জাতীয় সংসদে মাইক্রোওয়েব ওভেন বা মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন নিয়ে গত দুদিন বেশ আলোচনা হলো। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান আইনপ্রণেতাদের সরকারি ফ্ল্যাটে মাইক্রোওভেন এবং ওয়াশিং মেশিন চেয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। এর এক দিন পর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ জামায়াতের ওই সংসদ সদস্যকে নিজের পক্ষ থেকে মাইক্রোওভেন দিতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন ওয়াশিং মেশিন দিতে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমানও কথা বলেন। তা নিয়ে গণমাধ্যমে লিখিত প্রতিবেদন, ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।
মূল আলোচনাটা উঠেছিল গত বুধবার। ওই দিন বাজেট আলোচনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার জানালা-দরজার পর্দাটি এখনো পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম যে আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন এবং ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
তার এই বক্তব্য নিয়ে ট্রল হয়। হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণ, একজন সাধারণ মানুষের বদলে যখন রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন নিয়ে বাজেট আলোচনায় দাবি তোলেন, তখন প্রশ্ন উঠবেই। বিষয়টি নিয়ে একটু পরে বিস্তারে বলা হবে।
তার আগে দেখা যাক, একজন সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্র কী কী সুবিধা দেয়।
জাতীয় সংসদের একজন সদস্য মাসিক সম্মানীসহ নানা ভাতা পেয়ে থাকেন। ১৯৭৩ সালের একটি আইনের আওতায় তাদের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই আইন সংশোধন করে তাদের সম্মানী ও ভাতা বাড়ানো হয়েছে।
আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা মাসে ৫৫ হাজার টাকা হারে সম্মানী পান। পুরো দায়িত্বকালে এই সম্মানী পান তারা।
নির্বাচনী এলাকায় কাজ পরিচালনা, জনসংযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতার জন্য সংসদ সদস্যরা মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা পান। অতিথি আপ্যায়ন, সামাজিক যোগাযোগের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা আছে।
একজন সংসদ সদস্য যাতায়াত, জ্বালানি, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতন ইত্যাদির জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান। নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে সংসদ সদস্যরা দেড় হাজার টাকা লন্ড্রি ভাতা এবং রান্নার সরঞ্জাম, লিনেন, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ৬ হাজার টাকা পান।
সংসদ অধিবেশন বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে বিমান/রেল/জাহাজে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা এবং সড়কপথে ভ্রমণে কিলোমিটারপ্রতি ১০ টাকা হারে ভাতা পান একজন সংসদ সদস্য। সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির বৈঠকের জন্য দৈনিক ভাতা ৭৫০ টাকা এবং যাতায়াত বাবদ ভাতা ৭৫ থেকে ২০০ টাকা (উপস্থিতি রেকর্ডভিত্তিক) পান। একজন সংসদ সদস্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা অথবা সমপরিমাণের নন-ট্রান্সফারেবল ট্রাভেল পাস পান। সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সমান চিকিৎসা সুবিধা এবং মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ এবং কল ও ভাড়া বাবদ মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা পান। দায়িত্বকালীন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা পান। জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পান। এসব ভাতা আয়করমুক্ত। একজন সংসদ সদস্য প্রতি মাসে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মতো সম্মানী পান। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাসে ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি। ন্যূনতম এই আয়কে বিবেচনায় নিলে বার্ষিক যে আয়সীমা দাঁড়ায় তা করের আওতামুক্ত। সংসদ সদস্যদের বার্ষিক সম্মানী ২০ লাখ টাকার বেশি। যা অন্য যেকোনো সাধারণ মানুষের হলে চলতি বাজেটে ২৫ শতাংশ হারে করের আওতাভুক্ত। অথচ সংসদ সদস্যরা এই সম্মানীর ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা পান। একজন সাধারণ মানুষ যদি তার জীবনযাপনের জন্য মাইক্রোওভেন বা ওয়াশিং মেশিন কিনতে চান তাহলে তাকে নিজের আয় থেকেই কিনতে হবে। আবার বছর শেষে আয়করও দিতে হবে। অথচ একজন সংসদ সদস্য করমুক্ত সম্মানীর পাওয়ার পরেও সরকারিভাবে মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং তো বটেই, পর্দাও চাইছেন।
