বাংলাদেশে নির্বাচন, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই, কেন?

বাংলাদেশে নির্বাচন, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই, কেন?
প্রতীকী ছবি

দেশে নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজেদের মতো করে প্রচার চালাচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও প্রচার চলছে। আর এই ঘায়েলের অন্যতম উপায় হিসেবে আলোচনায় আসছে ‘বহিঃশক্তি’। শুনতে যেমনই লাগুক, বাস্তবতা এটাই। বাংলাদেশের নির্বাচনে বাংলাদেশই যেন ‘সাবসিডিয়ারি’ হয়ে উঠেছে, বাংলায় যাকে বলে অতিরিক্ত বিষয়।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে মানুষের মধ্যে আগ্রহ প্রবল। শঙ্কাও প্রবল। সঙ্গে সাথী হয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। নির্বাচনের মাঠে থাকা দুই বড় দলের একটি বিএনপি, অন্যটি জামায়াতে ইসলামী। উভয় পক্ষই বহিঃশক্তি প্রশ্নে একে অন্যের দিকে আঙুল তাক করে আছে। একপক্ষ যদি বলে, ভারতের কথা, অন্যপক্ষ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের কথা। আর এই দুই রাষ্ট্রের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসছে যথাক্রমে পাকিস্তান ও চীনের প্রসঙ্গও। নজরে থাকছে তুরস্কের নড়াচড়াও।

নির্বাচনী মাঠ, প্রচারসভার নানা বক্তব্য, নির্বাচন ঘিরে হওয়া নানা টক শো বা আলোচনায় ঘুরে ফিরে এ দেশগুলোর নাম উঠে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে–বাংলাদেশ যেন গোটা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে বসে আছে। সারা দুনিয়া যেন এই একটি নির্বাচন নিয়ে ছক কষতে ব্যস্ত। আসলেই কি তাই?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ–এ কথা তো অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে। শুনতে শুনতে নিতান্ত ছাপোষা মানুষও এখন নিজের অজান্তেই বলে বসছে–‘হবে না, বাংলাদেশের অবস্থানটা দেখতে হবে না!’ কিন্তু যদি পাল্টা প্রশ্ন করেন, তা অবস্থানটা কী, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়তো পুরোটা ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। এটা তার সংকট নয়। সংকট বোদ্ধাদের, যারা বিষয়টি কখনোই সেভাবে খোলাসা করে বলেননি। সত্যিই প্রশ্ন ওঠে যে, বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের ক্ষমতায় কে থাকবে, তা নিয়ে বিশ্বের বিবদমান পক্ষগুলো নিজেদের মধ্যে কেন এত প্রতিযোগিতা করছে? একটু দেখা যাক বরং।

প্রতিযোগিতাটি কেমন? বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় যোগ দেওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ঢাকা যদি বেইজিংয়ের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পথ বেছে নেয়, তবে বাংলাদেশ ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার চীনা দূতাবাস ক্রিস্টেনসেনের এমন মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন’ বলে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনকে ‘নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন ও বাংলাদেশের স্থিতিশীলতায় সহায়ক পদক্ষেপগুলোতে মনোনিবেশের’ আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। এদিকে তুরস্কের তৎপরতাও কম নয়। সফট ডিপ্লোমেসির উদাহরণ হিসেবে বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে না খেলার যে বার্তা পাকিস্তান দিয়েছে, তাকেও আমলে নিতে হবে। ছোটাছুটি দেখা যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যেও। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের নেতাদের মধ্যেও কূটনীতিক পাড়ায় ছোটাছুটির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কূটনীতিকেরাও বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রায় অর্ধশত বিদেশি কূটনীতিক বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও একের পর এক বৈঠক হচ্ছে।

