Advertisement Banner

ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি অর্থবহ এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানমূলক সম্পর্কের আশায় অনড় রয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত বছরের বেশিরভাগ সময়েই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কে ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ নিযুক্ত দেশটির ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো সম্পর্কের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

তারেক রহমানের সরকার ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাকে তলব করল। এর আগে গত মাসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও কথিত অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিতর্কিত দাবি করেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পাওয়ান বঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।

গত রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে জাহেদ উর রহমান দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। কিন্তু ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

জাহেদ উর রহমানের দাবি, তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। পরে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, দিল্লির উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের পরই এই অনুমতি মেলে। তবে অনুমতি পাওয়ার পরও জাহেদ উর রহমান ঘটনাটির প্রতিবাদ হিসেবে ঢাকা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ‘অপমানজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

পরে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে কোনো ‘খারাপ আচরণ’ বা ‘হয়রানি’ করেনি, তবে ঘটনাটিকে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ বলে উল্লেখ করেন।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জাহেদ উর রহমানের ঘটনাটি নিয়ে ভারত সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। তবে ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রশাসনিক ভুলের কারণে জাহেদ উর রহমানের নাম অভিবাসন বিভাগের নজরদারি তালিকায় চলে এসেছিল। পরে বিষয়টি শনাক্ত করে সমাধান করা হয়।

এছাড়া ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদলে সার্ক স্টিকার লাগানো ব্যক্তিগত পাসপোর্টে ব্যবহার করে ভ্রমণ করছিলেন, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং বিলম্বের কারণ হয়।

জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যকে কেবল উসকানিমূলক মন্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে। তবে ঘটনাটি হয়তো দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিরোধের কারণ হবে না, কিন্তু এটি বাংলাদেশে বিদ্যমান ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে।

এরই মধ্যে দেশের প্রভাবশালী কয়েকটি পত্রিকা ভারতকে ‘সন্তোষজনক ব্যাখ্যা’ দিতে এবং ‘প্রটোকল মানতে ব্যর্থতার’ কথা স্বীকার করতে বলেছে।

এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একটি বক্তব্যকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি বলেছিলেন, “ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা।”

বাংলাদেশে অনেকেই এই বক্তব্যকে ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। যদিও বক্তব্যটি মূলত দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার কথা বোঝাতে দেওয়া হয়েছিল, তবু জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলে এবং সরকারের কাছে তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়ার দাবি জানায়।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশে অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশিদের ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। ভারত একে ‘পুশ-ব্যাক’ বলে উল্লেখ করে। ঢাকা বিষয়টিকে মানবিক ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হিসেবে দেখছে।

চলতি বছরের জুনে দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হলেও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়ে গেছে। জাহেদ উর রহমানের ঘটনাটি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কথাও সামনে এনেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, “আমার মনে হয়েছে, একটা বার্তা এই দেশ ও এই দেশের বাইরে যাওয়া দরকার যে, এটা শেখ হাসিনার সরকার না। এটা জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার।”

যদিও বিএনপির কয়েকজন নেতা আশ্বস্ত করেছেন যে হাসিনার ভারতে থাকা দুই দেশের সম্পর্কের পথে বাধা হবে না। কিন্তু বিষয়টি এখনো ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতও সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণ এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদযাপনে ভারতীয় কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ তারই উদাহরণ। এমনকি দুই দেশের খাবারের ঐতিহ্যকে সামনে এনে ‘গোলগাপ্পা কূটনীতি’র কথাও বলা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপে বোঝা যায়, দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে আগ্রহী। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী।

তবে বেশ কিছু জটিল সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। ভারত এখনো বাংলাদেশি পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুরোপুরি চালু করেনি, বাজারে প্রবেশের কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে নেয়নি এবং বাংলাদেশে পূর্ণমাত্রায় ভিসা কার্যক্রমও পুনরায় শুরু করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।

india
india

ঢাকায় নতুন সরকার আসার পরও এসব ব্যবস্থা তুলে নিতে ভারতের বিলম্ব বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিল্লি যত দেরি করবে, দুই দেশের দূরত্ব ততই বাড়বে।

এদিকে ঢাকায় ভারতের প্রভাব কমে যাওয়ায় চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বাংলাদেশের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। তা না হলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্ব আরও কমে যেতে পারে।

আগামী সপ্তাহে তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যাচ্ছেন। কিন্তু ভারত সফর এখনো অনিশ্চিত। ফলে তার আগে চীন সফরের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকের কাছে এটি ঢাকা আসলে কোন দিকে ঝুঁকছে, তা বোঝানোর বার্তা।

(লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত)

লেখক: নয়াদিল্লিভিত্তিক একজন স্বতন্ত্র গবেষক এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট।

সম্পর্কিত