কথায় পটু নই, কাজে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি: তারেক রহমান

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কথায় পটু নই, কাজে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি: তারেক রহমান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক

১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর থেকেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। এরমধ্যে হারিয়েছেন মা খালেদা জিয়াকে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

মূলত মা মারা যাওয়ার পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তারেক। ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তারেক বলেন, ‘‘আমার হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত। তবে মায়ের (খালেদা জিয়া) কাছ থেকে আমি যে শিক্ষাটি পেয়েছি তা হলো, যখন আপনার কাঁধে কোনো দায়িত্ব আসবে, তখন আপনাকে অবশ্যই তা পালন করতে হবে।’’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দেশের চলমান রাজনীতি, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন।

পারিবারিক বাসভবনের বাগানে বসে কথা বলার সময় তারেক টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘‘আমার শরীর এই স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিচ্ছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আসলে আমি কথা বলায় খুব একটা পটু নই, তবে আমাকে কোনো কাজ করতে বললে আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।’’

স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তব্য স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারের ওপর গত এক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিলেন।

১৮ মাস আগে এক ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির যে নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়েছে, তাতে তারেক রহমান স্পষ্টভাবেই সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত রাজনৈতিক আভিজাত্য এবং তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে এক সেতু হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন তিনি।

টাইম ম্যাগাজিন বলছে, বর্তমানে অনেকগুলো সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে বিধিনিষেধ এসেছে, যা উৎপাদন শিল্প এবং জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রতিকূলতাগুলো পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে বহুমুখী করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ যুব বেকারত্ব এবং প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণের শ্রমবাজারে প্রবেশের এই সময়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে তারেক রহমান। ছবি: চরচা
নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে তারেক রহমান। ছবি: চরচা

তবে তারেক রহমানের সাথে কিছু বিতর্কও জড়িয়ে আছে। তারেক রহমানের সমর্থকদের কাছে তিনি একজন নির্যাতিত ত্রাণকর্তা, যিনি তার বিপর্যস্ত জন্মভূমিকে বাঁচাতে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে, সমালোচকদের কাছে তিনি এক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজপুত্র। তবে তারেক রহমান জোর দিয়ে বলছেন, এই বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান বলে এখানে নেই। আমার দলের কর্মীরাই আজ আমাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’’

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও সম্ভবত তার কথায় আস্থা রাখতে ইচ্ছুক। ডিসেম্বরের শেষের দিকে করা জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জনসমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, যেখানে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।

তা সত্ত্বেও উদ্বেগ রয়েই গেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সর্বশেষ শাসনকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে যে ১ হাজার ৪০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের সেই রক্ত হয়ত কেবল আরও একজন ব্যক্তিস্বার্থান্বেষী উত্তরাধিকারীকেই ক্ষমতায় বসাবে।

তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সকল দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার তার আগের সাজাগুলো বাতিল করেছে। অভিযোগকারীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’’

এটি নিশ্চিতভাবেই সত্য যে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার একটি অনুগত সংবাদমাধ্যমের সহায়তা পেয়েছিল, যারা অন্ধভাবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রচার করত। তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে, তারেক রহমান সেই একই বংশগত বিশেষাধিকারের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন, যার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব সোচ্চার হয়েছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এককভাবে শীর্ষ অবদানকারী এবং মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সাথে মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি প্রতিবেশী যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে। আমেরিকা বাংলাদেশের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎস এবং বাংলাদেশি রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। একই সাথে দেশটি হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং বা উচ্চ-প্রযুক্তিগত উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা স্যামসাং-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা চীন থেকে সরিয়ে আনার সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে বেইজিংও বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, কারণ বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে কোনো অবরোধ পরিস্থিতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

এখন প্রত্যাশা এই যে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো এমন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করবে, যা দেশটিকে পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে রক্ষা করবে।

তারেক রহমান বলেন, ‘‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত জোরালো দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।’’

টাইম ম্যাগাজিন বলছে, তারেক রহমান বেশ মৃদুভাষী এবং অন্তর্মুখী। তিনি নিজে কথা বলার চেয়ে অন্যের কথা শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় শখ ছিল গাছগাছালিতে ঘেরা রিচমন্ড পার্কে নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ানো অথবা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। তারেক বলেন, ‘‘আমি সম্ভবত এটি আটবার দেখেছি!’’