আগে একজন সংসদ সদস্য দায়িত্বকালীন একটি গাড়ি/জিপ/মাইক্রোবাস; কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, ডেভেলপমেন্ট সারচার্জ ও আমদানি পারমিট ফি ছাড়া আমদানির সুযোগ পেতেন। বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়। তবে এই সংসদেই কোনো কোনো সংসদ সদস্য সরকারি গাড়িও চেয়েছেন।
সংসদ সদস্যদের এত সুবিধা কেন দেওয়া হয়? এর পেছনের কারণ কী? কারণ হলো, একজন সংসদ সদস্য হলেন রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা। সংসদে বসেই ঠিক হয় রাষ্ট্র কোন কোন আইন অনুযায়ী চলবে। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ হয় আইনসভায়। সেই কাজে একজন আইনপ্রণেতাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুবিধা দেওয়া হয়, যাতে তিনি নিজের এলাকার জনগণ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কাজটা ঠিকঠাক করতে পারেন। তাকে যেন একজন সাধারণ মানুষের মতো করে নিজের সংস্থান নিয়ে ভাবতে না হয়। সেজন্য সরকারিভাবে একটি ফ্ল্যাটও বরাদ্দ পান তিনি। সেই ফ্ল্যাটের আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই দেওয়া হয়, বা তার জন্য বরাদ্দ থাকে।
সংসদের ফ্ল্যাট-অফিস বরাদ্দসহ নানা আনুষঙ্গিক বিষয় দেখভাল করে ‘সংসদ কমিটি’। এই কমিটির সভাপতি থাকেন চিফ হুইপ। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এই কমিটির কথা স্মরণও করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াতের ওই সংসদ সদস্য বাজেট অধিবেশনে না বলে ওই কমিটিতে তার দাবি তুলে ধরলেও পারতেন। তবে সংসদে কথা তোলা ‘গর্হিত’ নয় বলে উল্লেখ করেছেন স্পিকার।
মনে থাকার কথা গত এপ্রিল মাসে সংসদ অধিবেশনে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারি গাড়ি চেয়েছিলেন। তা নিয়ে হাস্যরসও হয়েছিল।
হাসনাত বলেছিলেন, প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের জন্য সরকারি গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় ভাড়ায় গাড়ি চালিয়ে নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত করতে হয়, যা লোকলজ্জার কারণে কাউকে বলাও যায় না। মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ আরও সহজ করতে সরকারের কাছে একটি গাড়ির সুব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
এ নিয়ে সেদিন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও কথা বলেছিলেন। কথা বলেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের জন্য আলাদা কোনো বিলাসিতা বা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা না নেওয়ার ব্যাপারে শুরুতেই অনুশাসন দিয়েছেন। তবে হাসনাত আবদুল্লাহর দাবির বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো বিহিত ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান একটু হাস্যরস করে বলেছিলেন, ছোটদের আবদারে সবসময় ‘না’ বলতে নেই। হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো তরুণ সংসদ সদস্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত নেতিবাচক উত্তর না দিয়ে এটি বিবেচনার আশ্বাস দিলে তিনি আরও খুশি হতেন।
আন্দালিব রহমান পার্থ কেন জামায়াতের ওই সদস্য নিয়ে কথা তুললেন? কারণ, তার কাছে মনে হয়েছে সংসদে মাইক্রোভেন, ওয়াশিং মেশিন, পর্দা ইত্যাদি নিয়ে কথা তোলা আইনসভার জন্য ‘লজ্জার’। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তিনিও লজ্জিত হয়েছেন নিশ্চয়।
ভাববার মতো বিষয় হচ্ছে, জামায়াতের ওই সংসদ সদস্য বাজেট আলোচনায় কথাগুলো তুলেছেন। এবং যুক্তি দিয়েছেন, এই সংসদে সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে; কিন্তু তিনি বা তারা ফ্ল্যাটের পর্দা পাননি। তিনি ‘শুনেছিলেন’ ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার কথা। সেটাও পাননি। সমস্যা এই যুক্তিতে।
