দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু বলতেই চিকিৎসা, আর তার কারণেই আমরা মাদ্রাজ বা চেন্নাই ও ভেলোরের কথাই বেশি মনে করি। কিন্তু তিরুচিরাপল্লিও তামিলনাড়ুর একটি বড় শহর। এই শহরটাকেই নতুন দল ঘোষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ভারতীয় বিনোদন জগতের সবচেয়ে ‘দামি’ শিল্পী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়। মানুষের কাছে অবশ্য তিনি শুধুই বিজয়। আবার থালাপাত্তি। তামিল শব্দ থালাপাত্তি-র অর্থ কমান্ডার বা সেনাপতি। সাতবার ফোর্বস ইন্ডিয়ার ১০০ সেলিব্রিটির তালিকায় স্থান পাওয়া বিজয়ের জনপ্রিয়তার আঁচ পাওয়া যায় তার নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণার সময়। নতুন দল গড়তে গিয়ে অভূতপূর্ব কারণে আইনিযুদ্ধও লড়তে হচ্ছে তাকে। সামলাতে হচ্ছে পুলিশি হয়রানিও।
দিনটা ছিল গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর। আগে থেকেই তিরুচিরাপল্লিতে নতুন দল ঘোষণার কথা ঘোষণা করেছিলেন বিজয়। সেইমতো সকাল থেকেই জমায়েত স্থলে লাখ লাখ মানুষ ভিড় করতে থাকেন। সম্ভবত বিজয় নিজেও বুঝতে পারেননি, তার ডাকে সাড়া দিয়ে এত মানুষ আসবেন! বিশাল জনসমুদ্রে তিনি ঘোষণা করেন, তামলিগা ভেত্ত্রি কাজাগাম বা টিভিকে নামের তার নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের। এই অবধি তো সব ঠিকই ছিল। কিন্তু ৫১ বছর বয়সী সুপারহিরোকে বাস্তবের মঞ্চে দেখতে মানুষের উন্মাদনায় হুড়োহুড়ি লেগে যায় সেই ভিড়ের মধ্যে।
সমাবেশে প্রাণ হারান ৪১ জন বিজয়-ভক্ত। ছবি: রয়টার্সআবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই একবার দেখতে চান তাদের প্রিয় নায়ককে। চান ছুঁয়ে দেখতে রুপালি পর্দার হিরোকে। সেই উত্তাল জনসমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। পরিণামে সেদিন পদপিষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারান ৪১ জন বিজয়-ভক্ত। জখম হন আরও শতাধিক। এই জনস্রোত পরিণত হয় শোকে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় বিজয়ের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। সেই মামলা এখনো চলছে।
তামিল সিনেমার এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীর নাম বিজয়। ৬৯টি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। প্রায় সব সিনেমাই সুপারহিট। তামিল সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়কের নামও বিজয়। টেলিভিশন উপস্থাপক হিসাবেও তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সকলেই জানেন, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে রূপালি পর্দার মানুষদের আলাদা দাপট রয়েছে চিরকাল। অতীতে বিজয়কান্ত, এমজি রামচন্দ্রান, জে জয়ললিতারা রাজ্য শাসন করেছেন। বর্তমানে বিজয় ছাড়াও কমল হাসান, শরৎ কুমার, খুশবু সুন্দর, নমিতারা রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে। তবে জনস্রোতে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন থালাপাত্তি বিজয়। এখন দেখার সেই জনস্রোত বিজয়কে তামিলনাডুর মাটিতে আসল জয় এনে দেয় কি না!
