বিএনপি সরকারের সামনে সংস্কার আর ভাবমূর্তির চ্যালেঞ্জ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিএনপি সরকারের সামনে সংস্কার আর ভাবমূর্তির চ্যালেঞ্জ
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঢাকার জন্য শুধু একটা রুটিন ঘটনাই ছিল না, বরং এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক মুহূর্ত। এ অঞ্চলে যে নির্বাচনের প্রভাব সুদূরপ্রসারি। বাংলাদেশের সহিংসতাপূর্ণ ও অস্থির নির্বাচনী ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ভোটগ্রহণ মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়াটা বড় সাফল্যই। একই সঙ্গে এই নির্বাচন নতুন করে প্রত্যাশা আর আশঙ্কার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে আসা নতুন প্রশাসন এমন একটি দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে, যেখানে সংস্কারের তীব্র প্রত্যাশা আছে। কিন্তু রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় ও বৈদেশিক নীতি প্রশ্নে জনমত গভীরভাবে বিভক্ত। 

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের ভোটাররা শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্যই ভোট দেননি, বরং সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারের এজেন্ডার পক্ষেও রায় দিয়েছেন। এটি নতুন সরকারের ম্যান্ডেটকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। এই সরকার অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা আর দশটা সরকারের মতো নয়। বরং এই নতুন প্রশাসনকে বিচার করা হবে তারা সংস্কার বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারছে কি না—তার ভিত্তিতে। যদি সরকার সাংবিধানিক সংস্কারের এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত বা হালকা করে ফেলে, তবে তার রাজনৈতিক মূল্য হবে ভয়াবহ। কারণ, এই সংস্কারের পক্ষে আসা ভোট জনমানুষের প্রত্যাশাকে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই। রক্ষণশীল দল জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী নির্বাচনী ফলাফল, দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটব্যাংক অর্জন এবং সংসদে উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব–এক নতুন সংসদীয় বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি বড় ধরনের একটি পরিবর্তন। বিএনপির কাছে জামায়াত কোনো অপরিচিত পক্ষ নয়; অতীতে তারা একই রাজনৈতিক মেরুতে অবস্থান করেছে এবং বিভিন্ন সময়ে একই জোটে ছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। জামায়াত এখন একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যারা জনমত গঠন করতে সক্ষম, ডানপন্থী অবস্থান থেকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম এবং দাবি-দাওয়ার জন্য রাজপথের রাজনীতিকে উত্তাল করার ক্ষমতা রাখে।

বিএনপি কী করবে?

তবে এই পরিস্থিতি বিএনপির জন্য যথেষ্ট স্পর্শকাতর। তারা যদি জামায়াতের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখে, তবে আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ নজরদারি এবং দেশের ভেতর উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার যদি তারা জামায়াতকে কঠোরভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে, তবে দেশে চরম মেরুকরণ ও অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দেবে। যেকোনো পথই সংস্কারের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে; কারণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য ও ধৈর্যের প্রয়োজন—যা তীব্র আদর্শিক পার্থক্যের কারণে অর্জন করা বেশ কঠিন হতে পারে।

বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বোঝাটিও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি এবার শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করবে না, বরং দলটিকে এখন নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের অগ্নিপরীক্ষাতেও অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। তারেক রহমানের নামের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে থাকা দুর্নীতি সংক্রান্ত যে ন্যারেটিভ আছে, সেটি বিএনপির জন্য ভাবমূর্তি সংক্রান্ত বড় এক বোঝা। এমনকি নতুন সরকার যদি তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতা দেখায় তবুও জনমানসের ধারণা বদলাতে সময় লাগতে পারে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বৈধতা কেবল নীতিমালার মাধ্যমেই অর্জিত হয় না, বরং তা গড়ে ওঠে জনআস্থার ওপর ভিত্তি করে—যা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বিষয়, অথচ সামান্য কোনো কেলেঙ্কারির আঘাতেই তা মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির ভারসাম্য রক্ষার লড়াইটি কম কঠিন হবে না। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যে রকম, তাতে দেশ হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন খুব কঠিন। বাংলাদেশ মূলত ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, চীনের অবকাঠামোগত কূটনীতি এবং আমেরিকার তথাকথিত বর্ধিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’অগ্রাধিকারের মিলনস্থলে অবস্থিত। বিএনপি সরকারকে বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের সমন্বয় করতে হবে, পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে দিল্লি এবং ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানের সমন্বয় করতে হবে।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলেও চীনের সম্পৃক্ততা সবসময় স্থির ছিল। এই ধারাবাহিকতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের বাংলাদেশ নীতি ব্যক্তিগত নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক, যার মূলে আছে বন্দর, অবকাঠামো, সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বলয় তৈরির ব্যাপারটি। ঢাকার জন্য চীনা বিনিয়োগ লাভজনক ও অর্থনৈতিক মূল্য সম্পন্ন হলেও এটি কৌশলগতভাবে বাংলাদেশকে দৃশ্যমান করেছে। স্বাভাবিকভাবেই এটি ওয়াশিংটনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা দক্ষিণ এশিয়াকে ক্রমবর্ধমানভাবে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।

এখানেই আমেরিকার সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার রেকর্ড রয়েছে এবং তারা প্রায়ই দলটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি ‘কাউন্টারওয়েট’ বা ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখেছে। তবে বর্তমান সময়ে আমেরিকার এই সম্পৃক্ততা পূর্ববর্তী দশকগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শর্তসাপেক্ষ; তাই অতীত সম্পর্কের কারণে বিএনপি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো আনুকূল্য পাবে–এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

এ ক্ষেত্রে ইউনূস প্রশাসনের অর্থনৈতিক কৌশলের উদাহরণটি বেশ কার্যকর—বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে ট্যারিফ চুক্তি বা শুল্ক সমঝোতার মাধ্যমে ঢাকা তার অর্থনৈতিক কৌশলের একটা অংশ আমেরিকার বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিএনপির এই ব্যাপারটি থেকে যেটি শিখতে পারে, তা হলো, ওয়াশিংটন তখনই ইতিবাচক সাড়া দেয় যখন ঢাকা শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কাঠামোগত অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়। বিএনপি যদি চীনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চায়, তবে তাদের বাণিজ্য, শ্রম সংস্কার এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে না জড়িয়েও নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে।

তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক

আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অনিবার্য এবং জটিল হিসেবেই থেকে যাবে। দিল্লির অগ্রাধিকার হতে পারে বাংলাদেশের আপাত স্থিতিশীলতা এবং এমন একটি সরকার, যারা ভারতের নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা, বিশেষ করে সীমান্ত নিয়ে আশঙ্কা, অভিবাসন এবং উগ্রবাদ মোকাবিলায় সংবেদনশীল থাকবে। বিএনপি সরকার সম্ভবত ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের সময়ে তৈরি হওয়া তথাকথিত ‘অসামঞ্জস্য’ বা ঢাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দিল্লির হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে, সেটি বদলাতে চেষ্টা করবে। সবচেয়ে বড় কথা, দিল্লি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার যে ব্যাপক জনদাবি রয়েছে, তা পূরণ করার চাপ থাকবে তাদের ওপর। যদিও দিল্লি বিএনপির কথায় হাসিনাকে ফিরিয়ে দেবে, সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে তারেক রহমান নির্বাচনে জেতার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, কোনো সংঘাতমূলক পথ বেছে নেওয়া সমীচীন হবে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংহতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তঃনির্ভরশীলতা অত্যন্ত গভীর, তাই নতুন সরকারকে দিল্লির ব্যাপারে কৌশল নির্ধারণে অনেক সতর্ক হতে হবে।

তাছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার নতুন করে গড়ে ওঠা সম্পর্কের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা একটি নতুন গতি পেয়েছে। এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি আঞ্চলিক সম্ভাবনার পরিবর্তনের প্রতিফলন। ইসলামাবাদের জন্য ঢাকা হলো ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন কূটনৈতিক সুযোগ। আর বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান হলো আঞ্চলিক বৈচিত্র্য আনার একটি বিকল্প পথ। তবে এই সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ এই সম্পর্কের মধ্যে আছে ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং পরিচয়ের রাজনীতি, যেটি জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বিএনপিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে এই সম্পর্ক যেন আদর্শগত না হয়ে বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক দিয়ে কৌশলগত হয়। নয়তো এটা অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের ঝুঁকি তৈরি করবে। এখানে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হবে বিএনপির। তাই বিএনপিকে এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।

সবশেষে, বাংলাদেশের এই নির্বাচন নেপালের তরুণ প্রজন্মের জন্যও একটি শিক্ষা হতে পারে। ২০২৫ সালে নেপালের ‘জেন জি’ আন্দোলনের পর গঠিত ‘উজ্জ্বলো নেপাল পার্টি’ ২০২৬ সালের মার্চের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির কাছ থেকে শেখা উচিত। বাংলাদেশে এনসিপি স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জনপ্রিয় আলোচনা তৈরি করলেও তা তাদের নির্বাচনে সাফল্য এনে দিতে পারেনি। দলটি নির্বাচনে মাত্র ৬ আসন পেয়েছে।

এটা বলা যায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটির নতুন প্রশাসন দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর চিরচেনা সংকট—মেরুকরণ কতটা সামলে রাখতে পারে, সংস্কার কতটা করতে পারবে এবং পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মঞ্চ থেকে কতটা দূরে রাখতে পারবে, তার ওপর।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়তো নির্বিঘ্নে হয়ে গেছে, তবে এখন সাফল্য আসবে নাকি দেশে অস্থিরতা তৈরি করবে, সেটি নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোকে কেন্দ্র করেই।

লেখাটি বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) তুরস্কের সরকারপন্থী দৈনিক পত্রিকা ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন উমাইর পারভেজ খান।

সম্পর্কিত