দীপ্তি দত্ত

প্রথমেই বলে নিতে চাই এই লেখায় আমি কোনো সমাধান প্রস্তাব করার চেয়ে এই সময়ের প্রেক্ষাপটে সংকটগুলো চিহ্নিত করা জরুরি মনে করেছি। সংকটের উল্লেখমাত্র রয়েছে, বিস্তারিত আলোচনা লেখায় নেই।
৭ বছরের শিশুকে একলা, বাড়ি থেকে ঠান্ডা মাথায় বহু দূরে নিয়ে যায় বয়ঃপ্রাপ্ত এক পুরুষ। যৌন নির্যাতন শেষে গলা কেটে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শিশু বড় সজীব প্রাণ। সহজে নিস্তেজ হওয়া তাকে মানায় না। তবু ’ঠান্ডা গোশত’ প্রতিনিয়ত উৎপাদন করে যে সমাজ, সেখানে শিশু শেষ পর্যন্ত মৃত মাংসের দলা। শিশু অথবা এক নারী, যিনি শিক্ষক, যাকে এক কর্মচারী গলা কেটে মেরে ফেলে। এসব হত্যার গল্পের শেষ নেই। এসব ঘটনার মধ্যে একজন আক্রান্ত এবং অন্যজন আক্রমণকারী। উপরে উল্লেখ করা দুটি খবরের মধ্যে হত্যার পেছনের কার্যকারণে বলার চেষ্টা করা হয়েছে-পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে নাকি পরিবারের নারী শিশুটির যৌনাঙ্গকে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ প্রতিশোধের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। দ্বিতীয়টির কারণের মধ্যেও বলা হয়েছে বদলির জেরে নারী শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে।

যিনি শক্তিমান, তিনি আক্রমণ করেন। আর যিনি দুর্বল, তিনি আক্রান্ত হন। সর্বশক্তিমানের পূজা এই সমাজের নৈতিক শিক্ষার অংশ। তারই সমান্তরালে দেখা যায়, এখানে অনায়াসে প্রতিনিয়ত পুরুষ হয়ে ওঠে আক্রমণকারী, আর নারী কেবল আক্রান্ত সত্তা। এই আক্রান্ত হওয়ার যেমন কোনো বয়স নেই, তেমনি আক্রমণ করার জন্যও পুরুষের কোনো বয়স লাগে না।
প্রশ্ন হলো-পুরুষের এই লৈঙ্গিক সত্তাটির শক্তি কীভাবে উৎপাদিত হয়? এর জন্য কি শারীরিক শক্তিতে বলীয়ান পুরুষেরাই কেবল শারীরিক শক্তিতে দুর্বল নারীকে আক্রান্ত করে?
সমাজ নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয় ‘ছেলে’ হলে যেকোনো ছেলেশিশুই এই লৈঙ্গিক ক্ষমতা রপ্ত করতে শুরু করে জন্মের পর থেকেই। এই ক্ষমতা ছেলে শিশুকেও অনিরাপদ করে তোলে। শিশু অবস্থায় সে নিজে যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তাকে তা লুকিয়ে ফেলতে হয়। যেমনটা মেয়ে শিশুরাও রাখে আজীবন। তারপরও পুরুষের কাছে নারী ব্যাপক অর্থে অনিরাপদ।
প্রশ্ন আসে-ভিন্ন লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে নারী-পুরুষ কি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? এই সকল আক্রমণের পেছনে দেখানো কারণগুলোই কি যথাযথ কারণ? নাকি মানসিক দ্বেষ, রোষ বা বিদ্বেষ কাজ করে শুধু লৈঙ্গিক পরিচয় সূত্রে? এই দ্বেষ বা রোষ কেন এবং কীভাবে উৎপাদিত হয়? নাকি পৃথিবীর যেসকল জনগোষ্ঠীতে যৌন নির্যাতনের ইতিহাস নেই বা সীমিত, সে তুলনায় বাংলাদেশের পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা/চাহিদার গড় বেশি? নাকি এ দেশের পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা শরীরের চেয়ে মনে