দেশে ফেরার পর সমাবেশস্থলে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: চরচা
দেশে ফেরার পর সমাবেশস্থলে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: চরচা

তারেক রহমান ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূর্ণ করতে ১২ হাজার মাইল খাল খনন করতে চান, ভূমিক্ষয় রোধে বছরে ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান। ঢাকার লোকজন যাতে স্বস্তিতে শ্বাস নিতে পারে সেজন্য ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা (গ্রিন স্পেস) তৈরি করতে চান। এছাড়া আবর্জনা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর স্থাপন, কারিগরি কলেজগুলোকে প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলার কাজে ব্যবহার করা এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনাও তার রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘আমি যা পরিকল্পনা করেছি তার মাত্র ৩০ শতাংশ যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’’

তারেক ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানে একটি বিমান বাহিনী স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে তার স্নাতক শেষ করতে পারেননি, দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন; ক্রমে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অধিষ্ঠিত হন। একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাকে দলের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করার পাশাপাশি বিতর্কিতও করে তোলে। সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং শাসনে অন্যায্য হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন।

অনেক বাংলাদেশির কাছে তিনি আজও ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘খাম্বা তারেক’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার বৈদ্যুতিক খুঁটি বা খাম্বা একজন সহযোগীর কাছ থেকে চড়া মূল্যে কেনা হয়েছিল কিন্তু সেগুলো কখনোই বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে যুক্ত করা হয়নি। যদিও তারেক রহমান কোনো প্রকার অনিয়মের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন, তবে ২০০৮ সালের একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে স্বৈরাচারী সরকার এবং সহিংস রাজনীতির প্রতীক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ‘‘নির্লজ্জভাবে ও ঘন ঘন ঘুষ দাবি করার’’ কুখ্যাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমানকে ১৮ মাস কারাবরণ করতে হয়। তার বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং এবং আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। কারাগারে থাকাকালীন তিনি নির্যাতনের শিকার হন, যার ফলে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে কষ্ট দেয়। মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তারেক বলেন, ‘‘শীত যদি খুব বেশি হয়, তবে আমার পিঠে ব্যথা হয়। তবে আমি এটাকে জনগণের প্রতি আমার যে দায়িত্ব রয়েছে, তার একটি স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এই ধরনের কষ্টের শিকার হতে না হয়।’’

২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা দুর্নীতি মামলায় আটক হওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন এবং বিদেশ থেকে ভার্চ্যুয়ালি দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।

এর মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ের বেশিরভাগটাতেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধি লাভ করেছে। ২০০৬ সালে জিডিপি ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যার ফলে এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়। কিন্তু একই সাথে আওয়ামী লীগ ক্রমেই আরও বেশি দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে গুম করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে, যার ফলে সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন।

শেখ হাসিনার আমলের শেষের দিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলো পড়তে থাকে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য এবং যুব বেকারত্ব বেড়ে যায়।

জুলাই মাসের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। কিন্তু হাসিনার কঠোর দমন-পীড়ন রাজনৈতিক দমনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বারুদ উসকে দেয়, যা হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে প্রবীণ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক সবাইকে রাস্তায় ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।

৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা যখন গণভবনের এগিয়ে যায়, তখন হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি তার অনুগতদের একটি চক্র নিয়ে সেখানেই অবস্থান করছেন। তার পতন ও আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। হাসিনা টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘‘ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। যতক্ষণ না বাংলাদেশ সব বড় দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে একটি প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না করবে, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।’’

সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তারেক রহময়ান। ছবি: চরচা
সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তারেক রহময়ান। ছবি: চরচা

হাসিনার গণতন্ত্র হরণ নিয়ে এই অভিযোগ তারেক রহমানের কাছে বেশ বিদ্রূপাত্মক মনে হয়। বিশেষ করে হাসিনা যে ব্যাপক রক্তপাতের নেতৃত্ব দিয়েছেন তার প্রেক্ষাপটে। তারেক রহমান বলেন, ‘‘যেই অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে। তাই তাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’’ গত নভেম্বরে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যু।

তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি বেশ বিতর্কিত। শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, দলীয় কর্মীদের ভোট বাধাগ্রস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া আমরা কোনো নির্বাচন হতে দেব না। আমাদের প্রতিবাদ ক্রমেই আরও শক্তিশালী হবে... শেষ পর্যন্ত হয়তো সেখানে সহিংসতার সৃষ্টি হবে।’’

টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আওয়ামী লীগ আমেরিকার কাছে বড় করে প্রচার করছে এটা প্রমাণ করতে যে, কট্টরপন্থীরা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একইসাথে আওয়ামী লীগ এবং প্রভাবশালী ভারতীয়রা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্ররোচিত করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ আরোপ করেছে, যা দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে। তারেক রহমান বলছেন, তিনি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথ খুঁজছেন এবং বোয়িং বিমান ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাব্য আলোচনার মাধ্যমে এই চাপ থেকে মুক্তির চেষ্টা করছেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন। আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। আমি নিশ্চিত ট্রাম্প একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ।’’

ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ ২৬ বছর বয়সী প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘জুলাইয়ের পর মানুষ বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং পুলিশকে স্বাধীন করে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিল।’’ তারেক রহমানের বিষয়ে হাসনাত এখনই কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নন, তবে এ পর্যন্ত যা দেখছেন তা তার পছন্দ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘তারেক রহমান সত্যিই ভালো করছেন। বিএনপির মতো একটি দল পরিচালনা করা খুব কঠিন। তার পারফরম্যান্স নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি, তবে এ পর্যন্ত তিনি দারুণ করছেন।’’

টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সংস্কারের সফলতার বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার সময় হয়নি। অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের বিজয়ের সেই উল্লাস এখন অন্তর্দ্বন্দ্ব আর বিভাজনের ফলে ম্লান হতে শুরু করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে দূরে রাখা হয়েছিল। ড. ইউনূসের যেহেতু আগে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না, তাই এই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তার অভাব পরিলক্ষিত হয়। নারীরা এই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের অনেকাংশেই একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে; ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে কেবল একটির (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন) প্রধান করা হয়েছে একজন নারীকে। তবে এটিও ইসলামপন্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে, যাদের দাবি ছিল যে লিঙ্গ সমতার প্রস্তাবগুলো শরীয়াহ আইনের পরিপন্থী। ফলে এর প্রস্তাবগুলো স্থগিত করা হয়।

অবশ্য কিছু সফলতাও এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ খতিয়ে দেখে নিশ্চিত করেছে যে ১ হাজার ৫৬৯ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যার মধ্যে ২৮৭ জন ‘নিখোঁজ ও মৃত’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। সশস্ত্র বাহিনীর চাপ সত্ত্বেও সন্দেহভাজনদের বিচার সিভিল কোর্টে হচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনার পথও এখন উন্মুক্ত। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোবাশ্বার হাসান, হাসিনার আমলে ৪৪ দিন গুম ছিলেন। তিনি সম্প্রতি সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নেন। মোবাশ্বার বলেন, ‘‘এরপর আমি বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমিয়েছি। হাসিনার আমলে যা ছিল অকল্পনীয়।’’

কিন্তু একই সাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পিটুনি ও গণপিটুনির মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সেইসাথে বিশেষ করে নারীদের অনলাইনে হেনস্তা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত ১২ ডিসেম্বর পরিস্থিতি সবচাইতে খারাপ রূপ নেয়। ওইদিন ভারতে হাসিনার অবস্থানের তীব্র সমালোচক যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদী ঢাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের গুলিবিদ্ধ হন। তার মৃত্যুর পর বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘দিল্লি-পন্থী’ হওয়ার অভিযোগ আনে। এর ফলে ভবনের ছাদে আটকা পড়েন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। জনমনে একটি ধারণা জন্মেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নিজেদের ভূমিকার কারণে সৃষ্ট গণঘৃণার ফলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এখন তাদের দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি সাহসী বোধ করছে না।

তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মানুষ যাতে রাস্তায় নিরাপদ থাকে এবং নিরাপদে ব্যবসা করতে পারে তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’’

নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষ সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোটেও অংশ নেবে। এর মধ্যে রয়েছে—দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, ‘‘এই সংস্কারের পক্ষে না ভোট আসা হবে অত্যন্ত হতাশাজনক। এটি দেশটিকে এমন এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে যেখানে সবকিছু আবার অতীতের মতো হয়ে যেতে পারে।’’

আওয়ামী লীগকে ভোটের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর দ্রুত উন্নতি না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। হাসিনা বলেন, ‘‘দেশের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনই কখনো অবাধ বা সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।’’ তবে আলী রিয়াজ এ ব্যাপারে অনড়। তিনি বলেন, ‘‘এটি এমন একটি রাজনৈতিক দল, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জঘন্য কাজ করেছে, অথচ তারা এর জন্য ক্ষমাও চায়নি। তাদের কোনো অনুশোচনা নেই; বরং তারা মানুষকে উস্কানি দিচ্ছে।’’

আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া সঠিক কি না—এ বিষয়ে তারেক রহমান সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি বলেন, ‘‘কারণ আজ আপনি যদি একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন, তবে কাল যে আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না— তার নিশ্চয়তা কী? অবশ্যই কেউ যদি কোনো অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তবে তাকে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে।’’

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদের সঞ্চার করলেও বিপ্লবোত্তর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থান। বাংলাদেশ এমন এক দেশ যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, আবার সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ প্রায় ১০ শতাংশ সংখ্যালঘুর বিশাল জনপদ রয়েছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও ১৯৮৮ সালে সামরিক একনায়কতন্ত্রের সময় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। টাইম ম্যাগাজিন বলছে, এই বৈপরীত্য বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছে।

সাময়িকীটি দাবি করছে, হাসিনার হাজারো ত্রুটি থাকলেও তিনি উগ্রবাদকে চেপে রেখেছিলেন এবং এমনকি ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইনও পাস করেছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর তাদের প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল ইসলামপন্থী দল জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। যারা বর্তমানে তাদের চতুর সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন প্রথমবারের মতো ভূমিধস জয় পায়—যা ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া আরও চারটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা জয়লাভ করে। নতুন দল এনসিপি ও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী দল ত্যাগ করেছেন। সমকামী অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে দলীয় রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার একজন নার্স ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম বলেন, ‘‘এটি নারী নেত্রী এবং সংখ্যালঘু ও তরুণদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, যারা তাদের ওপর আস্থা রেখেছিল।’’

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে শরিয়াহ আইনের লক্ষ্য থাকলেও তারা বর্তমানে তাদের উগ্র ভাষা পরিহার করেছে। তারা নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী’ হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরছে এবং সমাজকল্যাণ ও অন্যান্য দলের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমনকি তারা একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকরা একে স্রেফ লোক দেখানো বললেও অনেক সাধারণ বাংলাদেশি তাদের এই ধর্মীয় ভাবমূর্তিতে বিশ্বাস রাখছে। জানুয়ারির শুরুতে জামায়াত নেতা এমনকি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সাথে গোপন বৈঠকের কথা প্রকাশ করেছেন। অতীতের প্রেক্ষাপটে যা ছিল অকল্পনীয়। তারেক রহমান অবশ্য এতে বিচলিত নন। তিনি বলেন, ‘‘মানুষ শুধু এমন এক গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে এবং নিজেদের প্রকাশ করতে পারবে।’

নেতা-কর্মীদের নিয়ে বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করছেন তারেক রহময়ান। ছবি: চরচা
নেতা-কর্মীদের নিয়ে বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করছেন তারেক রহময়ান। ছবি: চরচা

যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক মেরামত করা হবে অন্যতম অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় চারদিক থেকেই এই দক্ষিণ এশীয় পরাশক্তি দ্বারা বেষ্টিত। বাংলাদেশ-ভারতের আড়াই হাজার মাইলের অভিন্ন সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। এটি ভারতকে বাংলাদেশি পণ্যের প্রধান ট্রানজিট রুট এবং তুলা, শস্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রধান উৎসে পরিণত করেছে। তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই প্রথম অগ্রাধিকার, এরপর আমরা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।’’

হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং ভারত থেকে আওয়ামী লীগ-পন্থী প্রচার চালানোয় নয়াদিল্লিকে তরুণ বাংলাদেশিরা প্রধান ভিলেন চরিত্রে দেখছেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘‘তারেক রহমানের মতো কারো জন্যও নয়াদিল্লির সাথে সখ্যতার কথা প্রকাশ্যে বলা এখন বড় ধরণের রাজনৈতিক ঝুঁকির কাজ।’’

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র ও সাড়ে তিন হাজারের বেশি সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে সমর্থন দিয়েছিল। অথচ আজকের তরুণ বাংলাদেশিদের কাছে জামায়াত হলো ‘দুর্নীতিমুক্ত’ শক্তির প্রতীক আর ভারত হলো পরম শত্রু।

এই বিচ্ছেদ প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান কেবল তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিদের কাছে অর্ধশতক আগের বীরত্বের গল্পের তেমন প্রয়োজন নেই; তারা মরিয়া হয়ে এমন একজন নেতা খুঁজছে যিনি কথা শুনবেন, সেতুবন্ধন তৈরি করবেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবেন। যদি অর্থনৈতিক মন্দা চলতেই থাকে, তবে সাধারণ মানুষ হয়তো হাসিনার আমলকে ভালো চোখে দেখা শুরু করতে পারে। কুগেলম্যান বলেন, ‘‘পরিবারতান্ত্রিক দলগুলোকে কখনো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিএনপি মাত্র দুই বছর আগেও মৃতপ্রায় ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও হয়তো এখনো শেষ হয়ে যাননি। তিনি এখন কোনো ফ্যাক্টর নন, কিন্তু ভবিষ্যতে তাকে হিসেবে না রাখার উপায় নেই।’’

টাইম ম্যাগাজিন বলছে, তারেক রহমান দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হলেও বাংলাদেশের জন্য বিপদ লুকিয়ে আছে বিএনপির হাজার হাজার তৃণমূল নেতা কর্মীদের মধ্যে, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছে। তারা এখন মনে করছে, কিছু কামিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। এতে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে না।

তবে এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তারেক রহমান পূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। গত মে মাসে তিনি নিজেকে এবং তার মাকে নিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন পুনরায় পোস্ট করেন। তারেক উল্লেখ করেন যে, ‘‘নির্ভীক এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে সম্মান জানানো প্রয়োজন, এমনকি সেটি যখন আমাদের আদর্শের সাথে মেলে না তখনও।’’ খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জনের জন্য হাসিনার সমালোচনা না করে বরং ঐক্যের ডাক দেন। হাসিনার ‘আয়রন লেডি’ ভাবমূর্তির বিপরীতে তারেক রহমান নিজেকে অনেক নরমভাবে উপস্থাপন করছেন; তার পোষা বিড়াল জেবু যুক্তরাজ্য থেকে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।

লন্ডনের ফেলে আসা জীবনের কোন বিষয়টি তিনি সবচাইতে বেশি মিস করেন এমন প্রশ্নে তারেক রহমান দ্বিধা ছাড়াই বলেন, ‘‘আমার স্বাধীনতা।’’

নিজের বাড়ির ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যখন এই বাড়িতে এলাম এবং এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখলাম, আমার খুব দমবন্ধ লাগছিল।’’

দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানো বা মেয়ে জাইমাকে সারপ্রাইজ দিতে নিজে লেক্সাস চালিয়ে বেন নেভিস পাহাড়ে যাওয়ার সেই দিনগুলো এখন অতীত। এখন দিনে ১০ হাজার কদম হাঁটার জন্যও তাঁকে সৃজনশীল পরিকল্পনা করতে হবে।

তবে তারেক রহমান অভিযোগ করছেন না। তিনি দেখাচ্ছেন, তার ফিরে আসাটা কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করার সংকল্প। নিজের কথাটি প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নয়, বরং ‘স্পাইডার-ম্যান’ চলচ্চিত্রের একটি বিখ্যাত উক্তি বেছে নেন। তিনি বলেন, ‘‘অসীম ক্ষমতার সাথে আসে অসীম দায়িত্ব। আমি এই কথাটিতে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।’’

(টাইম ম্যাগাজিন থেকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন ইয়াসিন আরাফাত)

সম্পর্কিত