বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির রিব্র্যান্ডিং

বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির রিব্র্যান্ডিং
যে গণআন্দোলন শেষ পর্যন্ত হাসিনার পতন ঘটায়, সেখানে ইসলামপন্থী শক্তিগুলো প্রতিপক্ষ নয়, বরং ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবেই উঠে এসেছে। ছবি: সুদীপ্ত সালাম

গত ১২ জানুয়ারি ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় একটি ব্যান্ডের কনসার্টে হাজারো শিক্ষার্থী সমবেত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই কনসার্ট গভীর রাত পর্যন্ত চলে। উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা নেচে-গেয়ে এই আয়োজন উদযাপন করে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী শিক্ষার্থী ছিল, যাদের অনেকেই ছিল হিজাব পরা।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্যাম্পাসে হিজাব খুব সাধারণ দৃশ্য হয়েছে উঠেছে। ২০১০ এর দশকের শুরুর দিকে ছাত্রীদের মধ্যে হিজাবের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। গত শতকের ৮০-এর দশকে হিজার বিরল হলেও ৯০-এর দশক থেকে ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পর্দা প্রথা বিস্তৃত হয়। হিজাব বর্তমানে শহুরে, শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রসার পেয়েছে, যাদের অনেকেরই ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশের এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, যখন শত শত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘হিজাব র‍্যালি’-তে অংশ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো পলিটিক্যাল ইসলামের (রাজনৈতিক ইসলাম) দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল গত দুই যুগ ধরেই। এই প্রবণতা ২০২৫–এর সেপ্টেম্বরে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছায়। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণশীল সামাজিক ব্যবস্থার প্রবক্তা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বহু দিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থী রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচিত। ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্য ঐতিহাসিকভাবে একপ্রকার নিষিদ্ধ এলাকা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর জামায়াতের ছাত্র সংগঠন দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত আরও পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই জয় পায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকিব আহমেদ বলেন, “ইসলামপন্থীদের ভোটে বিজয় ও ক্যাম্পাসে সংগীতানুষ্ঠানের এই সহাবস্থান বাংলাদেশে চলমান এক বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্র আন্দোলনের কর্মী এবং ইসলামী গোষ্ঠীগুলো ক্রমেই একে অপরের কাছাকাছি আসছে।”

বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে ক্যাম্পাসের বাইরে সমান্তরালভাবে চলতে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনর্বিন্যাস। আসছে নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোট গঠনের উদ্যোগ। এনসিপি শেখ হাসিনার ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটানো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক শক্তি।

নির্বাচনের আগে আগে বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি শুধু এই অংশীদারত্ব টিকে থাকবে কি না তা নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কোন ছবি তুলে ধরে, সেটিই মুখ্য। এর মধ্যে রয়েছে-আদর্শিক সীমানার বিলুপ্তি, পুরনো শত্রুতার অবসান এবং এমন সব অস্বস্তিকর জোটের উদ্ভব যা আদর্শিক দৃঢ়তার চেয়ে পারস্পরিক বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই অস্বস্তিকর ঘনিষ্ঠতা অভিন্ন বিশ্বাস নয়, বরং অভিন্ন ক্ষোভের কারণে পরিচালিত। ছাত্র আন্দোলনের কর্মী ও ইসলামপন্থীরা এখন নিজেদের এমন অবস্থানে নিয়ে গেছেন, যেখানে তাদের স্বার্থের অনেক বিষয় একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষ- নির্বাসিত শেখ হাসিনা ও তার আশ্রয়দাতা ভারত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা ছিল বন্ধুর, কিন্তু বর্তমানে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতকে ক্রমেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অধীনে আবারও স্বৈরাচারী শাসন ফেরার আশঙ্কাও কাজ করছে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনগুলো ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ, ভাষাগত পরিচয় এবং ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতার ধারণা থেকেই বৈধতা অর্জন করত। তবে যে গণআন্দোলন শেষ পর্যন্ত হাসিনার পতন ঘটায়, সেখানে ইসলামপন্থী শক্তিগুলো প্রতিপক্ষ নয়, বরং ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবেই উঠে এসেছে। এনসিপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্র আন্দোলনকর্মীরা আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে কৌশলগত মিত্র হিসেবেই বেশি ছিল। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব ও পুলিশি সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে তারা এক হয়েছিলেন। হাসিনার পতনের পর মূলধারার দলীয় রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় পুরোনো বিভাজনগুলোও সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় এই ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্দোলনে ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী ও নারী সংগঠনগুলো একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিল।

