মোহাম্মদ আবদুস সবুর। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অবসরে যান শিক্ষা ক্যাডারের এই কর্মকর্তা। সবশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুর্নীতির অনেক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তাকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) পদে পদায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। শিগগিরই তার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হতে যাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে চরচা।
দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় আবদুস সবুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপরও তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে বিএনপির এক শীর্ষ নেতার এবং সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে ডিও লেটার বা আধা-সরকারি পত্র পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ আছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার দিনও এই কর্মকর্তা অনিয়মের চেষ্টা করেছেন। ফলে তাকেই আবার গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হলে তা বিতর্ক এবং মাউশির কর্মকর্তাদের অসন্তোষের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা। তবুও স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিএনপির শীর্ষ নেতার ডিও লেটারের কারণে তাকেই মাউশির ডিজি করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি মাউশির পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদে নিয়োগ পান আবদুস সবুর। এর ৪৪ দিন পর তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলে অবসরে যান তিনি। তবে অবসরে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তেই তার অনিয়মের চেষ্টা ধরা পড়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে।
ডিজিটাল লার্নিং বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের প্রতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠায় সরকার। প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। সারাদেশ থেকে আবেদন আহ্বান করে তাদের যোগ্য ১৭ জন শিক্ষককে বাছাই করা হয়। তবে এ বছরের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে অযোগ্য ১৭ জন শিক্ষকের তালিকা তৈরি করে তা অনুমোদন করিয়ে নিতে তৎপরতা চালান আবদুস সবুর।
জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়া শিক্ষকদেরই কেবল এই প্রশিক্ষনের সুযোগ পাবার কথা থাকলেও, আবদুস সবুরের সেই তালিকায় জায়গা পাওয়া শিক্ষকদের কেউই জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত ছিলেন না। বিষয়টি মাউশির অন্য কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হলে তা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নির্দেশে আটকে দেওয়া হয় সে তালিকা। এমনকি বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা এবং ক্ষোভ সৃষ্টি হলে তার অবসরের সময় মাউশি থেকে কোনো ধরনের বিদায় সংবর্ধনা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি তাকে।
আবদুস সবুরের অবসরের পর এই প্রশিক্ষণে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য কমিটি গঠন করে, একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে মাউশি। পরে ১৭ মার্চ একটি চিঠিতে পুরো নিয়ম এবং প্রার্থীর যোগ্যতা উল্লেখ করে আগ্রহী শিক্ষকদের আবেদন আহ্বান করে অধিদপ্তর।
মাউশির সেই চিঠিতে বলা হয়, “দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ কোরিয়ার মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন এবং দেগু মেট্রোপলিটন অফিস অব এডুকেশন কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর বাংলাদেশের স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে কর্মরত কিছুসংখ্যক শিক্ষককে দক্ষিণ কোরিয়ায় ডিজিটাল লার্নিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বর্ণিত প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণে আগ্রহী শিক্ষককে নিজ-নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রত্যয়নসহ উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে গুগল ফরমে: https://forms.gle/4e60PkwnipQov6EdA তথ্য দেওয়ার জন্য বলা হলো।”
এই আবেদনের জন্য কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করা হয় মাউশির চিঠিতে। এগুলো হলো— আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ৪৭ বছর হতে হবে; ন্যূনতম ২৪ দিনের আইসিটি প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, আইসিটি বিষয়ের প্রভাষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; যাদের আইসিটি বিষয়ক প্রশিক্ষণ নেই, কিন্তু আইসিটি ক্লাস নেন-এমন ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তৃক ন্যূনতম ২ বছর মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনার অভিজ্ঞতার প্রত্যয়ন; এ শর্ত আইসিটি বিষয়ের প্রভাষকদের জন্য প্রযোজ্য নয়; ন্যূনতম ছয় মাস মেয়াদসহ সরকারি পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক; ব্যক্তিগত ল্যাপটপ থাকা আবশ্যক; ইংলিশ স্পিকিং-এ ভালো দক্ষতা থাকতে হবে; দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষের চাওয়া শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে; উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ কমন ও ক্রনিক ডিজিজ থাকা যাবে না; এবং জাতীয় শিক্ষাসপ্তাহ-২০২৬-এ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে হবে।
কিন্তু, আবদুস সবুরের করা শিক্ষকদের তালিকায় দেখা যায় অনেক অনিয়ম। প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা শিক্ষকদের অধিকাংশেরই ছিল না কোনো আইসিটি প্রশিক্ষণ। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার শর্ত থাকলেও তালিকায় থাকা শিক্ষকদের কেউই উপজেলার বাইরে কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাননি। তা ছাড়া তালিকায় থাকা ১৭ জনের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। যেখানে সারাদেশ থেকেই শিক্ষকদের সুযোগ পাবার কথা, সেখানে এক জেলা থেকেই বাছাই করা হয় শিক্ষকদের এক তৃতীয়াংশ।