এমনিতে রাজনীতিকদের সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিষয়টি তখনই আলোচনার জন্ম দেয়, যখন কোনো কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে লুকোছাপার প্রসঙ্গ আসে। জামায়াত আমিরের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকের বৈঠক ভারতীয় পক্ষের অনুরোধে গোপন রাখার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আলোচনার শুরু হয়। বিএনপির তরফ থেকে জামায়াতের দিকে আঙুল তুলে বলা হয়–এই যে দেখেছ, বলেছিলাম কি না। জামায়াতও চুপ থাকবে কেন? তারাও অভিযোগ তুলে বলতে থাকে–ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে চায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতবিরোধী রাজনীতির এই জোর হাওয়ার কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটির দেশটির সঙ্গে যোগাযোগকে এক রকম ‘অপরাধ’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা আছে। বিরোধী পক্ষগুলো পরস্পরকে ঘায়েল করতে ‘ভারতের ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে ট্যাগ লাগিয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারের মাঠে এটা স্বাভাবিক কৌশল। আসছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গও। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকের আলাপের একটি অডিও ফাঁস হয়, যেখানে জামায়াতকে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধু হিসেবে পেতে আগ্রহী বলে সুস্পষ্ট ভাষ্য পাওয়া যায়। ফলে অবধারিতভাবেই বিষয়টি বিতর্কের সূচনা করে। আলোচনায় আসে চীন, পাকিস্তান, তুরস্কও। প্রশ্ন হলো–এই দেশগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কি সত্যিই উচাটন? হলে কেন? বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ কী?

কেন্দ্র যখন বঙ্গোপসাগর

বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বঙ্গোপসাগর। নির্বাচনের ক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, বঙ্গোপসাগরে তীব্রতর হতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রটি তত প্রকাশ্য হচ্ছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উত্তেজনা কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই নয়, বরং দেশটির শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই সামুদ্রিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের পথগুলোর ওপর নজর রাখাটা ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের বাণিজ্যের জন্য অত্যাবশ্যক। ফলে এই সামুদ্রিক অঞ্চলে উপস্থিতি বজায় রাখা এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি কৌশলগত অবস্থান প্রদানে বাংলাদেশ উপযুক্ত স্থানে রয়েছে।

বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বঙ্গোপসাগর। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বঙ্গোপসাগর। ছবি: সংগৃহীত

পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য হাইড্রোকার্বন মজুতও রয়েছে। জ্বালানি সম্পদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যতে একজন কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি স্থল সেতু হিসেবে তো বটেই তরুণদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এ দেশকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একদিকে আছে বিরাট বাজার, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থান।

একদিকে আমদানি, অন্যদিকে রপ্তানি গন্তব্য। আমদানি উৎস বিচারে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশীদার। আর যুক্তরাষ্ট্র দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। ফলে উভয় দেশের হাতেই রয়েছে মোক্ষম অস্ত্র। বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য উভয় দেশই তাই মুখিয়ে আছে। কেন?

চীনের প্রয়োজন স্থলবেষ্টিত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইউনান ও তিব্বতে সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার। সেটি পেলে বেইজিংয়ের পক্ষে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নিরসন সম্ভব। বর্তমানে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চীনের জ্বালানি আমদানিসহ প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্য হয়। কিন্তু এই প্রণালীতে চীন কিছুটা বামন বলা যায়। উৎপাদক দেশ হিসেবে উঠে এসে চীন আজ যে বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, তার কেন্দ্রে আছে দেশটির জ্বালানি চাহিদা। দেশটির জ্বালানি আমদানি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা এই প্রণালির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু এই প্রণালি ঘিরে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর সরব উপস্থিতি। প্রণালিটির চারপাশে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আছে ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। এর জলসীমা তিন দেশই দাবি করে। আর কল্পিত ‘জলদস্যু’ দমনের লক্ষ্যে প্রায়ই নৌটহল ও অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র জাপানসহ বিভিন্ন দেশ। এটি মূলত চীনকে বার্তা দেওয়া যে, আমরা কিন্তু আছি।

ফলে চীনের উদ্বেগ বাস্তবতাবর্জিত নয় একেবারেই। এ কারণেই ২০০৩ সালে সাবেক চীনা প্রধানমন্ত্রী হু জিনতাও একে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বলে উল্লেখ করেন। এই ডিলেমা থেকে বাঁচতেই চীন বঙ্গোপসাগরে নিজের সক্রিয় উপস্থিতি তৈরিতে তৎপর। তারা বিকল্প প্রবেশপথ তৈরিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় দেশগুলোর অংশীদার হতে চায়। এই চাওয়া থেকেই তারা মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাইপলাইন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিনিয়োগ করেছে মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূলের কোয়াকফু বন্দরে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআইয়ের আওতায় ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে তারা বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কক্সবাজার পর্যন্ত যে রেললাইন বিস্তৃত হয়েছে, তারও লক্ষ্য ছিল কিন্তু এটি। স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের এটি পছন্দ হওয়ার কথা নয়। হয়ওনি।