বাজেট অর্থ, বাজেটে কী থাকে, কেন থাকে এসব কথা এখানে তোলা বাহুল্য। তবে বাজেট আলোচনা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাব করেন। তার সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে দরকার হয় সংসদের অনুমোদন। অর্থাৎ, আইনসভার সায় না পেলে নির্বাহী বিভাগের খরচ করার কোনো স্বাধীনতা থাকে না। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে কাটছাঁট করার ক্ষমতা একমাত্র সংসদের। বাজেট প্রস্তাবের পর তা নিয়ে আলোচনার মূল জায়গা হচ্ছে–সরকারের আর্থিক প্রস্তাব ও নীতি জবাবদিহির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একজন সংসদ সদস্য জনগণের সুবিধা-অসুবিধার কথা আইনসভায় তুলে ধরে সরকারি প্রস্তাবের ওপর নিজের মতামত দেবেন। তিনি কর প্রস্তাব সংশোধনের কথাও তুলে ধরবেন। প্রয়োজন মনে না করলে তুলবেন না।
কিন্তু, সংসদ যেহেতু বাজেট অনুমোদন দিচ্ছে, সেজন্য সংসদ সদস্য তার নিজের জন্য (এবং সকল সংসদ সদস্যের জন্য) ঘরের ব্যবহার্য জিনিস দাবি করলেন। এটা ‘গর্হিত’ নয় হয়তো। কিন্তু কতটা নৈতিক? সংসদে এ নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তার দলের সংসদ সদস্য নিজের জন্য চাননি। সকল সংসদ সদস্যের জন্য চেয়েছেন। এখানে হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়ার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। একটু উপরেই সেটা লেখা হয়েছে।
নিজের দল ও জোটের সংসদ সদস্যদের এসব চাহিদার প্রেক্ষাপটে যে যুক্তি বিরোধীদলীয় নেতা দিচ্ছে, সেটা কি নৈতিক? নৈতিকতার মানদণ্ড সবার কাছে এক নয়, এটাও ঠিক। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যখন, তার প্রতিদিনের জীবনে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দ্রব্যমূল্য নিয়ে চিন্তিত। বাসাভাড়া নিয়ে চিন্তিত। বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম নিয়ে চিন্তিত। মানুষ আশা করছে, সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা হবে। তার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তারই সমস্যা নিয়ে সংসদের ফ্লোরে কথা বলবেন। সেই কথা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসী শুনবে। কিন্তু তার জায়গায়, দেশ দেখল, সম্পূরক বাজেট পাস করার যুক্তিকে একজন সংসদ সদস্য নিজের জন্য জিনিসপত্র চাইলেন। আর তার নেতা যুক্তি দিলেন দলের ওই সংসদ সদস্য সবার জন্য চেয়েছেন। যে ‘লজ্জা’ আরেকজন সংসদ সদস্য পেয়েছেন, জনগণ সেই লজ্জা পেয়েছে কি না, তা জানতে হলে হয়তো সমাজ গবেষণার পদ্ধতি মেনে জরিপ করতে হবে। কিন্তু নৈতিকতা কোন জরিপে মাপা হবে?
জাতীয় সংসদের অধিবেশন। ছবি: বাসস
জাতীয় সংসদে মাইক্রোওয়েব ওভেন বা মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন নিয়ে গত দুদিন বেশ আলোচনা হলো। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান আইনপ্রণেতাদের সরকারি ফ্ল্যাটে মাইক্রোওভেন এবং ওয়াশিং মেশিন চেয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। এর এক দিন পর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ জামায়াতের ওই সংসদ সদস্যকে নিজের পক্ষ থেকে মাইক্রোওভেন দিতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন ওয়াশিং মেশিন দিতে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমানও কথা বলেন। তা নিয়ে গণমাধ্যমে লিখিত প্রতিবেদন, ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।
মূল আলোচনাটা উঠেছিল গত বুধবার। ওই দিন বাজেট আলোচনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার জানালা-দরজার পর্দাটি এখনো পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম যে আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন এবং ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
তার এই বক্তব্য নিয়ে ট্রল হয়। হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণ, একজন সাধারণ মানুষের বদলে যখন রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন নিয়ে বাজেট আলোচনায় দাবি তোলেন, তখন প্রশ্ন উঠবেই। বিষয়টি নিয়ে একটু পরে বিস্তারে বলা হবে।
তার আগে দেখা যাক, একজন সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্র কী কী সুবিধা দেয়।
জাতীয় সংসদের একজন সদস্য মাসিক সম্মানীসহ নানা ভাতা পেয়ে থাকেন। ১৯৭৩ সালের একটি আইনের আওতায় তাদের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই আইন সংশোধন করে তাদের সম্মানী ও ভাতা বাড়ানো হয়েছে।
আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা মাসে ৫৫ হাজার টাকা হারে সম্মানী পান। পুরো দায়িত্বকালে এই সম্মানী পান তারা।
নির্বাচনী এলাকায় কাজ পরিচালনা, জনসংযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতার জন্য সংসদ সদস্যরা মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা পান। অতিথি আপ্যায়ন, সামাজিক যোগাযোগের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা আছে।