উৎপাদিত হয় বেশি? সামাজিক ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো ক্ষমতা উৎপাদন করে। এই ক্ষমতা ইচ্ছেমাফিক যেকোনো সিস্টেমকে সমর্থন দিয়ে শক্তিশালী করে। ফলে পুরুষ আধিপত্যে যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়, তাকে আমি বলছি, রাজনৈতিক-যৌনসত্তা। রাজনৈতিক-যৌনসত্তা কি আবার উৎপাদন করে অর্থনৈতিক-যৌনসত্তা? এই যৌনসত্তার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী ধারণাগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোতে নারী নিরাপদ নয়।
তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে যৌনতার রাজনীতি কীভাবে সম্পর্কিত এবং কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাটি নির্মাণ করা হয়েছে-এই প্রশ্ন সুস্থ মানুষের তো বটেই, অতি অবশ্যই নারীদের বোঝা জরুরি।
নির্বাচনে বিএনপির বড় প্রতিপক্ষ ছিল জামায়াত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যারা মাঠে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা লাভ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপকমাত্রায়। এটা অবধারিতই ছিল। কারণ, শুধু শেখ হাসিনা নয়, ইতিহাসে যেকোনো ব্যবস্থা বদলের জন্য নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে দেখা হয়। ফলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেকোনো মূল্যে যেকোনো আন্দোলনকে সফল করতে নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে তোলার প্রয়াস চালায়। এ ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ক্ষমতাসীনের পরিচয় বদলের পর নারীর ওপর আবার আধিপত্য বিস্তারের উদাহরণগুলোতে।

প্রশ্ন হলো এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সংগ্রাম কি নারী করেছে, যা দিয়ে তারা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে? প্লেটোর ভালো রাজার ওপর নির্ভর করা ভালো রাষ্ট্রের ধারণার মতো নারীরা কি ভালো বাবা, ভাই বা জীবনসঙ্গী দিয়ে ভালো থাকার প্রয়াসেই সীমিত? যেকোনো গণআন্দোলনের সফলতা যদি নারীর অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে খোদ নারী তার নিজের জন্য ব্যবস্থার বদল ঘটাতে সক্ষম নয় কেন? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে, সমাজে যেকোনো ব্যবস্থার বদলের জন্য নারী-পুরুষের উভয়ের অংশগ্রহণ জরুরি। আর পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বদলের প্রশ্নে পুরুষ নারীর সাথে একমত নয়।
ইতিহাসের নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুরুষ একেবারেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদল চায় না, এ কথা বলা হয়তো যাবে না। কিন্তু বোঝা জরুরি যে, পুরুষদের একাংশ মাঝেমধ্যে বদলের দিকে এগোতে চাইলেও তা আসলে কত দূর পর্যন্ত? এই সংগ্রামের উদ্যোগ নারীদের দিক থেকে হয় না কেন? নারী যদি দুর্বল হয়, তাহলে দুর্বলকে প্রতিনিয়ত আক্রমণের মানসিকতা পুরুষের মধ্যে কীভাবে তৈরি হয়?