কেন? বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য ও উন্নয়ন অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চট্টগ্রাম ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ খুঁজতে গেলে পুরনো একটি প্রবাদের কথা বলতে হয়–হু রুলস দ্য ওয়েভ, রুলস দ্য ওয়ার্ল্ড। স্মরণ করুন–কিছুদিন আগে পানামা খাল নিয়ে বা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলেছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে এ দুটি অঞ্চল নিজের বলে দাবি করে বসে আছেন। এ নিয়ে আর্কটিক রাজনীতি এখন তোলপাড়। সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রের দুর্ভাবনা চীনকে নিয়েই। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, চীন চারপাশ দখল করে বসে আছে। ফলে বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কপালে ভাঁজ ফেলবে–এটাই স্বাভাবিক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদেই ওয়াশিংটন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আলাদা কৌশল ঘোষণা করে এবং ২০১৮ সালে চতুর্দেশীয় জোট কোয়াডের পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়। বেড়ে যায় বাংলাদেশের গুরুত্বও।

সঙ্গে আছে ভারত। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী প্রতিযোগী চীনের তৎপরতাকে ভালোভাবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই ভারতের। উপরন্তু চীনের মতো এ ভারতেরও বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোর প্রয়োজন বিবেচনায় দিল্লির জন্য নিরুপদ্রব বঙ্গোপসাগর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই বাধ সাধছে চীন। আন্দামানের কাছেই গ্রেট কোকো আইল্যান্ডে চীনা অর্থায়নে হয়েছে বড় অবকাঠামো, যা চরিত্রে সামরিক। সঙ্গে আছে মিয়ানমারের কোয়াকফু বন্দর। এদিকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা তো আছেই। আর পাকিস্তানের গদার সমুদ্র বন্দরে চীনা বিনিয়োগ তো বহু পুরনো। অর্থাৎ, চীন বঙ্গোপসাগর ঘিরে এক জাল তৈরির চেষ্টা করছে। ফলে চট্টগ্রামের বন্দর ও কক্সবাজার উপকূল ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিবদমান পক্ষগুলোর কাছে।

এখানে আসে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কথা। বর্তমানে আলোচিত জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিক সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা গণমাধ্যমে এসেছে। যুক্তরাজ্যে টেমস নদীর তীরে একটি বন্দর নির্মাণে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সহযোগিতাও করেছিলেন এপস্টেইন। বাংলাদেশের বন্দরের কাজ পেয়েছে এই ডিপি ওয়ার্ল্ড, যার সাথে মার্কিন সংযোগ বেশ স্পষ্ট। এ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ যেমন হচ্ছে, তেমনি নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ইশা খাঁ সংলগ্ন এনসিটি টার্মিনালে হচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ, যা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে অনড়। কতটা অনড়? এমনকি এই চুক্তির বিরোধিতাকারীদের ‘প্রতিহত’ করার ভাষ্যও এসেছে সরকারের তরফ থেকে। সুতরাং এ চুক্তির উত্তাপটি সহজেই অনুমেয়।

চিকেন নেকের মানচিত্র। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
চিকেন নেকের মানচিত্র। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ভারতের স্বার্থের বিষয়টি এখানে সুস্পষ্ট। আগেই বলা হয়েছে, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোর জন্য বঙ্গোপসাগরের প্রবেশমুখ হিসেবে বাংলাদেশ ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতবিরোধী নানা উত্তেজনায় বারবার এ বিষয়টি উঠে এসেছে। লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির হিসাব মেনে নানা সময়ে বাংলাদেশের উত্তরে থাকা ভারতের চিকেন নেক নিয়ে নানা বক্তব্য এসেছে। ভারতের তরফ থেকেও বাংলাদেশের চিকেন নেক নিয়ে নানা বক্তব্য এসেছে। কথার মিসাইল ছুটেছে প্রতিনিয়ত। জনপরিসর থেকে আসা হোক বা জাতীয় নেতৃত্ব–দু পক্ষের যে বা যারাই এ ভাষ্য হাজির করুক না কেন, এটি কোনোভাবেই নিরীহ বা ভূরাজনৈতিক ছক বিবর্জিত নয়।