তামিলনাড়ুর নির্বাচন ২৩ এপ্রিল। রাজ্যের ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৭ হাজার ৩৮০ জন ভোটার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন। মূল লড়াই শাসকদল ডিএমকে ও কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল জোটের (এসপিএ) সঙ্গে বিরোধী দল এআইএডিএমকে-বিজেপির জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ)। দুই পক্ষই কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই তৃতীয় শক্তির উত্থানে দুই পক্ষই আশঙ্কায় আছে ভোট হারাবার। তাই এবারের তামিলনাডু নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টরের নাম থালাপাত্তি বিজয়।
মুথুভেল করুণানিধি স্ট্যালিন বর্তমানে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। তার জন্মের চারদিন আগে মারা যান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জোসেফ স্টালিন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রয়াত সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম করুনানিধি নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন স্ট্যালিন। ২০২১ সাল থেকেই সেই স্ট্যালিনই তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। তার দল এবার স্লোগান দিয়েছে, ‘স্ট্যালিন থোদারাত্তুম, তামিলনাড়ু ভেল্লাত্তুম’। অর্থাৎ, ‘চলতে থাকুক স্ট্যালিন , জয় হোক তামিলনাডুর’।
এআইএডিএমকে-বিজেপি জোটের পাল্টা স্লোগান, ‘মাক্কালাই কাপপম, থামিঝাগাথাই মিটপম’। অর্থাৎ ‘আসুন রক্ষা করি জনগণকে, আসুন বাঁচাই তামিলনাড়ুকে’। মানুষের মনে কাদের স্লোগান দাগ কাটবে সেটা বোঝা যাবে ৪ মে, ভোটগণনার দিন। এবার চোখ রাখা যাক গত বিধানসভা ভোটের ফলাফলে।
২৩৪ আসনের তামিলনাডু বিধানসভায় গতবার এসপিএ পেয়েছিল ১৫৯টি আসন। এরমধ্যে ১৩৩টিই ছিল ডিএমকের। কংগ্রেস ১৮টি এবং বামেরা পশ্চিমবঙ্গে শূন্য হলেও তামিলনাড়ুতে ৪টি আসন জিতেছিল। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে বিজেপি ৪টি এবং এআইএডিএমকে ৬৬টি আসনে জয়লাভ করে। তাদের জোটের মোট আসন দাঁড়ায় ৭৫। শতাংশের হিসাবে এসপিএ ৪৫.৪ শতাংশ এবং এনডিএ ৩৯.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তামিলনাড়ুর ৩৯টি আসনই পায় এসপিএ। এরমধ্যে কংগ্রেস পায় ৯টি আসন এবং এনডিএ কোনো আসন পায়নি। শতাংশের হিসাবে এসপিএ পায় ৪৬.৯৭ শতাংশ। লোকসভা ভোটে এআইএডিএমকের সঙ্গে বিজেপির জোট হয়নি। প্রাপ্ত ভোটের হার এনডিএর ১৮.২৮ এবং এআইএডিএমকের ২৩.০৫ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে কী হবে তা নিয়ে অনেক সংশয় রয়েছে। জরিপেও উঠে এসে ভিন্ন ভিন্ন মত।
ভারতের একটি নির্বাচনকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: রয়টার্সডিএমকে ও এআইএডিএমকে দুই দলই তামিলনাড়ুর মূল রাজনৈতিক শক্তি। এই দুই দলকেই বিকশিত করেছেন রূপালি পর্দার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা। এআইএডিএমকে ছিল এক সময়ের দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক তথা প্রয়াত সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এমজি রামচন্দ্রনের (এমজিআর) হাতে গড়া আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি। তার নেতৃত্বেই তামিলনাড়ুর ক্ষমতাও দখল করেছিল দলটি। পরে নায়িকা জয়ললিতার হাত ধরে দলটি আরও শক্তিশালী হয়।
জয়ললিতা বেঁচে থাকতে নেতৃত্বে কোনো সংকট ছিল না। কিন্তু সমস্যা হয় তার মৃত্যুর পরই। নেতৃত্বের দাবিদার দলের অনেক নেতা। জয়ললিতা বিয়ে করেননি। তাই তার কোনো পারিবারিক উত্তরসূরী নেই। বান্ধবী শশীকলা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাকে অনেকে মেনে নেননি। ফলে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে এআইএডিএমকে। অন্যদিকে, অভিনেতা বিজয়কান্তের হাতে গড়া ডিএমকে পরবর্তীতে লেখক ও কলাকার করুনানিধির হাত ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
করুনানিধির মৃত্যুর আগেই তার উত্তরসূরি হিসেবে স্ট্যালিন নিজের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই এখন চলছে ডিএমকের রাজনৈতিক দাপট। স্ট্যালিনের ছেলেও এখন রাজনীতিতে। ফলে উত্তরাধিকারের অভাব নেই ডিএমকে দলে।
তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতি এই দুই আঞ্চলিক দলই এখনো নিয়ন্ত্রণ করত। এআইএডিএমকে নেতৃত্বের সংকটে ভুগলেও তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তাদের শক্তি হেলাফেলার নয় মোটেই। বরং বলা যেতে পারে দুই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক শক্তি কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের দাপটেই তামিলনাড়ুতে বেশ দুর্বল। তাদের ভরসা আঞ্চলিক শক্তিই। এবার বিজয়ের হাত ধরে টিভিকের আত্মপ্রকাশ তাই দুই সর্বভারতীয় দলকে আরও বেশি ‘পরজীবী’ করে তুলেছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)