ভোটে মন নেই কারাবন্দীদের!

ভোটে মন নেই কারাবন্দীদের!
কেরাণীগঞ্জের বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার। ছবি: চরচা

দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা মোট ৮৪ হাজার ৪০০ বন্দীর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিতে আগ্রহী নন।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ জানিয়েছেন, মোট বন্দীর মধ্যে মাত্র ছয় হাজার ২৪০ জন পোস্টাল ব্যালটের নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ ৭৮ হাজার ১৬০ জন বন্দী ভোটে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। নিবন্ধিত ছয় হাজার ২৪০ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচ হাজার ৯২০ জনকে ভোটার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা মোট বন্দীর মাত্র ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কারাগারে থাকা বন্দীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিয়েছে সরকার। পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে বন্দীরা সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিতে পারবেন। এ লক্ষ্যে কারা কর্তৃপক্ষ কারাগারগুলোতে প্রচার কার্যক্রম চালায়। পরে টানা তিন সপ্তাহ অনলাইনে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ হয়।

ভোটে আগ্রহী না হওয়ার কারণ

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কথা বলে জানা গেছে, বন্দীদের নিবন্ধন কম হওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনেক বন্দীর ধারণা-যেকোনো সময় তারা জামিনে মুক্তি পেতে পারেন। তাই কারাগার থেকে ভোট দেওয়ার জন্য আলাদা করে নিবন্ধনের প্রয়োজন মনে করেননি।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা অনেক বন্দীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই বা এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য অনুপস্থিত।

তৃতীয়ত, কারাগারে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একাংশ নেতাকর্মীর মধ্যে ভোটার নিবন্ধনের বিষয়ে আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ চরচাকে বলেন, “কারাগারে এত কম সংখ্যক বন্দীর ভোটার নিবন্ধন হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। বন্দীর মনে কী চিন্তা কাজ করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারও ধারণা থাকতে পারে—কারাগার থেকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করলে জামিনে মুক্তি পেয়ে বাইরে গেলে ভোটের আগে আর ভোট দিতে পারবেন না।”

সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) আরও বলেন, “আবার অনেকেরই নিজের ভোটার নম্বর জানা নেই। কেউ কেউ বর্তমানে ভোট দিতে আগ্রহী নন, আবার দেখা যায়, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ইচ্ছাকৃতভাবেই ভোট দিতে চান না। এ ধরনের নানাবিধ কারণ থাকতে পারে, তাই বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল।”

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “কারাগারে থাকা অনেক বন্দী দীর্ঘদিন ধরে আটক, অনেকের কাছে ভোটার আইডি কার্ড বা স্থায়ী ঠিকানা নেই, কেউ ভাসমান অবস্থায় আছেন, কেউ কখনো ভোটার হিসেবেই নিবন্ধন করেননি। আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট দিতে চান না। কেউ মনে করতে পারেন, কারাগারে নিবন্ধন করলে তথ্য সরকারের সার্ভারে চলে যাবে—এই ধরণের আশঙ্কাও কাজ করতে পারে।”

কোথায় কতজন নিবন্ধন করেছেন

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ঢাকা বিভাগের কারাগারগুলো দুটি অংশে বিভক্ত। ঢাকা বিভাগ-১ (কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ১০টি): নিবন্ধন করেছেন এক হাজার ৪০৯ জন।

ঢাকা বিভাগ-২ (গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারসহ ১০টি): নিবন্ধন করেছেন ৯৬০ জন।

এ ছাড়াও বিভাগভিত্তিক নিবন্ধনের মধ্যে চট্টগ্রামে এক হাজার ১০১ জন, খুলনায় ৬৯০, রাজশাহীতে ৬৯৪ জন, রংপুরে ৩০৫ জন, বরিশালে ২৩৪ জন, ময়মনসিংহে ১৫৮ জন, এবং সিলেট বিভাগে ৫১০ বন্দী বিবন্ধন করেছেন।

ভোট গ্রহণে প্রস্তুতি সম্পন্ন

কারা কর্মকর্তারা জানান, বন্দীদের ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত কারা সদস্যদের ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যেখানে ভোট গ্রহণ হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে কি না—তা জেলা নির্বাচন কমিশন যাচাই করেছে।

নিবন্ধিত ভোটাররা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘বহির্গামী খাম’ (ফরম-৯ক) পাবেন। এতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য দুটি আলাদা ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নির্দেশনা, ঘোষণাপত্র (ফরম-৮) এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানাসহ ফেরত খাম (ফরম-১০খ) থাকবে।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে ভোট দেওয়ার জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ভোট গ্রহণ শেষে খামগুলো সুরক্ষিতভাবে সংগ্রহ করে ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হবে।

বন্দীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন যেভাবে

কারা সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য ডাকযোগে ব্যালট পেপার ও প্রয়োজনীয় খাম পাঠাবে। বন্দীরা নির্ধারিত ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রতীকে সিল দিয়ে তা নির্ধারিত খামে ভরে সিলগালা করবেন। প্রতিটি কারাগারে ভোট দেওয়ার জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ থাকবে, যেখানে বন্দীরা গোপনে ভোট দিতে পারবেন।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে ভোট দেওয়ার জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ছবি: সংগৃহীত
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে ভোট দেওয়ার জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ছবি: সংগৃহীত

ভোট দেওয়া শেষে ব্যালট পেপারের খাম ও স্বাক্ষরসংবলিত ঘোষণাপত্র আরেকটি খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। কারা কর্তৃপক্ষ এসব খাম ডাক বিভাগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। পরে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুক্ত করা হবে। কারা কর্মকর্তারাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, “বন্দীদের ভোট গ্রহণের সময়সূচি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে। নিবন্ধন শেষ হয়েছে এবং যোগ্য বন্দীরা নির্ধারিত সময়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।”

তিনি আরও বলেন, “বন্দীদের ভোট প্রদানের পদ্ধতি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা ভোট দেবেন। ব্যালট গ্রহণের সময়সূচি নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করবে—ভোটের দিনও হতে পারে, আবার তার আগের দিন বা তারও আগের দিন হতে পারে।”

সম্পর্কিত