জামায়াতের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ১০ দলীয় জোট। ছবি: বাসস
জামায়াতের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ১০ দলীয় জোট। ছবি: বাসস

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দাবি, জুলাই আন্দোলনের নেতারা প্রকৃতপক্ষে ছদ্মবেশী জামায়াত বা ছাত্রশিবির কর্মী ছিলেন। যদিও এনসিপি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির কোনো নেতাই নিজেকে প্রকাশ্যে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচয় দেননি। প্রকৃতপক্ষে, এনসিপি বারবার নিজেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মধ্যপন্থী হিসেবে বলেছে। দলের নেতৃত্বে নারীদের বড় পদ দেওয়া নিয়ে জোর গলায় কথা বলেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার করেছে। তা সত্ত্বেও, জামায়াত-এনসিপির নির্বাচনী জোট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ইসলামীকরণের বিষয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাকিব আহমেদ বলেন, তিনি মনে করেন, ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক ইসলাম এমনভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে যা এক দশক আগেও ভাব যেত না। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারটি চোখের সামনেই হচ্ছে। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেখানে প্রধান দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো খুবই দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী। ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, বিদ্যমান অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কমিটি গঠন, পাঠচক্র পরিচালনা এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করা মধ্য দিয়ে

ছাত্রশিবির ও নতুন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাংগঠনিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।”

হাসিনার শাসনামলে তাদের কার্যক্রম ছিল গোপন ও নীরব। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকে তারা প্রকাশ্যেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনে সদস্য সংগ্রহ ও আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী সংগঠনগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে্য—যার প্রতিফলন দেখা গেছে ছাত্র সংসদ নির্বচানে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, বর্তমানে ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রায় সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। কঠোর ইসলামি বিধান প্রচারের জন্য প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর বদলে, সংগঠনটি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধিতার ওপর জোর দিয়েছে, সেটা তারা করছে রাজনৈতিক ইসলামকে আদর্শিকের চেয়ে সাংস্কৃতিক কাঠামো বিবেচনা করে। এই কৌশলটি তাদের ভোট পেতে সহায়তা করেছে। এমনকি যারা সংগঠনটির রাজনীতির সঙ্গে একমত নন এমন নারী শিক্ষার্থীদেরও এই কৌশল আকর্ষণ করেছে।

বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো জামায়াত ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র মধ্যে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ। এনসিপি হলো তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার জন্ম ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।

তরুণদের আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ইসলামপন্থী মিত্রদের জন্য রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটি পথ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং সেই সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও সংখ্যালঘুদের-বিশেষ করে হিন্দুদের-বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ জামায়াতের দীর্ঘদিনের কলঙ্ক। ১৯৪০-এর দশকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, দেশভাগের আগে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই জামায়াতের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিমালার মধ্যে শরীয়াহ আইনভিত্তিক একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল। দলটির রক্ষণশীল নীতিগুলো নারীদের প্রান্তজনে পরিণত করার ইঙ্গিত দেয়। এই রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতের ওপর দমন-পীড়নের ফলে দলটির নির্বাচনী সাফল্য কমই ছিল। এমনকি ২০০১ সালে তারা যখন বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগির অংশ হয়েছিল, তখনও বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে তারা আসন পেয়েছিল মাত্র ১৭টি। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সেই জোটে বিএনপির আসন ছিল ১৯৩।

এর ফলা হলো ‘স্থগিত রাখার রাজনীতি’ (Politics of postponement)- তাৎক্ষণিক কৌশলগত লাভের আশায় মৌলিক প্রশ্নগুলোকে আপাতত সরিয়ে রাখে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে এনসিপি নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত দলটিকে একেবারে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জোটের ঘোষণা আসার পরপরই দলের ভেতরে ভিন্নমতের বিস্ফোরণ ঘটে। কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জনেরও বেশি সদস্য এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দেন। বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও কর্মী পদত্যাগ করেন।

তাদের মধ্যে ছিলেন তাজনুভা জাবিন। উদীয়মান রাজনীতিক হিসেবে বিবেচিত এবং ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনাকারী তাজনুভা বলেন, “এনসিপিতে আর থাকার কোনো মানে হয় না। দলটি একসময় যে পথের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।”

জাবিনের মতে, যখন নারী এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপুল সংখ্যায় যোগ দিয়েছিল তখনই জুলাই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তিনি বলেন, “আমরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং এক সঙ্গে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। এর বদলে, দলটি সেই পুরনো পথই বেছে নিল।”

দল ত্যাগ করা আরেকজন শীর্ষ নেত্রী ও চিকিৎসক তাসনিম জারা এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তবুও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এনসিপির কাছে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক তৌফিক এম হক বলেন, ক্যাম্পাস নির্বাচনে দলের ছাত্র সংগঠনের খারাপ পারফরম্যান্স এনসিপির জন্য একটি সতর্ক সংকেত ছিল। তিনি বলেন, “ক্যাম্পাসে জন্মানো একটি আন্দোলন শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি নেতৃত্বকে নার্ভাস করে দিয়েছে।”

গত এক মাসে এনসিপির পাশাপাশি আরও কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। যেমন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, “এনসিপি ও মধ্যপন্থী এলডিপিকে সঙ্গে নেওয়া জামায়াতের নিজের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার একটি হিসাবি কৌশল।”

এবি পার্টি ২০২০ সালে জামায়াতের একটি সংস্কারপন্থী অংশ হিসেবে গঠিত হয়। এটি নিজেদের জামায়াতের চেয়ে মধ্যপন্থী বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে আসছে।

হাসিনার শাসনামলে জামায়াতকে দীর্ঘস্থায়ী দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বছরের পর বছর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে দলটিকে কোণঠাসা করেছেন। দলটির নেতৃত্বকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করেছেন। দলটিকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখেছিলেন। এর ফল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থার আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। বেশ কিছু ইসলামপন্থী সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়; অন্যগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় জামায়াতের সামনে খুবই বিরল একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, “জামায়াত এখন মূলধারায় ঢুকতে মরিয়া এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বয়ানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।”

জামায়াতের নেতারা এখন প্রকাশ্যে জোর দিয়ে বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকার শরীয়াহ আইন চাপিয়ে দেবে না, নারীদের শিক্ষা বা কর্মসংস্থান সীমিত করবে না এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না। এই প্রথমবারের মতো জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল খুলনার ডুমুরিয়া এলাকার কৃষ্ণ নন্দী দাকোপ–বটিয়াঘাটা আসন থেকে নির্বাচন করবেন্য—যেখানে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি এক সফরে ওই এলাকায় গিয়ে আমি স্থানীয় হিন্দুদের সঙ্গে কথা বলি, যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতেন। তারা জানান, ধর্মীয় পরিচয় সত্ত্বেও কৃষ্ণ নন্দীকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম। বরং বিএনপির স্থানীয় এক মুসলিম প্রার্থীকেই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে।

এনসিপি জামায়াতকে অল্প নির্বাচনী সুবিধা দিতে পারে। দলটির সাংগঠনিক গভীরতা, অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি রয়েছে। এর সদস্যরা মূলত শহুরে, ছাত্র আন্দোলন ও সুশীল সমাজের পটভূমি থেকে উঠে আসা। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি খুবই কম, ফলে বিএনপির প্রতিষ্ঠিত দলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের সম্ভাবনা সামান্যই। এমনকি ক্যাম্পাসের নির্বাচনগুলোতেও তাদের দুর্বল ফলাফল সে কথাই সমর্থন করে। তবে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে এর প্রতীকী উপযোগিতা অনেক বেশি। দলটির তুলনামূলক শহুরে ও স্বচ্ছল গঠনের কারণে আংশিক হলেও-জনসংযোগে যে ঘাটতি রয়েছে তা তারা কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, “এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থান, তারুণ্য এবং রাজনৈতিক নতুনত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। জামায়াতের নতুন ভাবমূর্তি তৈরির (রিব্র্যান্ডিং) প্রচেষ্টায় সেই প্রতীকী গুরুত্ব অনেক।”

এদিকে এলডিপি জামায়াতকে ‘ঐতিহাসিক কলঙ্ক লাঘবে সহায়তা করছে। এলডিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অলি আহমদ ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনবার সংসদ সদস্য হন। তিনি বিএনপি সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অলি আহমদ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান পরে বাংলাদেশের সামরিক শাসক হন। অলি আহমদ ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে এলডিপি গঠন করেন।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্যাম্পাসে হিজাব খুব সাধারণ দৃশ্য হয়েছে উঠেছে
গত দুই দশকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্যাম্পাসে হিজাব খুব সাধারণ দৃশ্য হয়েছে উঠেছে

এনসিপির জন্য ইসলামপন্থীরা এমন কিছু নিয়ে এসেছে, যা দলটির নিজের নেই। যেমন: শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্যাডার বাহিনী, গভীর স্থানীয় নেটওয়ার্ক, মসজিদ ও মাদ্রাসায় প্রবেশাধিকার এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও দীর্ঘদিন কাজ করার সামর্থ্য। ছাত্র আন্দোলনকর্মীদের জন্য তাদের সহযোগিতা ও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ, সুরক্ষা এবং সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা দিতে পারে। এখানে বিশ্বাস থাকাটা ঐচ্ছিক; কিন্তু কৌশলগত উপযোগিতা অপরিহার্য।

জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট এনসিপি ও এলডিপির জন্য এক দুধারী তলোয়ার্য—যা দীর্ঘমেয়াদী আদর্শিক সততার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই অংশীদারত্ব ছোট দলগুলোর জন্য জামায়াতের বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো এবং বিএনপির বিরুদ্ধে ভোট একত্র করার একটি ‘এক-বাক্স’ কৌশল হলেও এটি এরই মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার এক সংকট সৃষ্টি করেছে।

এই জোটের মূল বৈশিষ্ট্য আদর্শিক পুনর্মিলন নয়, বরং কৌশলগত নীরবতা। যেসব বিষয় দলগুলোকে বিভক্ত করতে পারে-যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রে ধর্মের ভূমিকা—সেগুলো তাদের যৌথ প্ল্যাটফর্মে সুকৌশলে চেপে রাখা হয়েছে। এর পরিবর্তে, দলগুলোর নেতাদের যৌথ বক্তব্য মূলত দুর্নীতি, সুশাসনের ব্যর্থতা, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এই নীরবতা সুচিন্তিত। ছাত্র নেতাদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতিগুলোকে খুব বেশি জোরালোভাবে সামনে আনার অর্থ হলো তাদের রক্ষণশীল মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। আবার ইসলামপন্থীদের জন্য ধর্মীয় লক্ষ্যগুলোকে সামনে নিয়ে আসার মানে হলো, সেই পুরনো উদ্বেগগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, যা অনেক দিন ধরে তাদের একটি নির্দিষ্ট ছোট গণ্ডির বাইরে জনসমর্থন পাওয়ার পথকে সীমিত করে রেখেছে।

জুলাই আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতা শরিফ ওসমান হাদি ডিসেম্বর মাসে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। হাদির হত্যাকাণ্ড সেই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়েছে। হাদি ছিলেন একজন আকর্ষণীয় তরুণ রাজনৈতিক কর্মী; ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা, যেটি জুলাই আন্দোলনের নৈতিক রক্ষক হিসেবে উঠে আসছিল। তার মৃত্যু অসাধারণ ক্ষোভ ও আবেগকে উসকে দেয়। তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই করা একজন শহীদ হিসেবে বিবেচিত হন, যিনি দুর্নীতি এবং বাইরের আধিপত্যের বিরোধিতা করেছিলেন। লাখ লাখ জেন-জি ভোটার এবং ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যপন্থীদের কাছে, হাদি ছিলেন এক অসাধারণ, খোলামেলা, আপসহীন ব্যক্তির কণ্ঠস্বর। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে তার হত্যাকাণ্ডকে জুলাই বিপ্লবের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে কিছু গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঙ্গাও উসকে দিয়েছিল, যে গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক শ্রেণি ‘ভারতপন্থী’ বা ‘বিপ্লব-বিরোধী’ হিসেবে গণ্য করে।

হাদির মৃত্যুর পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, “শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাত এবং যেভাবে তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।”

আমি যখন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবকে জিজ্ঞেস করি যে, তার দল কাকে ভয় পায়, তখন তিনি আওয়ামী লীগ এবং ভারতের দিকে আঙুল তোলেন এবং উদীয়মান তরুণ নেতাদের নির্মূল করার একটি প্রচারণার অভিযোগ আনেন। তবে তিনি এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

তৌফিক এম হক মনে করেন, হাদি হত্যাকাণ্ড এনসিপি নেতৃত্বকে বিচলিত করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি বিপ্লবীদের কোনো ধরনের নির্বাচনী জোটে স্থান দেওয়ার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। এর বিপরীতে, জামায়াত ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। তারা নিরাপত্তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং নির্বাচনী সক্ষমতার আশ্বাস দিয়েছিল। দুই দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগির সমঝোতা অনুযায়ী, ৩০০ নির্বাচনী আসনের মধ্যে এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যেখানে জামায়াতের কোনো প্রার্থী থাকবে না। এটিকে একটি উদার প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এদিকে, বিএনপি এখনো ভোটের দৌড়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। যার প্রধান কারণ হলো দলটির গভীর সাংগঠনিক ভিত্তি এবং বর্তমানে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা। আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠ থেকে ছিটকে যাওয়ায় বিএনপি তাদের মধ্যপন্থী ও জাতীয়তাবাদী বিশাল ভোটব্যাংক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে গেছে। বর্তমান জনমত জরিপগুলো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বিএনপির সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ অনেক ভোটারই এনসিপির আদর্শিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা জামায়াতের ধর্মীয় এজেন্ডার চেয়ে বিএনপির সুশাসনের প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত চারদলীয় জোটের রূপকার ছিল বিএনপি, যা জামায়াতের মতো ইসলামপন্থী দলগুলোকে সরকারের ভেতরে নিয়েছিল। এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর দলটির ওপর অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের পথ প্রশস্ত করে। তবে ২০২৬ সালের বিএনপি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তাদের একসময়ের ইসলামপন্থী মিত্রদের কাছ থেকে দূরে থাকছে। এই পরিবর্তন সম্ভবত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আরও বেশি মধ্যপন্থী ও বাস্তবমুখী জাতীয়তাবাদের দিকে রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিএনপি সরকার মানেই স্বৈরাচারী শাসনে ফিরে যাওয়া— একটি শ্রেণির এমন সন্দেহের মূল কারণ হলো ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটের প্রতি দলটির বিরোধিতা। এই সনদটি ছিল হাসিনার পতনের পর নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার এবং সাংবিধানিক সংশোধনীর একটি প্রস্তাবনা। যদিও বিএনপি শেষ পর্যন্ত এই সনদে সই করেছে, তবে তারা সেখানে বেশ কিছু নোট অব ডিসেন্টও দিয়েছে। মূলত আসছে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এড়াতেই তারা এটি করেছে। সংসদে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ এবং ‘বিপ্লবী’ দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে বিএনপি যে ইঙ্গিত দিচ্ছে তা হচ্ছে, তারা ছাত্র বিপ্লবীদের অংশীদার হিসেবে নয়, বরং দেশের রাজনীতিতে একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে গণ্য করে।

তরুণদের আন্দোলন কর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ইসলামপন্থী মিত্রদের জন্য রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটি পথ করে দিচ্ছে। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
তরুণদের আন্দোলন কর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ইসলামপন্থী মিত্রদের জন্য রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটি পথ করে দিচ্ছে। ছবি: সুদীপ্ত সালাম

একসময় এনসিপিকে বিভিন্ন ধরনের মতকে ধারণ করতে সক্ষম একটি বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মনে করা হলেও, দলটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক পরিচয় তৈরিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। যদিও তারা একটি ছাত্র আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে অসাধারণ সক্ষমতা দেখিয়েছিল, কিন্তু অভ্যুত্থানের সেই গতিকে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর, এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। যা অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আরও গভীর করে তোলে। ইসলামপন্থীদের সঙ্গে দলটির জোট এখন এটিকে চূড়ান্তভাবে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং একটি স্বতন্ত্র, যুব-নেতৃত্বাধীন শক্তি হিসেবে এর ভবিষ্যতকে সংকটের মুখে ফেলেছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, ধর্মনিরপেক্ষ নেতা ও কর্মীরা সম্প্রতি ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ নামে একটি পৃথক প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেন।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর উচ্চাভিলাষী নেতারা নির্বাচনের পর সম্ভবত জামায়াত বা বিএনপিতে যোগ দেবেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক তৌফিক বলেন, “এনসিপির বয়স এক বছরেরও কম এবং সম্ভবত আসন্ন নির্বাচনে তাদের ফলাফল নিয়ে প্রত্যাশা অবাস্তব রকমের বেশি ছিল।”

২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর, লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত দলগুলো এবং তাদের অপশাসনের ধারার বাইরে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্পের আশা করেছিল। এনসিপি আসলে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে তা বোঝার জন্য অনেকে এখনো অপেক্ষায় আছেন, তবে এনসিপিকে নিয়ে জনসাধারণের হতাশা এরই মধ্যেই স্পষ্ট।

তৌফিক হক অবশ্য দলটিকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলতে রাজি নন। তিনি বলেন, “রাজনীতি ভোটের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি নির্বাচনের পর এনসিপি একটি নিজস্ব পরিচয় গঠন, তাদের মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ এবং নির্বাচনী সমীকরণের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করায় মনোযোগ দেয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হতেও পারে। কিন্তু তারা যদি বড় দলগুলোর সঙ্গে লেজুড়বৃত্তি করে , তবে তা সম্ভব নয়।”

লেখাটি নেপালভিত্তিক সাময়িকী ‘হিমাল সাউথ এশিয়ানে’ শাকিল আনোয়ারের লেখা দ্য রিব্র্যান্ডিং অব ইসলামিক পলিটিক্স ইন বাংলাদেশ’ থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত