শুধুই ভাড়া গোনা জমিদারেরা কি নির্দেশিকা গুনবে?

শুধুই ভাড়া গোনা জমিদারেরা কি নির্দেশিকা গুনবে?
ছবি: পেক্সাবে থেকে নেওয়া

আমাদের দেশে ৭৫/৮০ বছর আগেও জমিদারি প্রথা ছিল সাড়ম্বরে। জমিদারেরা খাজনা তুলত, প্রজাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। সবচেয়ে বড় বিষয়, প্রজাদের কাছ থেকে সম্পদ লুটে নিয়ে নিজেদের সিন্দুক ভরত। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও, আমাদের এই বঙ্গে ওই প্রথারই নতুন সংস্করণের উদ্ভব ঘটতে থাকে নানা প্রকারে।

কারণ, বাংলাতেই প্রবাদ আছে–স্বভাব যায় না মলে, কয়লা যায় না ধুলে। এই বাংলার জমিতে তাই নতুন নতুন জমিদারের জন্ম ঘটতে থাকে। কেউ হয় রাজনৈতিক জমিদার, কেউ আবার সামাজিক, কেউ কেউ আবার নিখাদ অর্থনৈতিক। আরেকটি ধরন হলো একেবারে নিখাদ। সেই ঘরানায় বিঘার পর বিঘা নয়, বরং এক টুকরো জমিকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হতে থাকে নতুন নতুন জমিদার। যাদের সংখ্যা এখনকার বাংলাদেশে লাখ লাখ। জমিদারের বাম্পার ফলন যাকে বলে! ভাড়াটেরা অবশ্য তাদের বাড়িওয়ালা হিসেবে চেনে।

জমি যার, সেই আসলে জমিদার। এখন এই জমির ওপর যখনই আপনি কয়েক তলা বাড়ি বানালেন, তখনই আপনি হয়ে গেলেন বাড়িওয়ালা। এরপর ভাড়াটে বসালেন, ভাড়া তুলতে থাকলেন। বাড়িওয়ালাদের জমিদার বলা যেত না, যদি তারা ভাড়াটেদের ‘প্রজা’ মনে না করতেন! দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ দেশের বাড়িওয়ালারা অনেক ক্ষেত্রেই ভাড়াটেদের সাথে প্রভুসুলভ আচরণই করে থাকেন। আর স্থান যদি রাজধানী হয়, তবে সেই আচরণ আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে।

এই শহরে মানুষ বেশি, তাদের থাকার জায়গা কম। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে একটা বেশ হুড়োহুড়ি আছে। আর ভালো বাসার হিসাব করতে গেলে সেই হুড়োহুড়ি আরও বেশিই বোধ হবে। তো, এমন একটি জনঘন পরিবেশেই ভালো মানের বাসার বা মোটামুটি মানের বাসাও দাম বাড়িয়ে ফেলে অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী। চাহিদা বেশি, তো মূল্যও বেশি। শহরের অস্থায়ী বাসিন্দারা উপায়ন্তর না দেখে তাতে রাজিও হয়ে যান বটে। মানুষ তো চায়ই একটু ভালো পরিবেশে স্বস্তিতে থাকতে। তার জন্য বেশি ব্যয়ও করে, পকেটে হাহাকার ওঠা স্বত্ত্বেও। কিন্তু সুখের জন্য প্রেম করলেই তো আর সুখ পাওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে না।

রবি ঠাকুর সেই কবেই এসব বলে গেছেন। হয়তো ভবিষ্যৎ বুঝেই বলেছিলেন! কারণ এত দিন পর এসে বোঝা যায়, ঢাকা শহরের ভাড়াটেদেরও যে একই অবস্থা। স্বস্তিদায়ক ও কিছুটা সহানুভূতিপরায়ণ বাড়িওয়ালা এই শহরে খুঁজে পাওয়া সোনার হরিণ পাওয়ার মতোই ব্যাপার। মনে করবেন না যে, গা জোয়ারি কথা বলা হচ্ছে। ভাড়াটে হিসেবে এই লেখকের প্রায় ৩৫ বছরের চলমান অভিজ্ঞতা রয়েছে। আরও অনেকের অভিজ্ঞতা শোনা হয়েছে সাংবাদিকতার সূত্রেও। তাতে সহানুভূতিপরায়ণ বাড়িওয়ালার যে পরিমাণ পাওয়া যায়, তা ৫ শতাংশও হবে কিনা সন্দেহ।

তাহলে, ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা মোটাদাগে কেমন? আসলে এই শহরের বাড়িওয়ালাদের মধ্যে সেবাদাতা হওয়ার তাড়না একেবারেই কম। এখানকার বাড়িওয়ালারা আদতে তো সেবাদাতাই। ভাড়াটেরা সেবাগ্রহীতা। সেই হিসাবে মক্কেল হলো ভাড়াটেরা। কিন্তু কয়জন ভাড়াটেকে আর সেভাবে মনে করা হয়! তাই ভাড়াটেরা অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালার অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকেন। তা ভাড়া বাড়ানোর বাহাসেই হোক, কিংবা বাসা রং করে দেওয়ার দাবিতেই হোক। এসব ক্ষেত্রে অনুরোধ, উপরোধ করা ছাড়া ভাড়াটেদের কিছু করার থাকে না। আর বেশির ভাগ সময়েই ভাড়াটেদের এসব অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়। কখনো কখনো দায় চাপিয়েও পার পেয়ে যান বাড়িওয়ালারা। যেমন: একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানানো যাক। ৫ বছর আগে এক বাড়িওয়ালাকে নিজের ঘরের দেওয়ালের ফুলে ওঠা প্লাস্টার দেখিয়েছিলাম। ড্যাম্পে রং উঠে গিয়ে প্লাস্টার ঝুলে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, দেওয়ালের ভেতর দিয়ে নেওয়া পানির লাইনে নিশ্চয়ই সমস্যা হয়েছে, আর তাতে দেওয়ালের গায়ে থাকা বিদ্যুতের লাইন নিয়েও শঙ্কা থেকে যায়। আর ব্যাপক ধুলোবালির সমস্যা তো আছেই। এসব মেটাতেই একজন রাজমিস্ত্রী ডেকে সমস্যার সমাধান করার অনুরোধ ছিল। তবে বাড়িওয়ালা এত সহজে সব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন যে, আমার নিজেরই অপরাধবোধ হতে লাগল! উনি আমার অভিযোগ আমলেই নিলেন না, উল্টো বলে দিলেন–‘এগুলো কোনো বিষয়ই না!’

অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রেই ভাড়াটের সমস্যা ধামাচাপা দেওয়া হয় বাড়িওয়ালাদের তরফে। একবার তো একটি বাসায় নতুন উঠে দেখতে পেয়েছিলাম যে, বিদ্যুতের লাইনের সকেটগুলো মোটামুটি ১০/১৫ বছরের পুরনো। ওতে মোবাইলের চার্জারও লাগানো যায় না ঠিকমতো, এখনকার থ্রি পিন তো দূর অস্ত। আর সেসব বদলে দেওয়ার প্রস্তাব তুলে শুনতে হয়েছিল যে–‘এসবই সবাই ব্যবহার করে’। যদিও বাড়িওয়ালার নিজের ফ্ল্যাটে সব ঝকঝকে, তকতকে নতুন ডিজাইনের সকেট শোভা পাচ্ছিল। জমিদারি ভাব না থাকলে কী আর রাজায়-প্রজায় এত প্রভেদ হয়!

তো, এমন এক শহরেই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাড়ির নির্দেশিকা দিয়েছে ঘটা করে। তাও আবার প্রায় ৩৫ বছর আগের এক আইন অবলম্বনে। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দেওয়া এক নির্দেশিকাতে বলা হয়েছে, দুই বছর পূর্ণ না হলে বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং ভাড়াটিয়াদের যেকোনো সময় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে বাড়িওয়ালাকে। বাড়িওয়ালা অবশ্যই বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করবেন এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি–এই ইউটিলিটি সেবাগুলো যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া জানালে বাড়িওয়ালা দ্রুত সমাধান করবেন। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনা বাড়ায় ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তার জন্য ছাদ ও মূল গেটের চাবি সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভাড়া অবশ্যই মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে এবং প্রতিবার রশিদ দিতে ও নিতে হবে–এ নিয়ম কঠোরভাবে মানতে বলা হয়েছে। ডিএনসিসি’র দেওয়া এই নির্দেশিকাতে আরও বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময় বাড়িতে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বাড়ির নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে আগে ভাড়াটিয়াকে জানাতেও হবে।

এবার, পাঠক, আপনারাই বলুন, নির্দেশিকায় থাকা এতসব নির্দেশের কোনগুলো পুরোপুরি মেনে চলা হয়? আদৌ বাড়িওয়ালারা মেনে চলেন? ১ বছরের মাথায় বাড়িভাড়া বাড়ায় না কয়জন বাড়িওয়ালা? যেকোনো সময় ভাড়া বাসায় ঢুকতে পারে কয়জন ভাড়াটে? ১১টায় গেট বন্ধ হয় না ঢাকা শহরের কয়টি বাড়িতে? ভাড়া নিয়ে রশিদ দেয় কত শতাংশ বাড়িওয়ালা? এর বিপরীতে সব ভাড়াটিয়াও কি ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া মেটান? কথা না রাখা বাড়িওয়ালার পাশাপাশি নিয়ম না মানা ভাড়াটেও তো আছেন। যদিও ভাড়ার মতো ব্যাপার বাদে বাকি নির্দেশনাগুলো মানার বাধ্যবাধকতার বেশির ভাগই বাড়িওয়ালাদের ঘাড়েই বর্তায়।

এমন না মানার অবস্থার মধ্যেই ডিএনসিসি এসব নির্দেশনা দিয়েছে। তাও যে সমস্যাটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো, এটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু কথা হলো ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’-এর আলোকে নতুন নির্দেশিকা দিয়ে আসলে লাভ কী হচ্ছে? এই আইন তো আগে থেকেই ছিল। এটি না মানার বিষয়টিও অনেকদিন থেকেই চলে আসছে। আইন যে একটা আছে, সেটি মনে করিয়ে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য কেবল? মনে রাখতে হবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের যখন এভাবে আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে ওই খাত আদতে পুরোপুরি বিশৃঙ্খল এবং অনিয়ন্ত্রিত।

যেকোনো আইন বা নির্দেশিকা দেওয়ার অর্থ হলো বৈষম্যের অবসান করার ইচ্ছা। তবে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ দিয়ে সেই উদ্দেশ্য খুব একটা পূরণ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আছেও। সমস্যা হলো, সেই আইনের আলোকেই ডিএনসিসি সাম্প্রতিক নির্দেশনাটি দিয়েছে। এতে করে সমস্যার সমাধানের বদলে কিছু ক্ষেত্রে শঙ্কাও তৈরি করছে। যেমন: এতে বলা হয়েছে, বার্ষিক হিসাবে ভাড়া বাবদ কোনো মালিক বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি আদায় করতে পারবেন না। এতে করে বাড়ি ভাড়া উল্টো বেড়ে যায় কিনা, সেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কারণ, কে না জানে, এ দেশে ক্ষমতাবানেরা নিজেদের পছন্দের নিয়মটিই মেনে চলতে চায় কেবল। আবার আইনে এক মাসের কথা বলা থাকলেও বাড়ির মালিকদের তিন মাস পর্যন্ত অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে কি এসব সুযোগকেই উসকে দিল ডিএনসিসি? কারণ, ভাড়ার বিবাদের সালিশভিত্তিক সমাধানের যে উপায়ের কথা সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তাতে প্রাথমিকভাবে ডিএনসিসি সরাসরি সম্পৃক্ত হয়নি। বরং এলাকার ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটে সমিতি গঠন করে সেসব দিয়ে সালিশ করতে বলা হয়েছে। যদি এতেও সমাধান না হয়, পরবর্তীকালে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানাতে হবে। কথা হলো, যেসব সমিতির অস্তিত্বই সেভাবে নাই, সেসব দিয়ে প্রাথমিক সমাধান কীভাবে হবে?

এদিক থেকে মনে হতেই পারে যে, ডিএনসিসি আসলে একটা নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশিকাটি দিয়েছে। এমন ধারণা করা দোষের কিছু নয়। অন্তত বাড়ি ভাড়া করেই থাকাদের মনে এমন ধারণা জন্ম নিতেই পারে।

অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি নাগরিক সমস্যার সঠিক সমাধানের পথে আদতে হাঁটাই হলোই না। বরং আরও বিভ্রান্তি তৈরি হলো। এই বিভ্রান্তির চক্রে ঘুরে সেই বাড়িওয়ালা বনাম ভাড়াটে শীর্ষক রেষারেষির শেষও হবে না। মাঝে দিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রচার হলো, পিআর হলো। ভালোই তো, ভালো না?

আর এত কিছুর ফাঁকে ঠিক বছরের শুরুর মাসটাতেই ঢাকা শহরের অসংখ্য ভাড়াটিয়ারা দিতে শুরু করেছেন বাড়তি ভাড়া। সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা কী, চাকরি ঠিকঠাক চলে কিনা, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা কেমন–এসব পরিস্থিতি পরিমাপক বিষয় সেখানে বাড়িওয়ালাদের মন গলাতে পারে না। অনেকেই হয়তো ১ বছরের ব্যবধানেই বাড়তি ভাড়া দিতে শুরুও করে দিয়েছেন। তা আমাদের সরকারি কর্তৃপক্ষ কি সেসবের খোঁজ নিতে ছোটোখাটো হলেও কোনো জরিপ চালাবে?

অবশ্য না চালালেই-বা কে কী বলতে যাচ্ছে। নাগরিক, থুক্কু ‘প্রজা’দের জন্য এত মমতা কে দেখিয়েছে কবে!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত