আমেরিকার নাকের ডগায় থেকে যেভাবে আমেরিকার বিরোধিতায় কিউবা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমেরিকার নাকের ডগায় থেকে যেভাবে আমেরিকার বিরোধিতায় কিউবা
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

জুলাই অভ্যুথানের সময় থেকে আমরা ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বারবার শুনেছি। ইউটিউব-ফেসবুকের পোস্ট বা ভিডিওতে কথায় কথায় বলতে শুনেছি। একটু পরিমার্জিত করে ‘জন্মভূমি অথবা মৃত্যু’ লিখে টিএসসিতে টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা এক উপদেষ্টা বইও লিখেছেন এই শিরোনামে। এই কিংবদন্তি বাক্যটি যিনি উচ্চারণ করেছিলেন, তিনি কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো।

১৯৫৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ আজকের দিনে ডানপন্থী স্বৈরশাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তাকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা এক গেরিলা অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। ১ জানুয়ারি বাতিস্তার পতনের পর কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হওয়া কাস্ত্রো, দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।

ফিদেল কাস্ত্রো পূর্ব কিউবার ওরিয়েন্ত প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা ছিলেন একজন স্পেনীয় অভিবাসী। ছাত্রাবস্থাতেই কাস্ত্রো বিপ্লবী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৪৭ সালে ডমিনিকান স্বৈরশাসক রাফায়েল ট্রুজিলোকে উৎখাত করার জন্য ডমিনিকান নির্বাসিত এবং কিউবানদের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টায় অংশ নেন। পরের বছর, তিনি কলম্বিয়ার বোগোতায় দাঙ্গায় অংশ নেন। এই সময়ে তার রাজনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তার আমেরিকা-বিরোধী বিশ্বাস, যদিও তিনি তখনো স্পষ্ট মার্কসবাদী ছিলেন না।

১৯৫১ সালে, তিনি সংস্কারবাদী অর্টোডক্সো পার্টির সদস্য হিসেবে কিউবার হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই জেনারেল বাতিস্তা একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে ফেলেন।

বাতিস্তার একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী গঠিত হয় এবং ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই, কাস্ত্রো প্রায় ১৬০ জন বিদ্রোহীকে নিয়ে কিউবার দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি সান্তিয়াগো ডি কিউবার মনকাদা ব্যারাকে আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। কাস্ত্রো অস্ত্রাগার দখল করে ঘাঁটির রেডিও স্টেশন থেকে তার বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু ব্যারাকটি সুরক্ষিত থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি।

কাস্ত্রো নিজে গ্রেপ্তার হন এবং কিউবার সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের জন্য বিচারের মুখোমুখি হন। তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

দুই বছর পর, বাতিস্তা তার ক্ষমতার ওপর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হয়ে কাস্ত্রোসহ সকল রাজনৈতিক বন্দীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এরপর কাস্ত্রো তার ভাই রাউলকে নিয়ে মেক্সিকোতে যান এবং সেখানে তারা বিপ্লবী ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’ সংগঠিত করেন। তারা নতুন কর্মী নিয়োগ করেছিলেন এবং আর্জেন্টিনার বিপ্লবী চে গুয়েভারার সাথে যুক্ত হন।

১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি নাগাদ, কিউবার আরও বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী বাতিস্তার বিরোধিতা করছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র তার শাসনামলে সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। ডিসেম্বরে, চে গুয়েভারার নেতৃত্বে ‘২৬শে জুলাই’ বাহিনীর সদস্যরা সান্তা ক্লারা শহরে আক্রমণ চালালে বাতিস্তার বাহিনী ভেঙে পড়ে। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময়ে কাস্ত্রোর সাথে ১,০০০-এর কম লোক থাকলেও, তিনি কিউবা সরকারের ৩০,০০০ সদস্যের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেন। অন্যান্য বিদ্রোহী নেতার তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না, যা তরুণ ও ক্যারিশম্যাটিক কাস্ত্রোর ছিল, এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

কাস্ত্রোর শাসনামলেই কিউবা পশ্চিম গোলার্ধের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। একুশ শতক পর্যন্ত তিনি দেশটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধের মুখেও টিকিয়ে রেখেছিলেন কিউবা’কে।

তবে কিউবা হোক বা ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ হোক–এমন স্লোগান এসেছে। জনপ্রিয় এসব স্লোগানে ‘ফাদারল্যান্ড’ শব্দটিই বহুল উচ্চারিত। যদিও এই ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে স্বদেশভূমিকে বরাবরই মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর স্বাক্ষর পাওয়া যায় ‘বন্দেমাতরম’ থেকে শুরু করে জনপ্রিয় সব গান ও কথায়। ভগৎ সিং, চন্দশেখর আজাদ বা সূর্যসেনের মতো অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ইতিহাসের দিকে তাকালে এর স্বাক্ষ্য পাওয়া যায়। সে সময়কার দেশাত্মবোধক গান ও কবিতাতেও বারবার দেশ বলতে মায়ের কথাই উঠে এসেছে।

ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে জন্মভূমি বলতে পিতৃভূমি উচ্চারণ করা হলেও, এই ভারতীয় উপমহাদেশে, এবং এই বঙ্গভূমিতে জন্মভূমি বরাবরই মাতৃভূমি বলেই অনূদিত হয়েছে। তাই ফিদেল কাস্ত্রোর ‘পিতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ আমাদের বিক্ষোভে এসে ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’–তে অনূদিত হয়েছে স্বভাবগুণেই।

সম্পর্কিত