একজন সংসদ সদস্য যাতায়াত, জ্বালানি, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতন ইত্যাদির জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান। নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে সংসদ সদস্যরা দেড় হাজার টাকা লন্ড্রি ভাতা এবং রান্নার সরঞ্জাম, লিনেন, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ৬ হাজার টাকা পান।
সংসদ অধিবেশন বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে বিমান/রেল/জাহাজে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা এবং সড়কপথে ভ্রমণে কিলোমিটারপ্রতি ১০ টাকা হারে ভাতা পান একজন সংসদ সদস্য। সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির বৈঠকের জন্য দৈনিক ভাতা ৭৫০ টাকা এবং যাতায়াত বাবদ ভাতা ৭৫ থেকে ২০০ টাকা (উপস্থিতি রেকর্ডভিত্তিক) পান। একজন সংসদ সদস্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা অথবা সমপরিমাণের নন-ট্রান্সফারেবল ট্রাভেল পাস পান। সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সমান চিকিৎসা সুবিধা এবং মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ এবং কল ও ভাড়া বাবদ মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা পান। দায়িত্বকালীন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা পান। জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পান। এসব ভাতা আয়করমুক্ত। একজন সংসদ সদস্য প্রতি মাসে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মতো সম্মানী পান। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাসে ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি। ন্যূনতম এই আয়কে বিবেচনায় নিলে বার্ষিক যে আয়সীমা দাঁড়ায় তা করের আওতামুক্ত। সংসদ সদস্যদের বার্ষিক সম্মানী ২০ লাখ টাকার বেশি। যা অন্য যেকোনো সাধারণ মানুষের হলে চলতি বাজেটে ২৫ শতাংশ হারে করের আওতাভুক্ত। অথচ সংসদ সদস্যরা এই সম্মানীর ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা পান। একজন সাধারণ মানুষ যদি তার জীবনযাপনের জন্য মাইক্রোওভেন বা ওয়াশিং মেশিন কিনতে চান তাহলে তাকে নিজের আয় থেকেই কিনতে হবে। আবার বছর শেষে আয়করও দিতে হবে। অথচ একজন সংসদ সদস্য করমুক্ত সম্মানীর পাওয়ার পরেও সরকারিভাবে মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং তো বটেই, পর্দাও চাইছেন।
আগে একজন সংসদ সদস্য দায়িত্বকালীন একটি গাড়ি/জিপ/মাইক্রোবাস; কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, ডেভেলপমেন্ট সারচার্জ ও আমদানি পারমিট ফি ছাড়া আমদানির সুযোগ পেতেন। বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়। তবে এই সংসদেই কোনো কোনো সংসদ সদস্য সরকারি গাড়িও চেয়েছেন।
সংসদ সদস্যদের এত সুবিধা কেন দেওয়া হয়? এর পেছনের কারণ কী? কারণ হলো, একজন সংসদ সদস্য হলেন রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা। সংসদে বসেই ঠিক হয় রাষ্ট্র কোন কোন আইন অনুযায়ী চলবে। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ হয় আইনসভায়। সেই কাজে একজন আইনপ্রণেতাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুবিধা দেওয়া হয়, যাতে তিনি নিজের এলাকার জনগণ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কাজটা ঠিকঠাক করতে পারেন। তাকে যেন একজন সাধারণ মানুষের মতো করে নিজের সংস্থান নিয়ে ভাবতে না হয়। সেজন্য সরকারিভাবে একটি ফ্ল্যাটও বরাদ্দ পান তিনি। সেই ফ্ল্যাটের আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই দেওয়া হয়, বা তার জন্য বরাদ্দ থাকে।
সংসদের ফ্ল্যাট-অফিস বরাদ্দসহ নানা আনুষঙ্গিক বিষয় দেখভাল করে ‘সংসদ কমিটি’। এই কমিটির সভাপতি থাকেন চিফ হুইপ। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এই কমিটির কথা স্মরণও করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াতের ওই সংসদ সদস্য বাজেট অধিবেশনে না বলে ওই কমিটিতে তার দাবি তুলে ধরলেও পারতেন। তবে সংসদে কথা তোলা ‘গর্হিত’ নয় বলে উল্লেখ করেছেন স্পিকার।
মনে থাকার কথা গত এপ্রিল মাসে সংসদ অধিবেশনে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারি গাড়ি চেয়েছিলেন। তা নিয়ে হাস্যরসও হয়েছিল।