ভারত যে সমীকরণে উপস্থিত, সেখানে তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সগৌরবে হাজির থাকবে–এতে আর বিস্ময়ের কী আছে? ফলে ইসলামাবাদও হাজির। এর সর্বশেষ নমুনা হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে হওয়া ক্রীড়া রাজনীতিটি ঘটে গেল, যা আপাত অর্থে রাজনৈতিক, বৃহদর্থে ভূরাজনৈতিক।

তুরস্ক এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার প্রভাব বিস্তারে ধর্ম, ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও অগ্রসর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশে সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহে এই ন্যাটো সদস্যের আগ্রহ বিপুল। ফলে পশ্চিমা শক্তি বলয়ের অংশ হিসেবেই তুরস্ক বাংলাদেশের নির্বাচনে পৃথক একটি অক্ষ হিসেবে ক্রিয়াশীল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিছক বন্ধু দেশ থেকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উন্নীত হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়েছে তুরস্ক।

গত বছরের অক্টোবরে তুরস্কের কাছ থেকে বাংলাদেশ দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাইপার এবং হিসার-ও‍+ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। পাশাপাশি যৌথভাবে ড্রোন উৎপাদন কারখানা গড়ার বিষয়েও অগ্রসর হয় দুই দেশ। আলাপে আসে সমরাস্ত্র কারখানায় তুরস্কের বিনিয়োগের প্রসঙ্গও। এই পুরো তৎপরতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের ‘এশিয়া এনিউ’ ভিশনকেই সামনে আনছে, যেখানে এই ন্যাটো সদস্য দেশকে তিনি এশিয়ায় প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল ঘোষণা করেছেন।

ফলে মিরসরাইয়ে অস্ত্র কারখানা স্থাপনের খবরকে অনেকে পাঠ করেছে তুরস্কের সংযোগ হিসেবে। সম্প্রতি মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ জমি বাতিল করে সেখানে এই কারখানা গড়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সরাসরি কোনো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেপজার কথা বলা হলেও বিনিয়োগ সহায়তার প্রসঙ্গটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তুরস্কের অস্ত্র কারখানায় বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর পরিদর্শনসহ নানা তৎপরতা যেমন তুরস্কের দিকে আঙুল তুলছে, তেমনি একই অঞ্চলে চীনা ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ মিশ্র এক পরিস্থিতির জানান দিচ্ছে। মনে করে দেখুন–গত নভেম্বরেই মিরসরাইয়ের এই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে চার প্রতিষ্ঠানের ১১ কোটি ডলারের বিনিয়োগের খবর বেরিয়েছিল, তার মধ্যে চীন ও মার্কিন মিত্র সিঙ্গাপুর পাশাপাশি অবস্থান করছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ বিশ্বের সেই বিরল দেশগুলোর একটি, যেখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এক পাতে বসতে রাজি হয়েছে। ফলে এখানকার নির্বাচন পাড়া-পড়শি তো বটেই দূর সম্পর্ককেও কাছে টানবে–এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে।

কাছে টানছেও। নির্বাাচনের মাঠে থাকা দুই দলই গুরুত্ব পাচ্ছে দেশগুলোর কাছে। গত বছরের এপ্রিলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। একই বছরের জুনে চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সুন ওয়েইডং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় হাজির আছে কাগজে–কলমে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও। দেশগুলো রাষ্ট্রীয়–অরাষ্ট্রীয় নানা কৌশলে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে।

সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ময়দানে শুধু দেশীয় রাজনীতিকেরা নেই। আছে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর নানা ভাগ-বাটোয়ারার হিসাবও। আর এই হিসাবের কেন্দ্রে আছে আসন্ন নির্বাচন। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন, এর ভোটকেন্দ্র এবং তার পাহারায় থাকার যে ভাষ্য রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর কাছ থেকে আসছে, তার কতটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির, আর কতটা তথাকথিত পড়শির, তা বোঝা বেশ দুরূহ। ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ’ নির্বাচনের যে আলাপ শোনা যাচ্ছে, তার কতটা বুলি, কতটা সত্যিকারের–তা নিয়ে তাই চাইলেও খচখচানি এড়ানো কঠিন। নির্ঘুম পড়শিরা (বিশ্বগ্রামে এখন সবাই পড়শি) শেষ পর্যন্ত খোদ বাংলাদেশের ঘুম কেড়ে না নিলেই হয়।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত