাকবে না।
কিন্তু ক্ষমতাসীন দল যে আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলের এলাকায় উন্নয়ন কাজ তদারক করবেন। প্রয়োজনে তারা ডিও লেটার বা আধা সরকারি চাহিদাপত্রও দিতে পারবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশেষ বরাদ্দ তাদের পাওয়ার কথা নয়। সেখানে নিজ নিজ আসনের কথা বলা আছে। তাদের তো নির্দিষ্ট আসন নেই।
আইন অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি কিংবা সরকারি ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এখানে বৈষম্য স্পষ্ট। অনেক সংসদ সদস্য সংসদের কার্যবিধি পরিবর্তনেরও দাবি জানিয়েছেন, যাতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিটি সদস্য সমান সুবিধা পান। তাদের প্রশ্ন, আইন পাস করার ক্ষেত্রে যদি বৈষম্য না থাকে উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকবে কেন?
সংবিধানে স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় শাসনের দাপটই সর্বত্র। কেন্দ্র থেকেই সব সিদ্ধান্ত যায়, বাস্তবায়নের নির্দেশিকাও দেওয়া হয়। তাহলে স্থানীয় সরকার নামের বস্তুটি থাকার প্রয়োজন আছে কি না, সেই প্রশ্নও আছে। এ কথার অর্থ এই নয় যে, সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবেন না। অবশ্যই বলবেন। জনকল্যাণমুখী প্রকল্পও বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সেটা স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

চার মাস বয়সী মাননীয় সংসদ সদস্যদের একাংশ নানা কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। সংসদে তাদের কেউ কেউ যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তা সংসদ সদস্য কিংবা সংসদের জন্য মর্যাদাকর নয়। সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, “বিরোধী দলের বাড়াবাড়ি দেখে বলতে ইচ্ছে হয় তোরা রাজাকার।” আবার বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও কথায় কথায় বিএনপির মধ্যে বাকশালী ভুত আবিষ্কার করেন। কিন্তু জনজীবনের মৌলিক সমস্যা, নিত্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে তেমন কথা বলেন না। আসলে সংসদে যাওয়ার পর কাউকে বাজারের ঊর্ধ্বগতি স্পর্শ করে না।
একজন সংসদ সদস্য এলাকায় যাতায়াতের জন্য গাড়ি দেওয়ার দাবি জানালেন। আরেকজন সরকারি ভবনে ওয়াশিং মেসিন ও মাইক্রোওভেনের আরজি পেশ করলেন। বাকি সময়ে তারা নিজেদের জন্য আরও কী কী দাবি জানান দেখার অপেক্ষায় আছি।
সরকারি দলের অভিযোগের জবাবে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে গিয়ে জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য তো জীবিত বাবাকে একাত্তরের শহীদ বানিয়ে ফেলেছিলেন। তার দাবি, তাদের পরিবারে ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আছেন। থাকতেই পারেন। তাই বলে জীবিত বাবাকে শহীদ বানাতে হবে কেন? সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি মাথাব্যথার দোহাই দিয়ে সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
আবার সংসদ সদস্যদের সন্তানেরাও কম যান না। একজন সংসদ সদস্যের পুত্র তো চাঁদাবাজির অভিযোগে ধরা পড়েন এবং মুচলেকা নিয়ে পরে পরিবারের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। আরেক সংসদ সদস্য কাম প্রতিমন্ত্রী নিজের দুই সন্তানের নামে ইউনিয়ন পরিষদের নাম করাকে কাকতাল বলে সাফাই গাইতে চাইলেন। ইউনিয়ন পরিষদের নাম বদলের জন্য কথিত গণশুনানিও করা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের ঘাড়ে কটি মাথা আছে যে ক্ষমতাধর প্রতিমন্ত্রীর সন্তানের নামে প্রস্তাব এলে নাকচ করে দেবে? বিষয়টি সরকার ও সরকারি দলের জন্য অস্বস্তি তৈরি করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইউনিয়নের পরিবর্তিত নাম বাতিল করে দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তার একটি ছিল স্থানীয় সরকার বিষয়ক সংস্কার কমিশন। তারা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে এবং সংসদ সদস্য তথা কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু আরও অনেক বিষয়ের মতো সেই সুপারিশও হিমাগারে চলে গিয়েছে।
এরই মধ্যে খবর এসেছে, নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হবে সংসদ সদস্যদের জন্য। প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছর এই টাকা দিয়ে সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দমতো অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবেন (প্রথম আলো, ২৩ জুন, ২০২৬)।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি) নামের প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সংসদ সদস্যরা অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজ নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ঘাট ইত্যাদির তালিকা দেবেন। সে তালিকা ধরে বরাদ্দের টাকায় কাজ করবে এলজিইডি।
অনেকেই বলেছেন, বিএনপি বদলে গেছে। কিন্তু সরকারের এই পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে আসলে কিছু্ই বদল হয়নি। সংসদ সদস্যদের এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। ওই বছর সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক সদস্যকে দুই কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হয়।
সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় সরকারের জনপ্রিতিনিধিরা বহু বছর ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। কে শোনে কার কথা। যারা সরকার চালান এবং আইন প্রণয়ন করেন, তাদের কথাই তো চূড়ান্ত।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার সংস্থায় যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের সংসদ সদস্যদের কৃপার ওপর নির্ভর করতে হবে। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কাজ সংসদ সদস্যরা করবেন। স্থানীয় সরকার সংস্থা সংসদ সদস্যের মর্জির বাইরে যেতে পারবেন না।
আসলে রাজনৈতিক দলগুলো যতই সংস্কারের কথা বলুক না কেন, তারা যে প্রকৃত সংস্কার চায় না, সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাবই তার প্রমাণ। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী দলকেও কিছুটা সন্তুষ্ট রাখতে পারবে। অন্তত যেসব এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আছেন, তারা ছোট হিস্যা পেয়েই খুশি থাকবেন। অন্য এলাকায় কী হলো তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবেন না। তারা ভাবেন, পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের জন্য এটাই মোক্ষম দাওয়াই।
আগের বিএনপির আমলের বিশেষ বরাদ্দ আওয়ামী লীগ বাতিল করেনি। বরং বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিএনপির নতুন সরকারও সেই ধারাবাহিকতা রাখার পক্ষপাতী। যদি অধিদপ্তরের প্রস্তাবটি সরকার অনুমোদন করে তাহলে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা আরও বাড়বে। আর স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো পরিণত হবে ঠুঁটো জগন্নাথে।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি নতুন সমস্যাও দেখা দেবে। সরকারি দলের সদস্য সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তাদের এলাকায় সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিরা ছড়ি ঘোরাবেন। কর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের আরও ক্ষমতাবান ভাববেন। ঠিকাদারি বাগিয়ে নেবেন। স্থানীয় সরকার সংস্থার কিছুই করার থাকবে না।
কিন্তু ক্ষমতাসীন দল যে আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলের এলাকায় উন্নয়ন কাজ তদারক করবেন। প্রয়োজনে তারা ডিও লেটার বা আধা সরকারি চাহিদাপত্রও দিতে পারবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশেষ বরাদ্দ তাদের পাওয়ার কথা নয়। সেখানে নিজ নিজ আসনের কথা বলা আছে। তাদের তো নির্দিষ্ট আসন নেই।
আইন অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি কিংবা সরকারি ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এখানে বৈষম্য স্পষ্ট। অনেক সংসদ সদস্য সংসদের কার্যবিধি পরিবর্তনেরও দাবি জানিয়েছেন, যাতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিটি সদস্য সমান সুবিধা পান। তাদের প্রশ্ন, আইন পাস করার ক্ষেত্রে যদি বৈষম্য না থাকে উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকবে কেন?
সংবিধানে স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় শাসনের দাপটই সর্বত্র। কেন্দ্র থেকেই সব সিদ্ধান্ত যায়, বাস্তবায়নের নির্দেশিকাও দেওয়া হয়। তাহলে স্থানীয় সরকার নামের বস্তুটি থাকার প্রয়োজন আছে কি না, সেই প্রশ্নও আছে। এ কথার অর্থ এই নয় যে, সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবেন না। অবশ্যই বলবেন। জনকল্যাণমুখী প্রকল্পও বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সেটা স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।