দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি হয়েছে। এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান; প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করছে, ফলে মাসিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের তেল আয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে ইরান। পরিস্থিতিতে এক মৌলিক পরিবর্তন এসেছে—এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নয়, বরং হরমুজ প্রণালী।
ইসরায়েল-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ৩৯ দিনে ৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ বহু শীর্ষ ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং ধ্বংসাত্মক সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে।
২০২৫ সালের জুনে, যখন ইরান বড় ধরনের ছাড় দিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হচ্ছিল, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ বোমাবর্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ট্রাম্প বোমাবর্ষণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানও ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করে। আট মাস পরে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ওমান ঘোষণা করে—ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ফিরতে সম্মত হয়েছে। এটি ২০১৫ সালের জেসিপিওএ চুক্তির চেয়েও উন্নত একটি প্রস্তাব ছিল, যে চুক্তিতে ইরান, ওবামা প্রশাসন এবং প্রধান বিশ্বশক্তিগুলো সম্মত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই জেসিপিওএ বাতিল করে ইরানের কাছ থেকে আরও ভালো চুক্তি দাবি করেছিলেন, যদিও বিশ্বের বহু বিশেষজ্ঞ—এমনকি কিছু ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞও—চুক্তিটিকে কার্যকর বলে স্বীকার করেছিলেন।
ফেব্রুয়ারি ২৭-এর সমঝোতায় ইরানের বড় ধরনের ছাড় সত্ত্বেও, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে উপেক্ষা করে নির্বিচারে ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে।
এত ব্যয়বহুল ও আত্মঘাতী প্রকল্প গ্রহণের কারণ বোঝা কঠিন নয়। সামরিক-শিল্প জোটের প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ, এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বাড়াতে সংকটকে কাজে লাগানোর ইসরায়েলের প্রবণতা—এসবই এর পেছনে কাজ করেছে। জাতিসংঘ সনদের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইনের ১০০ বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একে ‘আগ্রাসনের যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অতীতের শিক্ষা নেওয়া হয়নি
ওয়াশিংটন যেন নিজের ইতিহাসকেই উপেক্ষা করছে—শীতল যুদ্ধের সময় যেমন ভুল করেছিল, আবার ৯/১১–এর পরও একই ভুল পুনরাবৃত্তি করছে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও কঠোর শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, কূটনীতি ও নরম শক্তিকে অবহেলা—বারবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যা ব্যয়বহুল ও উল্টো ফল বয়ে আনে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশ যুদ্ধক্ষেত্রে জয় পেলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ হারায় এবং ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। প্রায় দেড় দশকের এই যুদ্ধে ৬০ হাজার আমেরিকান এবং প্রায় ৩০ লাখ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র তার নৈতিক নেতৃত্ব হারায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উড্রো উইলসন ও ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের নেতৃত্বে যে দেশ বিশ্বে আস্থা অর্জন করেছিল, সেই পরাশক্তি ধীরে ধীরে এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
৯/১১–এর পর দুই দশকের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এ যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব যুদ্ধেই জয়ী হলেও মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। মার্কিন করদাতাদের আট ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর ৪,৪০০ আমেরিকান লাশ হয়ে দেশে ফেরে। ইরাক ও আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০১২ সালে ইরাকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র রেখে এবং ২০২১ সালে তালেবানের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিরে আসে। অথচ দুই দশক আগে আফগানিস্তানে হামলার উদ্দেশ্য ছিল তালেবানকে অপসারণ করে দেশটিকে গণতন্ত্রে রূপান্তর করা।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি স্যাকস বারবার উল্লেখ করেছেন, ৯/১১–এর পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রো-ইসরায়েলি লবি ‘ক্লিন ব্রেক’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলবিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল বা ধ্বংস করা। তালিকায় ছিল লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক এবং ইরান।
এই প্রকল্প ব্যাখ্যা করে কেন ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে আনতে চেষ্টা করেছে। ট্রাম্পের আগে অন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদের রাজি করাতে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।
বিশ্ব এই অপ্ররোচিত ও এড়ানো সম্ভব এমন যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইআরজিসির প্রভাব থাকা সত্ত্বেও ইরান এক আগ্রাসী যুদ্ধের শিকার হিসেবে বিশ্বসমর্থন পায়।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ন্যাটো কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা কেউই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়ায়নি।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে আবির্ভূত হয়েছে এবং সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর ওপরও প্রভাব বাড়িয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন উদ্বিগ্ন—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের রক্ষা করবে? ইসরায়েলের পার্লামেন্ট সদস্যদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলেছে—ইরানের পর লক্ষ্য তুরস্ক। বিশিষ্ট ইসরায়েলি কলামিস্ট গিদিয়ন লেভি সতর্ক করেছেন, “ইসরায়েল ইরানেই থামবে না।”
এখন কোনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশই ইরানকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পাচ্ছে না। দুই শক্তিধর প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করে ইরান বিপুল আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বজুড়ে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, নতুন নিয়ম ও নতুন ভারসাম্য। হরমুজ প্রণালিতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ জন মিয়ারশাইমার যুদ্ধের শুরুতেই বলেছিলেন, “এটি এক বিশাল ভুল।”
অথবা, হয়তো—এটি এক অপ্রত্যাশিত আশীর্বাদ।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক