Advertisement Banner

কালসী অগ্নিকাণ্ড: অসহনীয় দুর্ভোগ, প্রতিশ্রুতির ফানুস, আর নামমাত্র তদন্ত

কালসী অগ্নিকাণ্ড: অসহনীয় দুর্ভোগ, প্রতিশ্রুতির ফানুস, আর নামমাত্র তদন্ত
অগ্নিকান্ড। ছবি: চরচা

নাওয়া-খাওয়া নাই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। মাথার উপর আকাশ আর চোখের সামনে আগুনে পোড়া ঘর, আসবাবপত্রের ছাই। চার ছেলে আর এক কন্যা সন্তানের বাবা মো. শাহজাহান ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে ধ্বংসস্তূপের দিকে। পায়ে চালানো প্যাডেল রিকশা, যা শাহজাহানের রোজগারের একমাত্র অবলম্বন ছিল, সেটিও আছে অনেকগুলো পোড়া রিকশার মধ্যে।

৩৫ বছর ধরে বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে বসবাস করছিলেন শাহজাহান। গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। সেখানেও তো কেউ নাই, কিছু নাই। শিশু সন্তানদের নিয়ে কালশী ফ্লাইওভারের নিচে রাত কাটানোর পর ভোরের আলো ফুটতেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই পোড়া ঘরের সামনে ছুটে এসেছেন, যদি অক্ষত কিছু পাওয়া যায়! না, কিছুই আর অক্ষত নাই। ভেজা ছাইয়ের স্তূপে সমান হয়ে গেছে বাউনিয়াবাদ বস্তির এই অংশ।

মো. শাহজাহানের মতো আরও অন্তত ২০০ পরিবার সোমবার রাতের আগুনে হারিয়েছে সর্বস্ব। তাদের একজন কমলা। তিন সন্তানসহ পরিবার নিয়ে থাকতেন বস্তিতে। কমলার স্বামীর সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে পাঁচটি ব্যাটারি চালিত রিকশা কিনেছিলেন। ভালোই চলছিল দিন। আগুনে পাঁচটি রিকশাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কমলা বলছিলেন, “ওগো বাপে পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুডাছুডি (ছোটাছুটি) করছে কাইল রাইতে। সকাল থিকা হ্যারে দ্যাখতাছি না।”

এরই মধ্যে এক শিশু আইনাল মায়ের কাছে বারবার খাবারের জন্য আকুতি জানিয়েই যাচ্ছে। বয়স ৬ কিংবা ৭ হবে। মা একবার আদর করে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, একবার ঝাঁঝালো কণ্ঠে বকা দিয়ে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। কাল (সোমবার) দুপুরে শেষ ভাত খেয়েছিল আইনাল। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি! কেবল আইনাল না, পোড়া বস্তির বেশির ভাগ মানুষের পেটেই কোনো দানাপানি পড়েনি দুপুর ২টা পর্যন্ত। অথচ আগুন নেভার পরপরই জরুরি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

সেই সাহায্যের কথা জিজ্ঞেস করতেই তেড়ে এলেন অভুক্ত কয়েকজন। বললেন, “কেউ কোনো সাহায্য দেয় নাই। খাবার তো দূরের কথা, সরকারের কেউ এক গ্লাস পানিও নিয়া আসে নাই।” একজন অবশ্য জানালেন, “সকালে ক্যাডা জানি ভ্যানে কইরা ল্যাটকা খিচুড়ি আইনা কইলো পেলেট নিয়া আসতে। আমরা পেলেট কই পামু? কয়েকজন পলিথিনে কইরা খিচুড়ি নিছে। কিছুক্ষণ হেরা আছিল। তারপর আর দেখি নাই।” ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন জানালেন, এলাকার কেউ কেউ খাবার আর পুরনো কাপড় দিয়ে গেছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেগুলো অত্যন্ত কম।

আগুন কীভাবে লাগল?

এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই বেশির ভাগ মানুষ দাবি করলেন, “এমনি এমনি আগুন লাগে নাই। কেউ ইচ্ছকৃতভাবে আগুন লাগিয়েছে। কারো কারো দাবি পুলিশ কাল রাতে যাকে আটক করেছে, সেই আগুন লাগিয়েছে। এর আগেও সে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করছিল।”

কেন সে এমন করবে–এই প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় ভাঙারির দোকানের কর্মী সবুজ মিয়া বললেন, “নেশার টাকার জন্য প্রায়ই ভাঙ্গারির দোকানগুলোতে টাকার জন্য চাপ দিত। কয়েক দিন আগে দোকানিদের সাথে এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর সে একবার বস্তিতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করছিল।”

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় বসবাসকারী এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করা রানা বললেন, “রাস্তার পাশের পোল থেকে নেওয়া এখানকার ইলেকট্রিক লাইনের কানেকশন নিয়ম মেনে লাগানো ছিল না। লুজ কানেকশন। তার ওপর ওভারলোড। সব মিলে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে মনে হচ্ছে!”

তবে ঠিক কী কারণে আগুন লেগেছে, তা নিয়ে কেউ কিছুই বলতে পারছেন না। সবই ধারণা। তবে, অন্য সব ঘটনার মতো এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কাজই শুরু করেনি তদন্ত কমিটি

আগুন নেভার পর স্বয়ং প্রতিমন্ত্রী নিজে এটি সাবোটাজ হয়ে থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। জায়গা খালি করতেই বস্তিতে আগুন লাগানো হয় বলে একরকম প্রচলিত ধারনা তৈরি হয়েই আছে। তার ওপর কয়েক দিন আগে এই বস্তিতেই উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে চান ক্ষতিগ্রস্তরাসহ সবাই।

কালসী বস্তিতে এক পরিবার। ছবি: চরচা
কালসী বস্তিতে এক পরিবার। ছবি: চরচা

ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার ব্রিগেডের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার। তবে তদন্ত কমিটির প্রধান ফায়ার ব্রিগেডের ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান চরচাকে বলেন, “আলামত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট দিতে ৭ কর্মদিবস সময়ের প্র‍য়োজন হবে। তবে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত আলামত সংগ্রহের কাজ শুরুই করতে পারেনি কমিটি! অথচ ক্ষতিগ্রস্তরা এরই মধ্যে আগুনে পোড়া এলাকার ধ্বংসস্তূপ যার যার মতো করে অনেকটাই সরিয়ে ফেলেছেন।”

আটক যুবকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ

রাজধানীর পল্লবীর কালশী বস্তিতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় নাজমুল হাসান মনি (২৬) নামে এক যুবকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তাকে আসামি করে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বলেন, “সোমবার রাতে ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয়রা অভিযুক্ত মনিকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে আগুন লাগানোর ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।”

হাসান বাসির বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনি জানিয়েছেন, বস্তির এক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে তিনি আগুন দেন। তবে ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”

ভ্রান্ত ধারণার বহুল প্রচার

বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে আগুনের ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেকে এর সাথে কয়েক দিন আগে পুলিশ ও বস্তিবাসীদের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সংঘর্ষের খবরকে সামনে আনেন। অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন ওই উচ্ছেদ অভিযানে ব্যর্থ হয়েই কোনো অসাধু গোষ্ঠী ওই আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, বস্তির যে অংশে আগুন লেগেছে ওই অংশ মূলত এরশাদ সরকারের সময় গুচ্ছগ্রামের আদলে বেশ কিছু মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। এই অংশ থেকে বস্তির ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। সেখানেই উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কালশী মূল সড়ক সংলগ্ন এলাকার বস্তি সরকারের পূনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হওয়ায়, সাধারণ হিসেবে এখানে ভিন্ন পন্থায় জায়গা খালি করার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্ত এবং এলাকার বয়স্ক ব্যক্তিরা।

কালসী বস্তি। ছবি: চরচা
কালসী বস্তি। ছবি: চরচা

সোমবার সন্ধ্যায় বাউনিয়াবাঁধ বস্তির একাংশ আগুনে পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অন্তত দুই শতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

সম্পর্কিত