শরাফত করিম আয়নার কথা মনে আছে? যে চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল প্রশংসা পেয়েছিলেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আয়ানাবজি’ সিনেমার গল্প পাওয়া গেল এবার বাস্তবে।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ধরা পড়েছে বাস্তব এক ‘আয়নাবাজি’। আঙুলের ছাপ যাচাই করতে গিয়ে টাকার বিনিময়ে অন্য এক আসামির পরিচয়ে কারাভোগ করার ঘটনা ধরা পড়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, সময়মতো বায়োমেট্রিক যাচাই না হলে প্রকৃত অপরাধী আইনের আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, হাজতি নম্বর-১৮১০/২৬ মো. রাজিব নামে এক ব্যক্তি গত ২৫ জানুয়ারি তারিখে গাজীপুর জেলা কারাগারে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি টঙ্গী পূর্ব থানার একটি মাদক মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে ঢোকেন। পরে গত ৩১ জানুয়ারি তাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ স্থানান্তর করা হলে তারা প্রকৃত পরিচয় জানা যায়।
কাশিমপুর কারাগারে নিয়ম অনুযায়ী অনলাইন ডাটাবেজে তথ্য এন্ট্রি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার সময়ই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কারা কর্তৃপক্ষের ব্যবহৃত বায়োমেট্রিক সিস্টেমে যাচাই করে দেখা যায়, হাজতির প্রকৃত নাম মো. আজিজুল হক, পিতা- বাচ্চু মিয়া। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ। যা হাজতি হিসেবে দেওয়া পরিচয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই গরমিলের কারণে হাজতিকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তার প্রকৃত নাম আজিজুল হক এবং তিনি টাকার বিনিময়ে অন্য একজনের হয়ে কারাভোগ করতে এসেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে লোভ ও দারিদ্র্যের গল্প
কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে ২৬ বছর বয়সী আজিজুল হক কারা কতৃপক্ষকে জানান, তিনি গত ২৫ জানুয়ারি গাজীপুর জেলা কারাগারে নতুন বন্দী হিসেবে হাজতি নম্বর–১০৫৩/২৬ (গাজীপুর) মো. রাজিবের নামে জেলে ঢোকেন। পরে ৩১ জানুয়ারি তাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ বদলি করা হয়।
আজিজুল জানান, তিনি টঙ্গী এলাকার সুজন মিয়ার গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করতেন। গত ২৩ জানুয়ারি পূর্ব পরিচিত ও একই এলাকার বাসিন্দা মো. রাজিব তাকে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে বলেন। গোপালপুর মোড়ে সাক্ষাতে রাজিব তাকে একটি অটোরিকশা কিনে দেওয়া, কারাভোগের সময় সংসারের খরচ বহন এবং বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখান। রাজিব তাকে আশ্বস্ত করেন, ১২ পিস ইয়াবার মামলায় দ্রুত জামিন পাওয়া যাবে। উন্নত জীবনের আশায় লোভে পড়ে তিনি রাজি হয়ে যান। আজিজুল দাবি করেন, তিনি এই মামলার প্রকৃত আসামি নন।
আসামি বদল হলো কীভাবে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি (তদন্ত) মো. ইফতেখার হোসেন চরচাকে বলেন, “এটা কোনোভাবেই হওয়ার কথা নয়। গত ২৪ জানুয়ারি আমরা মো. রাজিবকে থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছি। তার ছবি ও সব তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। আদালতে পাঠানোর পর তার জায়গায় কীভাবে আজিজুল হক কারাগারে গেল! বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।”
তবে পুলিশের এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার কাছ থেকে গ্রেপ্তার রাজিবের বিস্তারিত তথ্য এবং গ্রেপ্তারের ছবি চাওয়া হলেও তিনি সেটা দিতে পারেননি। এমনকি কারাভোগ করা আজিজুলের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের তথ্যে মিল পাওয়া যায়নি।
এটাই প্রথম নয়
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ভুয়া পরিচয়ে বদলি আসামি হয়ে কারাভোগের ঘটনা নতুন নয়। গাজীপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন কারাগারে অতীতেও এমন ঘটনা ধরা পড়েছে। ২০২৩ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক যাচাই করে ২৪ জন ভুয়া বন্দী শনাক্ত করা হয়। তারা টাকার বিনিময়ে অন্যের সাজা ভোগ করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন।
গত বছরে সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে নুর মোহাম্মদ (৩৩) নামে এক যুবক ধরা পড়েন, যিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে কারাভোগ করতে যান। কারাগারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার সময় তার আঙুলের ছাপের সঙ্গে মামলার প্রকৃত আসামি জোবাইদ পুতিয়ার ফিঙ্গারপ্রিন্টের অমিল ধরা পড়ে।
নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, নুর মোহাম্মদের জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখিত বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানার সঙ্গে প্রকৃত আসামির কোনো মিল নেই। কারাসূত্র জানায়, নুর মোহাম্মদ কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ফকির আহাম্মদের ছেলে হলেও প্রকৃত আসামি জোবাইদ পুতিয়া একই উপজেলার নাইট্যংপাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে।
একই ধরনের আরেক ঘটনায় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈ উপজেলার ফুলবাড়িয়া রেঞ্জ এলাকায় বন বিভাগের একটি মামলায় প্রধান আসামি ছাত্তার মিয়ার পরিবর্তে সাইফুল ইসলাম কারাগারে যান। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সাইফুলের বাবা গণমাধ্যমকে জানান, ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ছাত্তারের হয়ে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন তার ছেলে। এসব ঘটনায় টাকার বিনিময়ে ‘বদলি আসামি’ দিয়ে বিচার ও কারা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আবারও সামনে এসেছে।
কারা সদর দপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, “আজিজুল হককে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ নেওয়ার পর ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়। প্রকৃত আসামি মো. রাজিব ও আজিজুল হক একই গ্রামের বাসিন্দা। টাকার বিনিময়ে বদলি হাজতি খাটতে এসেছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়।”
কারা সদর দপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ২০২৩ সালে কারাগারগুলোতে যাচাই-বাছাই করে টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় জেলখাটা ২৪ আসামীকে শনাক্ত করা হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতি বছরে এ ধরনের ঘটনায় দুই-তিনজনকে শনাক্ত হয়। এজন্য প্রতিটি কারাগারে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বন্দীর যাচাই-বাছাই করেই রাখা হচ্ছে।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “এ ধরনের ঘটনা শুধু কারা ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় হুমকি। যদি বায়োমেট্রিক যাচাই বাধ্যতামূলক ও সমন্বিত না হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরেই আড়ালে থেকে যাবে। দারিদ্র্যকে পুঁজি করে একটি দালালচক্র এ কাজ করছে। তাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না।”