আক্রমণ আসে বিদ্বেষ থেকে। একটি ঘটনা, অন্যটি কারণ। লৈঙ্গিক প্রতিহিংসার কারণ কী? কখন এই প্রতিহিংসা বাড়ে? এই সকল প্রশ্ন উত্থাপন করছি, এড়িয়ে না গিয়ে সমাধানগুলো খোঁজার স্বার্থে। আবার এই প্রশ্নগুলোই সকল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারছে, তাও নয়। এখানে উপস্থিত সকলের কাছে আমি প্রত্যাশা করি, দ্রুত সমাধান খোঁজার চেয়ে মৌলিক অর্থে আমাদের আগে সংকটগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আর তারপর সমাধানের বাইনারি পথ না ধরে বহুমাত্রিক বাস্তবতার নিরিখে তা চিহ্নিত করা দরকার।
এখানে আমার দিক থেকে একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক পথ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। এ নিয়ে আলোচনায় এর দুর্বলতা যেমন, তেমনি নতুন সম্ভাবনার কথাও আশা করি উঠে আসবে।
গর্ভাশয় সূত্রেই নারী সৃষ্টিকে রক্ষা করে, লালন-পালন করে। শিক্ষা দেয়। মৌলিক অধিকারগুলো সংরক্ষণ করে নারী। শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্রের মতো বিষয় যতক্ষণ নারীর হাতে ছিল বা বলা যায় যতদিন বাণিজ্যিকীকরণ হয়নি, যতদিন এই বিষয়গুলো নারী লালন-পালন ও বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে, ততদিন এগুলো অধিকারের সীমানাকে গণ্য করেছে। সংসার ও অর্থ উপার্জনকে আলাদা করে দেখার সাথেও অন্দর-বাহির রাজনীতি ও বাণিজ্যিক ভাবনা বিস্তারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সাথে সংসার বিবর্জিত রাজনীতির সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, ততই শিক্ষা থেকে নারী বাদ পড়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষা মৌলিক অধিকারের তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে তা আবার পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই পণ্য যত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে গেছে, তত বেশি নারীর প্রতি বিদ্বেষ শক্তিশালী হয়েছে। কীভাবে?
নারী কেবল পণ্য হিসেবে গণ্য হয়েছে পুঁজিপতিদের (লক্ষ্যণীয় পুঁজিকন্যা নাই) হাতে। পুঁজিবাদের কোনো বৈশিষ্ট্যই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আবার এ প্রশ্নে ধর্ম ও পুঁজিবাদ চলে হাত ধরাধরি করে। পুঁজিবাদে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই পণ্যায়নের বিষয়টিকেই নিজেদের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রধান পুঁজি করে তোলে। আবার একইভাবে এই ধর্মীয় ব্যবস্থার ভয়কে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদ নারীকে পণ্য করে রাখে। আর এই দুই পিতৃব্য ব্যবস্থাই নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখে না। দেখে ঊন-মানুষ হিসেবে।
ঊন-মানুষ হিসেবে নারীকে দেখে বলেই পুঁজিপতি গার্মেন্টস মালিকরা কম মজুরিতে নারীদের গার্মেন্টসে চাকরি দেয়, দক্ষ ও মর্যাদার দিক বিবেচনা করে নয়।
অন্যদিকে ধর্মীয় ব্যবস্থা সরাসরি নারীকে ঊন/উপ/অধীনস্থ /আধা মানুষ হিসেবে সরাসরি ঘোষণা করে রেখেছে। এবং এই ঘোষণাকে মিথে রূপান্তরিত করেছে। মিথ যে ইতিহাসের প্রামাণ্যের চেয়ে শক্তিশালী, তা বোঝা যায় জেন্ডার প্রশ্নে।
তাই আগামীর বাংলাদেশ বা পৃথিবী নির্মাণে নারীকে শিক্ষায় হাত দিতে হবে। দুই ব্যবস্থার হাতে জিম্মি হওয়া শিক্ষাকে মানুষের স্বাভাবিক অধিকারের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ইতিহাস ও মিথকে পুনঃপাঠ ও পুনর্নির্মাণ করার ক্ষমতাই নারীকে মৌলিক অর্থে ক্ষমাতায়িত করবে। নিশ্চিতভাবেই এই সাংস্কৃতিক পাটাতন রাজনৈতিক-অর্থনীতির সাংস্কৃতিক পাটাতন রূপান্তরে ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, প্রাচ্যকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রথমেই বলে নিতে চাই এই লেখায় আমি কোনো সমাধান প্রস্তাব করার চেয়ে এই সময়ের প্রেক্ষাপটে সংকটগুলো চিহ্নিত করা জরুরি মনে করেছি। সংকটের উল্লেখমাত্র রয়েছে, বিস্তারিত আলোচনা লেখায় নেই।