হাসনাত বলেছিলেন, প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের জন্য সরকারি গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় ভাড়ায় গাড়ি চালিয়ে নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত করতে হয়, যা লোকলজ্জার কারণে কাউকে বলাও যায় না। মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ আরও সহজ করতে সরকারের কাছে একটি গাড়ির সুব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
এ নিয়ে সেদিন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও কথা বলেছিলেন। কথা বলেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের জন্য আলাদা কোনো বিলাসিতা বা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা না নেওয়ার ব্যাপারে শুরুতেই অনুশাসন দিয়েছেন। তবে হাসনাত আবদুল্লাহর দাবির বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো বিহিত ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান একটু হাস্যরস করে বলেছিলেন, ছোটদের আবদারে সবসময় ‘না’ বলতে নেই। হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো তরুণ সংসদ সদস্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত নেতিবাচক উত্তর না দিয়ে এটি বিবেচনার আশ্বাস দিলে তিনি আরও খুশি হতেন।
আন্দালিব রহমান পার্থ কেন জামায়াতের ওই সদস্য নিয়ে কথা তুললেন? কারণ, তার কাছে মনে হয়েছে সংসদে মাইক্রোভেন, ওয়াশিং মেশিন, পর্দা ইত্যাদি নিয়ে কথা তোলা আইনসভার জন্য ‘লজ্জার’। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তিনিও লজ্জিত হয়েছেন নিশ্চয়।
ভাববার মতো বিষয় হচ্ছে, জামায়াতের ওই সংসদ সদস্য বাজেট আলোচনায় কথাগুলো তুলেছেন। এবং যুক্তি দিয়েছেন, এই সংসদে সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে; কিন্তু তিনি বা তারা ফ্ল্যাটের পর্দা পাননি। তিনি ‘শুনেছিলেন’ ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার কথা। সেটাও পাননি। সমস্যা এই যুক্তিতে।
বাজেট অর্থ, বাজেটে কী থাকে, কেন থাকে এসব কথা এখানে তোলা বাহুল্য। তবে বাজেট আলোচনা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাব করেন। তার সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে দরকার হয় সংসদের অনুমোদন। অর্থাৎ, আইনসভার সায় না পেলে নির্বাহী বিভাগের খরচ করার কোনো স্বাধীনতা থাকে না। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে কাটছাঁট করার ক্ষমতা একমাত্র সংসদের। বাজেট প্রস্তাবের পর তা নিয়ে আলোচনার মূল জায়গা হচ্ছে–সরকারের আর্থিক প্রস্তাব ও নীতি জবাবদিহির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একজন সংসদ সদস্য জনগণের সুবিধা-অসুবিধার কথা আইনসভায় তুলে ধরে সরকারি প্রস্তাবের ওপর নিজের মতামত দেবেন। তিনি কর প্রস্তাব সংশোধনের কথাও তুলে ধরবেন। প্রয়োজন মনে না করলে তুলবেন না।
কিন্তু, সংসদ যেহেতু বাজেট অনুমোদন দিচ্ছে, সেজন্য সংসদ সদস্য তার নিজের জন্য (এবং সকল সংসদ সদস্যের জন্য) ঘরের ব্যবহার্য জিনিস দাবি করলেন। এটা ‘গর্হিত’ নয় হয়তো। কিন্তু কতটা নৈতিক? সংসদে এ নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তার দলের সংসদ সদস্য নিজের জন্য চাননি। সকল সংসদ সদস্যের জন্য চেয়েছেন। এখানে হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়ার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। একটু উপরেই সেটা লেখা হয়েছে।
নিজের দল ও জোটের সংসদ সদস্যদের এসব চাহিদার প্রেক্ষাপটে যে যুক্তি বিরোধীদলীয় নেতা দিচ্ছে, সেটা কি নৈতিক? নৈতিকতার মানদণ্ড সবার কাছে এক নয়, এটাও ঠিক। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যখন, তার প্রতিদিনের জীবনে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দ্রব্যমূল্য নিয়ে চিন্তিত। বাসাভাড়া নিয়ে চিন্তিত। বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম নিয়ে চিন্তিত। মানুষ আশা করছে, সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা হবে। তার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তারই সমস্যা নিয়ে সংসদের ফ্লোরে কথা বলবেন। সেই কথা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসী শুনবে। কিন্তু তার জায়গায়, দেশ দেখল, সম্পূরক বাজেট পাস করার যুক্তিকে একজন সংসদ সদস্য নিজের জন্য জিনিসপত্র চাইলেন। আর তার নেতা যুক্তি দিলেন দলের ওই সংসদ সদস্য সবার জন্য চেয়েছেন। যে ‘লজ্জা’ আরেকজন সংসদ সদস্য পেয়েছেন, জনগণ সেই লজ্জা পেয়েছে কি না, তা জানতে হলে হয়তো সমাজ গবেষণার পদ্ধতি মেনে জরিপ করতে হবে। কিন্তু নৈতিকতা কোন জরিপে মাপা হবে?