নির্বাচন: তারপর কী হবে…

খায়রুল আনোয়ার
খায়রুল আনোয়ার
নির্বাচন: তারপর কী হবে…
ছবি: সংগৃহীত

দেশের মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারি কেমন নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে? বহুল প্রত্যাশিত ও প্রতিক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন হবে? ১২ কোটি ৭৭ লাখেরও বেশি ভোটার কি নির্বিঘ্নে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? ভোটের দিনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে এখনো একধরনের শঙ্কা রয়েছে। এরইমধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা এবং গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়ে আছে। নির্বাচনের পরের পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়েও রয়েছে উৎকণ্ঠা।

এবার নির্বাচনের ফল ঘোষণায় দেরি হবে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের এমন বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এর আগে কোনো নির্বাচনে ফল ঘোষণা করতে এত সময় লাগেনি। এছাড়া ফল ঘোষণার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। প্রেস সচিব কী করে এ নিয়ে কথা বলেন, এরইমধ্যে সে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে পোস্টাল ব্যালট ঘিরে এক প্রস্থ বিতর্ক হয়ে গেছে। নির্বাচন কতখানি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ ওঠে কিনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নির্বাচনের ফল মেনে নেয় কিনা– এসব বিষয় এখন সামনে চলে এসেছে।

গণপরিষদের সংবিধান সংশোধনে ১৮০ দিনের বিষয়টিও নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব ঘটায় কিনা– এ নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন। নির্বাচনের দিন এবং তারপরের কয়েকদিনের পরিস্থিতি সব জল্পনা ও গুঞ্জনের অবসান ঘটাতে পারে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে ভোটার ও দেশের মানুষের একটিই চাওয়া, ইতিহাসের সেরা না হোক, অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেন হয়। যার উদাহরণ ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনটি একতরফা, কলঙ্কিত ও জালিয়াতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা দেশে ফ্যাসিবাদি শাসন কায়েম করেছিল। শিক্ষার্থী-জনতার রক্তঝরানো অভ্যুত্থানের পর এখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সহিংসতামুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও বিপুল ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভোট হলে আবার গণতন্ত্রের অভিযাত্রার সূচনা হতে পারে। একইসঙ্গে দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এ দেশে বারবার রক্ত ঝরেছে। মানুষ আর হানাহানি ও রক্তপাত চায় না। কবি শামসুর রহমানের কবিতার পংক্তি স্মরণ করে বলতে হয়, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেব।’

এবারের ভোটের লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের মাঠে নেই। আওয়ামী লীগ না থাকায় নির্বাচন অন্তর্ভূক্তিমূলক হবে না, এমনটা মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি। বিভিন্ন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, একটি বড় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ উপেক্ষা করা হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ৭ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়। সিপিডির মতে, একটি বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে সব প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ এবং তাদের সমর্থক ভোটারদের অন্তর্ভূক্ত করা জরুরি।

বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হতে ক্লান্তিহীনভাবে প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দলের দুই শীর্ষ নেতা কখনো কখনো রীতিমত বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। কথার পিঠে কথা দিয়ে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলেছে। নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার অভিযান শুরু হলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। একজন সিলেট বিভাগে ছুটেছেন তো, আর একজন ছুটেছেন রংপুর বিভাগে। প্রচার অভিযানের শেষ সময় পর্যন্ত তারা কাজে লাগাচ্ছেন। এরইমধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগের সমর্থক-কর্মীদের ভোট টানার লক্ষ্যে নানা কৌশল নিচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। যদিও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-সমর্থক ‘নো বোট, নো ভোট’ অর্থাৎ নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে বিভিন্ন আসনে বিএনপি ও জামায়াতের অনেক প্রার্থী কোথাও প্রত্যক্ষভাবে, আবার কোথাও পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের ভোটারদের যে বিশেষভাবে ‘টার্গেট’ করা করা হয়েছে তার উদাহরণ হচ্ছে, বিএনপি এবং জামায়াত তাদের ইশতেহারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে। দল দুটির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, এই কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংগঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সত্যতা উদঘাটন করা হবে। দল দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুশোচনা প্রকাশের বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে। দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মী সমর্থকদের যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নেই, তাদের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দিয়ে অতীতের ক্ষত নিষ্পত্তি করা হবে। তবে আওয়ামী লীগের যে সকল নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তারা এই সুযোগ পাবেন না (সমকাল, ৭ ফেব্রুয়ারি)।

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে অসংখ্য অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি লিপিবদ্ধ করেছে। ক্ষমতায় গেলে এর কতগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো অসংখ্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার প্রকাশ করে। সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর দেখা যায়, এর অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে কিছু কিছু যে বাস্তবায়ন হয় না তা বলা যাবে না। ইশতেহারের অধিকাংশ অঙ্গীকার কথামালার রাজনীতি হয়ে ওঠে। আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, জবাবদিহিতা– এসব বিষয় উপেক্ষিতই থেকে যায়।

গত ৫৫ বছরে রাজনৈতিক দলগুলো যারা বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থেকেছে তারা গণতন্ত্রকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শাসক দলের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে কখনো সামরিক শাসন, কখনো সেনা সমর্থিত শাসন, সবশেষে ফ্যাসিবাদি শাসন কায়েম হয়েছে। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন রাজনীতিতে প্রথম বিপর্যয় ডেকে আনে। মাঝে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। পরবর্তীতে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। আর এর ফলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে পরিণত করা হয় এক কলঙ্কিত অধ্যায়।

পরপর তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর এবার দলীয় সরকারের বাইরে গিয়ে সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে অন্তবর্তী সরকারের অধীনে। আবার সুযোগ এসেছে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোটের মাধ্যমে একটি সরকার বেছে নেওয়ার। তবে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত জনগণের এক ধরনের শঙ্কা, সংশয় বিরাজ করবে। প্রধান উপদেষ্টা আগামী এক সপ্তাহকে ‘খুবই ক্রুশিয়াল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে শনিবার উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তিনি এমনটি বলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “এখন পর্যন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা।”

প্রধান উপদেষ্টা এই চ্যালেঞ্জ সফলতার সঙ্গে উতরে যাবেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এটাই প্রত্যাশিত। এর বিকল্প সামনে আর কিছু নেই। ১২ ফেব্রুয়ারি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে, আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ বারবার হোঁচট খেয়েছে। মাঝের কয়েকটি বছর বাদ দিলে ৫৫ বছরের ইতিহাসে দেশ সংঘাতপূর্ণ সময় অতিবাহিত করেছে। বারবার রক্ত ঝরেছে, দেশের দুজন রাষ্ট্রপতি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সংঘটিত হয়েছে দুটি গণঅভ্যুত্থান। এবারে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ হাতছাড়া হলে দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা– সবদিক থেকে বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়বে। মানুষের প্রত্যাশা, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

লেখক: কলাম লেখক

সম্পর্কিত