এ বিষয়ে মাউশির প্রশিক্ষণ বিভাগের সহকারী পরিচালক জাহিদা বেগম চরচাকে বলেন, “কোরিয়ার প্রশিক্ষণের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিত আর সমালোচনাও হতো। নীতিমালা না থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মাউশি থেকে কিছু স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। যেমন প্রার্থীকে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে হবে। কিন্তু যাদের নাম পরিচালক মহোদয় তালিকাভুক্ত করেন, তারা কেউই জাতীয় পর্যায় তো দূরের কথা, জেলা পর্যায়েও পুরস্কার পাননি। এটি সামনে এলে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় মাউশি। তবে পরিচালক আবদুস সবুর ওই তালিকা পাস করিয়ে নিতে আমাদের চাপ দিতে থাকেন। এমনকি তিনি অবসরে যাওয়ার দিনও এই তালিকা পাস করাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। পরে সিনিয়রদের হস্তক্ষেপে এটি বাতিল হয়।”
এই ঘটনায় নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির আরেক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “গত বছরের ট্রেইনিং সংক্রান্ত ঝামেলার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আমরা একটি নীতিমালা করব। দায়িত্ব নেবার পর সবুর স্যারকেও বিষয়টি জানানো হয়, তিনি এতে সম্মতিও দেন। কিন্তু দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই নীতিমালা তৈরিতে তিনি খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। আবার ট্রেইনিংয়ে পাঠানোর জন্য শিক্ষকদের তালিকা তিনি কারো সঙ্গে আলোচনা না করে নিজের মত গোপনে তৈরি করেন। যেদিন রিটায়ারমেন্টে যাবেন সেদিন হঠাৎ এটা পাস করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন তার তালিকার শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। জানাজানি হলে ডিজি মহোদয় সে তালিকা বাতিল করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করে পরবর্তীতে তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে পুনরায় আবেদন চাওয়া হয়।”
নীতিমালা প্রণয়নের জন্য কমিটির আহ্বায়ক করা হয় অধিদপ্তরের অর্থ ও ক্রয় শাখার পরিচালক মনির হোসেন পাটোয়ারীকে। তিনি চরচাকে বলেন, “নীতিমালা ছাড়া যেকোনো বিষয়ের ক্ষেত্রেই দুর্নীতি এবং অনিয়মের সুযোগ থাকে। এখানেও তেমনটা হচ্ছিল। তাই আমরা একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছি।”
মাউশির আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “তিনি (আবদুস সবুর) আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি। তাকে মাউশির কেউই পছন্দ করেন না। তার দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণে আমরা তাকে ফেয়ারওয়েল পর্যন্ত দিইনি। এখন শুনছি তিনিই নাকি মাউশির ডিজি হবেন। এটা আমাদের জন্য খুবই খারাপ খবর।”
এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আবদুস সবুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে কথা জানতে পেরেছে চরচা। একইসঙ্গে আবদুস সবুরের সাম্প্রতিক দুর্নীতির চেষ্টা সামনে আসার পর আবার তাকেই মাউশির ডিজি করার সিদ্ধান্ত আসায় বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সচিবের দপ্তরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “এটা হলে খুবই বাজে সিদ্ধান্ত হবে। সাবেক পরিচালকের চেয়ে অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন, যারা মাউশির ডিজি হতে পারেন। যে ব্যক্তি তার নিজের ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো ফেয়ারওয়েল পায়নি, তাকে আবার বড় পদে ফিরিয়ে আনলে এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হবে। আবার ওনার ডিও লেটার এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে যে, এই সিদ্ধান্ত ফেরালে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। এ নিয়ে সচিব নিজেই খুব দোটানায় আছেন।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেকের নম্বরে ফোন করলেও সাড়া দেননি তিনি।
কর্মজীবনে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক আবদুস সবুর একাধিকবার নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি পান। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের পদে থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়েছেন তিনি। ২০০৯ সালে শিক্ষা ভবনে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরের বছর সরকারি বৃত্তি পেয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেন আবদুস সবুর। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারের বাধ্যতামূলক প্রথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে। এরপর মিরপুর বাংলা কলেজ এবং নরসিংদী কলেজের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সবশেষ মাউশির প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে অবসরে যান আবদুস সবুর। তার কর্মজীবনে একাধিকবার অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে ওএসডি থাকতে হয়েছে বলে চরচাকে জানান মাউশির একাধিক কর্মকর্তা।
তারা জানান, আবদুস সবুর তার কর্মজীবনে অন্তত তিনবার দুর্নীতির দায়ে ওএসডি হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, আবদুস সবুরের বিরুদ্ধে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এ জন্য তাকে ওএসডি পর্যন্ত হতে হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের জন্য সহকর্মীদের মাঝে ভীষণ অজনপ্রিয়। বর্তমানে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে নিজেকে তিনি পরিচয় দেন সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে। অবসরে যাওয়া এই ব্যক্তিকে চুক্তিতে মহাপরিচালক পদে ফিরিয়ে আনার গুঞ্জনে অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে বলেও জানান তিনি।