৭ বছরের শিশুকে একলা, বাড়ি থেকে ঠান্ডা মাথায় বহু দূরে নিয়ে যায় বয়ঃপ্রাপ্ত এক পুরুষ। যৌন নির্যাতন শেষে গলা কেটে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শিশু বড় সজীব প্রাণ। সহজে নিস্তেজ হওয়া তাকে মানায় না। তবু ’ঠান্ডা গোশত’ প্রতিনিয়ত উৎপাদন করে যে সমাজ, সেখানে শিশু শেষ পর্যন্ত মৃত মাংসের দলা। শিশু অথবা এক নারী, যিনি শিক্ষক, যাকে এক কর্মচারী গলা কেটে মেরে ফেলে। এসব হত্যার গল্পের শেষ নেই। এসব ঘটনার মধ্যে একজন আক্রান্ত এবং অন্যজন আক্রমণকারী। উপরে উল্লেখ করা দুটি খবরের মধ্যে হত্যার পেছনের কার্যকারণে বলার চেষ্টা করা হয়েছে-পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে নাকি পরিবারের নারী শিশুটির যৌনাঙ্গকে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ প্রতিশোধের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। দ্বিতীয়টির কারণের মধ্যেও বলা হয়েছে বদলির জেরে নারী শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে।

যিনি শক্তিমান, তিনি আক্রমণ করেন। আর যিনি দুর্বল, তিনি আক্রান্ত হন। সর্বশক্তিমানের পূজা এই সমাজের নৈতিক শিক্ষার অংশ। তারই সমান্তরালে দেখা যায়, এখানে অনায়াসে প্রতিনিয়ত পুরুষ হয়ে ওঠে আক্রমণকারী, আর নারী কেবল আক্রান্ত সত্তা। এই আক্রান্ত হওয়ার যেমন কোনো বয়স নেই, তেমনি আক্রমণ করার জন্যও পুরুষের কোনো বয়স লাগে না।
প্রশ্ন হলো-পুরুষের এই লৈঙ্গিক সত্তাটির শক্তি কীভাবে উৎপাদিত হয়? এর জন্য কি শারীরিক শক্তিতে বলীয়ান পুরুষেরাই কেবল শারীরিক শক্তিতে দুর্বল নারীকে আক্রান্ত করে?
সমাজ নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয় ‘ছেলে’ হলে যেকোনো ছেলেশিশুই এই লৈঙ্গিক ক্ষমতা রপ্ত করতে শুরু করে জন্মের পর থেকেই। এই ক্ষমতা ছেলে শিশুকেও অনিরাপদ করে তোলে। শিশু অবস্থায় সে নিজে যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তাকে তা লুকিয়ে ফেলতে হয়। যেমনটা মেয়ে শিশুরাও রাখে আজীবন। তারপরও পুরুষের কাছে নারী ব্যাপক অর্থে অনিরাপদ।
প্রশ্ন আসে-ভিন্ন লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে নারী-পুরুষ কি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? এই সকল আক্রমণের পেছনে দেখানো কারণগুলোই কি যথাযথ কারণ? নাকি মানসিক দ্বেষ, রোষ বা বিদ্বেষ কাজ করে শুধু লৈঙ্গিক পরিচয় সূত্রে? এই দ্বেষ বা রোষ কেন এবং কীভাবে উৎপাদিত হয়? নাকি পৃথিবীর যেসকল জনগোষ্ঠীতে যৌন নির্যাতনের ইতিহাস নেই বা সীমিত, সে তুলনায় বাংলাদেশের পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা/চাহিদার গড় বেশি? নাকি এ দেশের পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা শরীরের চেয়ে মনে উৎপাদিত হয় বেশি? সামাজিক ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো ক্ষমতা উৎপাদন করে। এই ক্ষমতা ইচ্ছেমাফিক যেকোনো সিস্টেমকে সমর্থন দিয়ে শক্তিশালী করে। ফলে পুরুষ আধিপত্যে যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়, তাকে আমি বলছি, রাজনৈতিক-যৌনসত্তা। রাজনৈতিক-যৌনসত্তা কি আবার উৎপাদন করে অর্থনৈতিক-যৌনসত্তা? এই যৌনসত্তার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী ধারণাগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোতে নারী নিরাপদ নয়।
তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে যৌনতার রাজনীতি কীভাবে সম্পর্কিত এবং কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাটি নির্মাণ করা হয়েছে-এই প্রশ্ন সুস্থ মানুষের তো বটেই, অতি অবশ্যই নারীদের বোঝা জরুরি।
নির্বাচনে বিএনপির বড় প্রতিপক্ষ ছিল জামায়াত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যারা মাঠে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা লাভ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপকমাত্রায়। এটা অবধারিতই ছিল। কারণ, শুধু শেখ হাসিনা নয়, ইতিহাসে যেকোনো ব্যবস্থা বদলের জন্য নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে দেখা হয়। ফলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেকোনো মূল্যে যেকোনো আন্দোলনকে সফল করতে নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে তোলার প্রয়াস চালায়। এ ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ক্ষমতাসীনের পরিচয় বদলের পর নারীর ওপর আবার আধিপত্য বিস্তারের উদাহরণগুলোতে।

প্রশ্ন হলো এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সংগ্রাম কি নারী করেছে, যা দিয়ে তারা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে? প্লেটোর ভালো রাজার ওপর নির্ভর করা ভালো রাষ্ট্রের ধারণার মতো নারীরা কি ভালো বাবা, ভাই বা জীবনসঙ্গী দিয়ে ভালো থাকার প্রয়াসেই সীমিত? যেকোনো গণআন্দোলনের সফলতা যদি নারীর অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে খোদ নারী তার নিজের জন্য ব্যবস্থার বদল ঘটাতে সক্ষম নয় কেন? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে, সমাজে যেকোনো ব্যবস্থার বদলের জন্য নারী-পুরুষের উভয়ের অংশগ্রহণ জরুরি। আর পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বদলের প্রশ্নে পুরুষ নারীর সাথে একমত নয়।
ইতিহাসের নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুরুষ একেবারেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদল চায় না, এ কথা বলা হয়তো যাবে না। কিন্তু বোঝা জরুরি যে, পুরুষদের একাংশ মাঝেমধ্যে বদলের দিকে এগোতে চাইলেও তা আসলে কত দূর পর্যন্ত? এই সংগ্রামের উদ্যোগ নারীদের দিক থেকে হয় না কেন? নারী যদি দুর্বল হয়, তাহলে দুর্বলকে প্রতিনিয়ত আক্রমণের মানসিকতা পুরুষের মধ্যে কীভাবে তৈরি হয়?
আক্রমণ আসে বিদ্বেষ থেকে। একটি ঘটনা, অন্যটি কারণ। লৈঙ্গিক প্রতিহিংসার কারণ কী? কখন এই প্রতিহিংসা বাড়ে? এই সকল প্রশ্ন উত্থাপন করছি, এড়িয়ে না গিয়ে সমাধানগুলো খোঁজার স্বার্থে। আবার এই প্রশ্নগুলোই সকল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারছে, তাও নয়। এখানে উপস্থিত সকলের কাছে আমি প্রত্যাশা করি, দ্রুত সমাধান খোঁজার চেয়ে মৌলিক অর্থে আমাদের আগে সংকটগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আর তারপর সমাধানের বাইনারি পথ না ধরে বহুমাত্রিক বাস্তবতার নিরিখে তা চিহ্নিত করা দরকার।
এখানে আমার দিক থেকে একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক পথ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। এ নিয়ে আলোচনায় এর দুর্বলতা যেমন, তেমনি নতুন সম্ভাবনার কথাও আশা করি উঠে আসবে।
গর্ভাশয় সূত্রেই নারী সৃষ্টিকে রক্ষা করে, লালন-পালন করে। শিক্ষা দেয়। মৌলিক অধিকারগুলো সংরক্ষণ করে নারী। শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্রের মতো বিষয় যতক্ষণ নারীর হাতে ছিল বা বলা যায় যতদিন বাণিজ্যিকীকরণ হয়নি, যতদিন এই বিষয়গুলো নারী লালন-পালন ও বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে, ততদিন এগুলো অধিকারের সীমানাকে গণ্য করেছে। সংসার ও অর্থ উপার্জনকে আলাদা করে দেখার সাথেও অন্দর-বাহির রাজনীতি ও বাণিজ্যিক ভাবনা বিস্তারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সাথে সংসার বিবর্জিত রাজনীতির সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, ততই শিক্ষা থেকে নারী বাদ পড়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষা মৌলিক অধিকারের তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে তা আবার পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই পণ্য যত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে গেছে, তত বেশি নারীর প্রতি বিদ্বেষ শক্তিশালী হয়েছে। কীভাবে?
