মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে যখন ঈদুল আজহার আনন্দ আর উৎসবের আমেজ, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দা আহমেদ নাশওয়ানের কাছে তা তখন কেবলই যুদ্ধের রেখে যাওয়া সীমাহীন কষ্ট আর বেদনার এক নাম। গাজাবাসীর উৎসবের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য হলো কোরবানির পশুর হাটে যাওয়া। কিন্তু টানা তিন বছর ধরে ভাই ও সন্তানদের নিয়ে সেই হাটে যাওয়ার কোনো সুযোগই পাচ্ছেন না তিনি।
চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে আহমেদ নাশওয়ান জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে ঈদুল আজহা তাদের জীবনে বয়ে আনত অকৃত্রিম আনন্দ। পুরো পরিবার একসঙ্গে মিলে হাটে গিয়ে পশু পছন্দ করা, ঈদের নানা প্রস্তুতি নেওয়া এবং জবাইয়ের পর আত্মীয়-স্বজন ও অভাবী মানুষের মাঝে মাংস বিলিয়ে দেওয়ার সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে করেন তিনি। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই চিরচেনা উৎসব এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস আর প্রার্থনায় রূপ নিয়েছে। গাজায় নতুন কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করতে না পারায় এবং তীব্র খাদ্যসংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এখন দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করতেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন।
যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা সত্ত্বেও ইসরায়েলি প্রশাসন এই উপত্যকার ওপর কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। এর ফলে গাজায় যেকোনো ধরনের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহার কোরবানির জন্য অত্যন্ত জরুরি ভেড়া বা গরুর মতো গবাদিপশুর এমন তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে যে, তা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
গাজা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মাহের আল-তাব্বা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, যুদ্ধের আগে যে কোরবানির পশুর মূল্য ছিল প্রায় ৫০০ মার্কিন ডলার, বর্তমানে সেই পশুর দাম আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার ডলারে! স্বাভাবিকভাবেই এই লাগামহীন দাম গাজার সিংহভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে।
গাজা সিটির ৪০ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ আল-হিসি, যিনি চার সন্তানের জনক, তার কাছেও পশুর এই তীব্র সংকট আর চড়া দামের কারণে কোরবানি দেওয়া এখন এক অবাস্তব স্বপ্ন। তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, ঈদুল আজহা সবসময়ই তার পরিবারের জন্য সবচেয়ে খুশির দিন ছিল। ঈদের দিন ভোরে তার সন্তানেরা নতুন জামা পরে ঘুম থেকে উঠত এবং মাংস বিতরণের কাজ শেষ করে বাবার হাত ধরে আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যেত।
কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নিষ্ঠুর কষাঘাতে আজ গাজার সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতি এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আল-হিসি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ মানুষই তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং আয়ের একমাত্র উৎসটুকু হারিয়ে ফেলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে এই আকাশচুম্বী মূল্যে কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য বা মানসিকতা গাজার বেশির ভাগ পরিবারেরই আর অবশিষ্ট নেই।