নারী কেবল পণ্য হিসেবে গণ্য হয়েছে পুঁজিপতিদের (লক্ষ্যণীয় পুঁজিকন্যা নাই) হাতে। পুঁজিবাদের কোনো বৈশিষ্ট্যই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আবার এ প্রশ্নে ধর্ম ও পুঁজিবাদ চলে হাত ধরাধরি করে। পুঁজিবাদে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই পণ্যায়নের বিষয়টিকেই নিজেদের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রধান পুঁজি করে তোলে। আবার একইভাবে এই ধর্মীয় ব্যবস্থার ভয়কে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদ নারীকে পণ্য করে রাখে। আর এই দুই পিতৃব্য ব্যবস্থাই নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখে না। দেখে ঊন-মানুষ হিসেবে।
ঊন-মানুষ হিসেবে নারীকে দেখে বলেই পুঁজিপতি গার্মেন্টস মালিকরা কম মজুরিতে নারীদের গার্মেন্টসে চাকরি দেয়, দক্ষ ও মর্যাদার দিক বিবেচনা করে নয়।
অন্যদিকে ধর্মীয় ব্যবস্থা সরাসরি নারীকে ঊন/উপ/অধীনস্থ /আধা মানুষ হিসেবে সরাসরি ঘোষণা করে রেখেছে। এবং এই ঘোষণাকে মিথে রূপান্তরিত করেছে। মিথ যে ইতিহাসের প্রামাণ্যের চেয়ে শক্তিশালী, তা বোঝা যায় জেন্ডার প্রশ্নে।
তাই আগামীর বাংলাদেশ বা পৃথিবী নির্মাণে নারীকে শিক্ষায় হাত দিতে হবে। দুই ব্যবস্থার হাতে জিম্মি হওয়া শিক্ষাকে মানুষের স্বাভাবিক অধিকারের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ইতিহাস ও মিথকে পুনঃপাঠ ও পুনর্নির্মাণ করার ক্ষমতাই নারীকে মৌলিক অর্থে ক্ষমাতায়িত করবে। নিশ্চিতভাবেই এই সাংস্কৃতিক পাটাতন রাজনৈতিক-অর্থনীতির সাংস্কৃতিক পাটাতন রূপান্তরে ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, প্রাচ্যকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সোমেন চন্দ। বাংলা সাহিত্যের তিন উদীয়মান তরুণ সাহিত্যিকের একজন। সুকান্ত কবি হিসেবে, সোমেনচন্দ আধুনিক কথাশিল্পের স্থপতি হিসেবে এবং খান মোহাম্মদ ফারাবী উভয়কে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই তিন সাহিত্যিকের কেউই ২২ বছরও বাঁচতে পারেননি। অর্থাৎ ২২ বছরের পূর্বে, ২১-এর ঘরে

পৃথিবীতে যেমন বিশুদ্ধ চাকুরি নেই, ঠিক তেমনি কেবলই ন্যায়ের পক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং যে যার ‘যুক্তি’ দাঁড় করিয়ে, চালায় সেই একবগ্গা নীতিই। এতে একসময়ের মনে হওয়া ‘ভালো’ ঢুকে যায় এমন ‘খারাপ’ দুনিয়ায়, যা এড়ানোই হয়তো ছিল উদ্দেশ্য। দিনশেষে দেখা যায়, আজকের কথিত মজলুম হয়ে উঠছে আগামীর জালিম। আর যে জাল